সুতরাং সত্তাই ছিল অস্তিত্বের পবিত্র মাত্রার মূল প্রতীক, একেশ্বরবাদের ঈশ্বর, হিন্দুধর্মমতের ব্রাহ্মণ/আত্মা ও প্লেটোর দর্শনের শুভের মতো একই ভূমিকা পালন করেছে। গৌতম আলারা কালামের ধম্মে ‘বাস’ করার প্রয়াস পাওয়ার সময় এমন এক শান্তি আর সমগ্রতায় প্রবেশ ও বাস করতে চেয়েছিলেন যা জেনেসিস অনুযায়ী আদি মানব স্বর্গোদ্যানে প্রত্যক্ষ করেছিল। এই স্বর্গীয় শান্তি, এই শালোম, এই নিব্বানা ধারণাগতভাবে লাভ করাই যথেষ্ট ছিল না। তিনি সেই ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান’ চেয়েছিলেন যা তাঁকে আমাদের বসবাসের, শ্বাস-প্রশ্বাসের ভৌত পরিবেশের মতো আবৃত করে ফেলবে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তিনি তাঁর মনের গভীরে এই দুর্ভেয় ছন্দের অনুভূতি লাভ করবেন। তাকে পুরোপুরি পাল্টে দেবে সেটা: এক নতুন সত্তা অর্জন করবেন তিনি যা আর রক্ত মাংসের উত্তরাধিকার সেই যন্ত্রণার শিকারে পরিণত হবে না। সকল অ্যাক্সিয়াল দেশে মানুষ আধ্যাত্মিকতার অধিকতর অন্তস্থ ধরনের সন্ধান করছিল। কিন্তু খুব সামান্য সংখ্যকই যোগিদের মতো পূর্ণাঙ্গভাবে তা করতে পেরেছে। অ্যাক্সিয়াল যুগের অন্যতম দর্শন ছিল, পবিত্র ‘মহাশূন্যে’ অবস্থিত এমন কিছু নয়: এটা পৃথিবীতে প্রতিটি ব্যক্তির সত্তায় উপস্থিত এবং সর্বব্যাপী। ব্রাহ্মণ ও আত্মার পরিচয়ের উপনিষদের ভাষ্যে ধ্রুপদী ঢঙে প্রকাশিত একটি ধারণা। কিন্তু সত্তা আমাদের নিজস্ব সত্তার মতোই কাছাকাছি হলেও তা আবিষ্কার কঠিন বলেই প্রমাণিত হয়েছে। স্বর্গোদ্যানের দুয়ার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অতীতকালে পবিত্রতা মানুষের পক্ষে সুলভ চিন্তা করা হতো। প্রাচীন ধর্মগুলো বিশ্বাস করত, উপাস্য মানব-সন্তান এবং সকল প্রাকৃতিক ঘটনাবলী একই স্বর্গীয় উপাদানে গঠিত: মানুষ ও দেবতাদের মাঝে কোনও অস্তিত্বমূলক দূরত্ব ছিল না। কিন্তু অ্যাক্সিয়াল যুগের সূচনাকারী বিপর্যয়ের অংশ ছিল এই যে, পবিত্র বা স্বর্গীয় এই মাত্রাটি কোনওভাবে জগৎ হতে সরে গিয়ে এক অর্থে নারী-পুরুষের কাছে অচেনা হয়ে গিয়েছিল।
উদাহরণ স্বরূপ, হিব্রু বাইবেলের আদি টেক্সটে আমরা পড়ি যে, একজন সাধারণ পর্যটকের বেশে হাজির হওয়া ঈশ্বরের সঙ্গে আব্রাহাম একবার ভোজন পর্ব সেরেছিলেন।[১৬] মন্দিরে ঈশ্বরের দর্শন পাওয়ার পর মৃত্যু ভয়ে ভরে উঠেছিল ইসয়াহর মন।[১৭] জেরেমিয়াহ্ ঐশ্বরিকতাকে তাঁর হাত পা অবশ করে দেওয়া, হৃদয় মোচড়ানো ও মাতালের মতো বেসামাল করে দেওয়া যন্ত্রণা হিসাবে জানতেন।[১৮] সম্ভবত গৌতমের সমসাময়িক হয়ে থাকবেন ইযেকিয়েল, তাঁর গোটা জীবন একদিকে বর্তমানে পবিত্র এবং অন্যদিকে সচেতন, আত্ম- রক্ষাকারী সত্তার মাঝে বিরাজ করা মারাত্মক বিচ্যুতি তুলে ধরে। পয়গম্বরকে ঈশ্বর এমন উদ্বেগে আক্রান্ত করেছেন, তিনি কাঁপুনি থামাতে পারছেন নাঃ স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ঈশ্বর তাঁকে শোক প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন: তাঁকে পশুর বিষ্ঠা খেতে বাধ্য করেছেন তিনি; বাধ্য করেছেন শরণার্থীর মতো ঠাসা ব্যাগ নিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াতে।[১৯] অনেক সময় স্বর্গীয় সত্তায় প্রবেশের জন্যে একজন সভ্য মানুষের স্বাভাবিক সাড়াকে অস্বীকার ও পার্থিব সত্তার বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ প্রয়োজনীয় মনে হয়। আদি যোগিরাও তাদের অন্তরে বিরাজিত বলে বিশ্বাস করা অনিয়মিত ও চরম সত্তার উপলব্ধি করার লক্ষ্যে সাধারণ চৈতন্যে একই ধরনের আক্রমণের প্রয়াস পাচ্ছিল।
