চিন্তার মগ্ন পিট, প্লেনের পিছন দিকে চলে এসে পিটের পাশে বসল অ্যাল। তোমাকে পরাস্ত বলে মনে হচ্ছে, দোস্ত।
আড়মোড়া ভাঙল পিট। ভাবছি, বাড়ি ফিরতে পারলে ভালো হতো।
অ্যান্টিক ও ক্লাসিক গাড়ির একটা বিরাট সংগ্রহ আছে পিটের, অ্যাল তা জানে।
নতুন কোন গাড়ির ওপর কাজ করবে? জানতে চাইল সে।
কোনটা?
জিওর্দিনো মাথা ঝাঁকায়। প্যাকার্ড না মারমন?
কোনোটাই না, পিট বলে। প্যাসিফিকে যাওয়ার আগে স্টাজে লাগানোর জন্যে একটা এঞ্জিন তৈরি করেছি নতুন করে।
সেই যে, ১৯৩২ সালের সবুজ গাড়িটা?
হ্যাঁ।
.
ক্লাসিক গাড়ির রেস হবে রিচমন্ডে, থাকতে চাও ওখানে?
রেস তো আর মাত্র দুদিন পর, চিন্তিত ভাবে বলল পিট। এত তাড়াতাড়ি গাড়িটা খাড়া করাতে পারব না।
দুজন মিলে চেষ্টা করলে পারব, উৎসাহ দিয়ে বলল অ্যাল। অন্তত চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি?
বোধহয় সুযোগ পাব না, অ্যাল, বলল পিট। শুধু নিউজ ব্ল্যাকআউট নয়। ব্যাপারটা আরো সিরিয়াস তে পারে। অ্যাডমিরালের হাবভাব আমার ভাল ঠেকছে না।
আমি তার মুখ খোলাবার কম চেষ্টা করিনি, হতাশ কণ্ঠে বলল অ্যাল।
কিন্তু?
তার চেয়ে একটা লাইটপোস্টের সাথে কথা বললেও হয়তো কিছু আদায় করা যেত।
মাত্র একটা তথ্য আদায় করতে পেরেছি আমি, বলল পিট। ল্যান্ড করার পর সরাসরি আমাদেরকে ফেডারেল হেডকোয়ার্টার বিল্ডিঙে নিয়ে যাওয়া হবে।
হতভম্ব দেখায় অ্যালকে। ওয়াশিংটনে কোন ফেডারেল হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং আছে বলে তো কখনও শুনিনি।
আমিও, বলল পিট।সেজন্যেই মনে হচ্ছে, আমাদের আটকে রাখা হয়েছে।
.
২১.
ভ্যানটায় কোন চিহ্ন নেই, পাশে কোন জানালাও নেই। এ এয়ারফোর্স বেস থেকে বেরিয়ে কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউ ধরে ছুটল সেটা। বেশ কিছুক্ষণ পর নির্জন একটা গলির ভেতর ঢুকল। থামল পার্কিং লটের পিছনে, একটা পুরানো ছতলা ভবনের সিঁড়ির গোড়ায়। ভবনের গায়ে প্লাস্টার প্রায় নেই বললেই চলে, দেখে মনে হলো যেকোন মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। বাইরের দিকের সবগুলো জানালা ভেতর থেকে বন্ধ, সম্ভবত বছরের পর বছর খোলা হয় না। কয়েকটা ঝুল-বারান্দার রেইল ভেঙে গেছে, পরে আর মেরামত করা হয়নি। যেন পরিত্যক্ত একটা ভবন।
ওদের সাথে দুজন ফেডারেল এজেন্ট রয়েছে, তারাই পথ দেখাল। কয়েকটা ধাপ টপকে লবিতে ঢুকল ওরা। লবিতে ফার্নিচার বলতে তেমন কিছু নেই, যা-ও বা আছে, সব ভাঙাচোরা ও মান্ধাতা আমলের। মেঝেতে বসে আছে ছেঁড়া কম্বল জড়ানো এক প্রৌঢ়, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, দেখে মনে হলো আশ্রয়হীন। তার দিকে চোখ পড়তে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিলেন অ্যাডমিরাল। লোকটার গায়ে নির্ঘাত ছারপোকা আর উৎকট দুর্গন্ধ আছে, যেকোন মেয়ের মনে ঘৃণার উদ্রেক করবে, কিন্তু লোকটার দিকে চোখ পড়তে সামান্য হাসল স্টেসি।
কৌতূহল বোধ করল পিট, দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, রোদ পোহাবার জন্যে দিনটা ভাল।
প্রৌঢ় লোকটা নিগ্রো, জট করে মুখ তুলে তাকাল। আপনি অন্ধ নাকি, মিস্টার? রোদ আমার কি উপকারে আসবে?