যোগিরা বিশ্বাস করত, কেবল তাদের স্বাভাবিক চিন্তন প্রক্রিয়া ধ্বংস, চিন্তা ও অনুভূতি নির্বাপিত করে আলোকনের বিরুদ্ধে যুদ্ধমান অবচেতন বাসনা মুছে ফেলতে পারলেই সত্তাকে মুক্ত করা যাবে। তারা প্রচলিত মানসিক অভ্যাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। অন্তস্থ আত্মার প্রতিটি পর্যায়ে যোগি স্বাভাবিকের উল্টো কাজ করত। সাধারণ সাড়াকে নাকচ করার জন্যেই নির্মাণ করা হয়েছিল প্রতিটি যোগ অনুশীল। যে কোনও ভাববাদীর মতো যোগি সমাজ হতে ‘বেরিয়ে গিয়ে’ আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু করত, কিন্তু তারপর আরেক ধাপ বেশি অগ্রসর হতো। কোনও গৃহস্থের মতো একই মানসিকতাও বহন করবে না সে: খোদ মনুষ্য সমাজ হতেই ‘বেরিয়ে যাচ্ছে’ সে। অশ্লীল জগতে পরিপূর্ণতার সন্ধান করার বদলে যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপে ভারতীয় যোগিরা এখানে বাস করতে অস্বীকৃতি জানাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল।
আলারা কালাম সম্ভবত ক্রমান্বয়ে গৌতমকে এই যোগ অনুশীলনগুলো দীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু ধ্যান শুরু করার আগেই প্রথমে গৌতমকে নৈতিকতার শক্ত ভিত্তি স্থাপন করতে হয়েছিল যা তাঁকে মূল উপাদানে নামিয়ে এনে নৈতিক শৃঙ্খলা ও অহমবাদকে নিয়ন্ত্রণ করবে। যোগ অনুশীলনকারীকে এমন মনোসংযোগ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয় যা স্বার্থপরতার লক্ষ্যে ব্যবহার করলে দানবীয় হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং শিক্ষার্থীকে তাঁর অবাধ্য সত্তা (নিম্ন পর্যায়ের) শক্ত নিয়ন্ত্রণে আছে নিশ্চিত করার জন্যে চারটি ‘নিষেধাজ্ঞা’ (ইয়ামা) পালন করতে হতো। ইয়ামা শিক্ষার্থীর উপর চুরি, মিথ্যাচার, মাদক গ্রহণ, হত্যা বা অন্যান্য প্রাণীর ক্ষতি সাধন বা যৌনাচারে অংশ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত। এইসব নিয়ম জৈনদের সাধারণ শিষ্যদের জন্যে নির্ধারিত নিয়মের অনুরূপ। বেশির ভাগ গাঙ্গেয় ভাববাদীদের ক্ষেত্রে যা সাধারণ বিষয় পরম মানসিক ও দৈহিক স্পষ্টতা অর্জনের জন্যে আকাঙ্ক্ষা প্রতিহত করার প্রতিজ্ঞা ও অহিংসার নীতির প্রতিফলন দেখায়। এইসব ইয়ামা দ্বিতীয় প্রকৃতিতে পরিণত না হলে গৌতমকে আরও অগ্রসর যোগ অনুশীলনের অনুমতি দেওয়া হতো না।[২০] নির্দিষ্ট কিছু নিয়মও (দৈহিক ও মানসিক অনুশীলন) অনুসরণ করতে হয়েছে তাঁকে, যার ভেতর বিবেকের পরিচ্ছন্নতা, ধম্ম পাঠ ও এক ধরনের স্বাভাবিক প্রশান্তি অর্জন অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই সঙ্গে কৃচ্ছ্রতার অনুশীলনও (তপস) ছিল: শিক্ষাব্রতাঁকে বিনা অভিযোগে চরম শীত ও প্রচণ্ড গরমে, ক্ষুধা এবং পিপাসার মোকাবিলা করতে হতো। কথা ও ভাবভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো যাতে মনের ভাবনা কখনও প্রকাশিত হতে না পারে। সহজ প্রক্রিয়া ছিল না এটা। কিন্তু ইয়ামা ও নিয়ামায় দক্ষতা অর্জন করার পর গৌতম সম্ভবত ‘বর্ণনাতীত সুখ’ অনুভব করতে শুরু করেছিলেন যা কিনা ধ্রুপদী যোগ আমাদের জানাচ্ছে, এই আত্ম নিয়ন্ত্রণ, সংযম ও অহিংসার ফল।[২১]