লোকটার চোখে প্রফেশন্যাল অবজারভার-এর দৃষ্টি, লক্ষ করল পিট। ওর পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল সে। এ চোখ আশ্রয়হীন কোন দুর্ভাগার হতে পারে না।
কি জানি, প্রতিবেশীসুলভ সৌহার্দ্য প্রকাশ পেল ওর গলার সুরে। তবে পেনশন পাবার পর আপনি যখন বারমুডায় সময় কাটাতে যাবেন, রোদে তো আপনাকে বেরুতেই হবে, তাই না?
সর্বহারা লোকটি হাসল, মুক্তার মত ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে। হ্যাভ আ সেফ স্টে, মাই ম্যান, বলল সে।
চেষ্টা করব, বলল পিট। অদ্ভুত উত্তর শুনে কৌতুক বোধ করল। সামনে এই প্রথম এক সারিতে কয়েকজন সশস্ত্র সেন্ট্রিকে দেখতে পেল ও। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়ল মেইন হলরুমে।
প্রথমেই ডিজাইনফেকট্যান্ট-এর গন্ধ ঢুকল নাকে। হলরুমের মেঝেতে চাল বলে কিছু নেই, কোথাও গর্তও সৃষ্ট হয়েছে। দেয়ালে অনেক কাল আগে রঙিন কাগজ সাঁটা হয়েছিল, বেশিরভাগ ছিঁড়ে গেছে। একপাশে একটা অ্যান্টিক পোস্টবক্স দেখল ও, গায়ে লেখা রয়েছে ইউএস মেইল।
নিঃশব্দে খুলে গেল একটা এলিভেটরের দরজা। ভেতরটা চকচকে ক্রোম, দেখে অবাক হয়ে গেল সবাই। সদ্য ভাজ খোলা ইউনিফর্ম পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইউএস মেরিন-এর একজন সদস্য, সেই অপারেটর। কোন রকম জড়তা নেই, সরাসরি এলিভেটরে উঠে পড়ল স্টেসি। পিটের মনে হলে, এখানে সম্ভবত আগেও এসেছে সে।
ওপরে নয়, এলিভেটর নামতে শুরু করল নিচের দিকে। এক সময় থামল সেটা। বাইরে বেরিয়ে এসে পিট দেখল, করিডরের মোজাইক করা মেঝে ঝকঝক করছে, দেয়ালগুলো এত সাদা যেন গতকালই চুনকাম করা হয়েছে। ফেডারেল এজেন্টরা ওদেরকে একটা দরজার সামনে এসে দাঁড় করাল। দেখেই বোঝা গেল, দরজাটা সাউন্ডপ্রুফ। সবার সাথে ভেতরে ঢুকল পিট।
এটা একটা কনফারেন্স রুম। নিচু সিলিং, সিলিঙের আড়ালে আলো। কামরার মাঝখানে বিরাট একটা লাইব্রেরি টেবিল, টেবিলটা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট হোয়াইট হাউসের জন্যে কিনেছিলেন। টেবিলের ওপর একটা বেতের ঝুড়িতে এক গাদা আপেল রয়েছে, পাশেই একটা কনসোল। নিচে রক্তলাল পারশিয়ান কার্পেট।
টেবিলের উল্টোদিকে গিয়ে দাঁড়াল স্টেসি। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে তার মুখের পাশে আলতোভাবে চুমো খেলেন এক ভদ্রলোক, অভ্যর্থনা জানালেন নিচু স্বরে, উচ্চারণ ভঙ্গিতে টেক্সাসের সুর স্পষ্ট। দেখে মনে হলো, স্টেসির সাথে আগে থেকেই পরিচয় আছে তার। যদিও স্টেসি ওদের কারও সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিল না। হাওয়াই-এ প্লেনে চড়ার পর থেকে পিট ও স্টেসি পরস্পরের সাথে কথা বলেনি। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে ভান করার চেষ্টা করছে স্টেসি, দিকে পিছন ফিরে থাকছে সে।
