এইসব সংঘের কোনওটায়ই যোগ দেননি গৌতম। বরং সমক্ষ্যের একটা ধরনের শিক্ষা দানকারী আলারা কালামের ধম্মে দীক্ষা নেওয়ার জন্যে বিদেহা রাজ্যের রাজধানী বেসালির মহল্লায় চলে গেছেন।[৯] গৌতম সম্ভবত আগে হতেই সমক্ষ্য দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে থাকবেন, কেননা এই সমক্ষ্য দর্শন (পার্থক্যকরণ) সবার আগে সপ্তম-শতাব্দীর গুরু কাপিলাই শিক্ষা দিয়েছিলেন কাপিলবাস্তুর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। এই মতবাদের বিশ্বাস ছিল, আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং অজ্ঞতাই আমাদের সব সমস্যার মূল: প্রকৃত সত্তাকে বোঝার অক্ষমতা থেকেই আমাদের দুঃখ-দুর্দশার উদ্ভব। আমরা এই সত্তাকে সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক জীবনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু মুক্তি অর্জনের স্বার্থে আমাদের এক গভীর স্তরে সচেতন হয়ে উঠতে হবে যে সত্তার সঙ্গে এইসব ক্ষণস্থায়ী, সীমিত ও অসন্তোষজনক মানসিক অবস্থার কোনও সম্পর্ক নেই। সত্তা পরম আত্মা (পুরুসা)-র হুবহু অনুরূপ ও চিরন্তন, যা সমস্ত বস্তু ও প্রাণীতে প্রভাবশালী কিন্তু প্রকৃতির বস্তুজগৎ (প্রকৃতি) দিয়ে আড়াল করা। সমক্ষ্য দর্শন অনুসায়ী পবিত্র জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে প্রকৃতি হতে পুরুসার পার্থক্য করতে শেখা। নবীশকে আবেগের বিভ্রান্তি হতে ঊর্ধ্বে জীবন যাপন করা শিখতে হতো এবং মানুষের নিখুঁততম অংশ বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটাতে হতো, যার চিরন্তন আত্মার প্রতিফলন ঘটানোর ক্ষমতা রয়েছে, ঠিক যেভাবে আয়নায় ফুলের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। কোনও সহজ প্রক্রিয়া ছিল না এটা। কিন্তু একজন সন্ন্যাসী সত্যিকার অর্থে তাঁর প্রকৃত সত্তা মুক্ত, পরম ও চিরন্তন এ বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি অর্জন করতেন। অন্যতম ধ্রুপদী টেক্সটে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকৃতি তখন নিমেষে ‘গুরুর ইচ্ছা পূরণের পর কোনও নৃত্যশিল্পীর বিদায় নেওয়া’র মতো সত্তা হতে বিদায় নেবে।[১০] এই ব্যাপারটি ঘটে যাওয়ার পর সন্ন্যাসী আলোকপ্রাপ্ত হবেন, কারণ তিনি তাঁর প্রকৃত সত্তায় জাগ্রত হয়েছেন। দুঃখ-দুর্দশা তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারবে না, কেননা তিনি জানেন তিনি চিরন্তন, পরম। প্রকৃতপক্ষেই নিজেকে তিনি ‘আমি কষ্ট পাচ্ছি’র বদলে ‘ওটা কষ্ট পাচ্ছে,’ উচ্চারণ করতে শুনবেন, কারণ এখন যাকে তাঁর প্রকৃত পরিচয় হিসাবে জানেন যন্ত্রণা তার বহু দূরের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। আলোকপ্রাপ্ত সাধু পৃথিবীতে বাস করে চলবেন এবং সম্পাদিত অসৎ কম্মের অবশিষ্টাংশ ভস্মীভূত করবেন, কিন্তু মারা যাবার পর আর পুনর্জন্ম নেবেন না, কেননা তিনি বস্তুগত প্রকৃতি হতে মুক্তি অর্জন করেছেন।[১১]
সমক্ষ্য দর্শন গৌতমের চোখে উপযোগি ঠেকেছে। আপন ধৰ্ম্ম নির্মাণের সময় এই দর্শনের কিছু উপাদান অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন তিনি। গৌতমের মতো একজনের কাছে স্পষ্টতই আকর্ষণীয় আদর্শ ছিল এটা, অতি সম্প্রতি জগতের মোহমুক্ত ঘটেছিল তাঁর, সর্বত্র পবিত্রতার সন্ধান করারই শিক্ষা দিয়েছিল এই আদর্শ। প্রকৃতি স্রেফ ক্ষণস্থায়ী বিষয়। একে যত নিপীড়ক মনে হোক না কেন, আদৌ চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়, যাদের কাছে জগৎ অচেনা জায়গায় পরিণত হয়েছে সমক্ষ্য তাদের কাছে উপশমকারী দর্শন ছিল, কারণ এর শিক্ষা ছিল নৈরাশ্যজনক বাহ্যিক রূপ সত্ত্বেও প্রকৃতি আমাদের বন্ধু। আলোকপ্ৰাপ্তিতে মানুষকে তা সাহায্য করতে পারে। নারী-পুরুষের মতো প্রকৃতির জগতের প্রতিটি প্রাণী সত্তাকে মুক্ত করার তাগিদে চালিত হয়: প্রকৃতি এভাবে সত্তাকে মুক্ত হবার সুযোগ করে দিতে নিজেকে অতিক্রম করে যেতে বদ্ধপরিকর। এমনকি ভোগান্তিরও একটা পরিত্রাণমূলক ভূমিকা আছে, কারণ আমরা যতই কষ্ট ভোগ করি ততই এ জাতীয় কষ্ট হতে মুক্ত অস্তিত্বের কামনা করি। আমরা যতই প্রাকৃতিক জগতের সমস্যা মোকাবিলা করি ততই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা করি। আমরা যতই বুঝতে পারি যে, আমাদের জীবন বাহ্যিক শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত আমরা ততই পুরুসার পরম, নিয়ন্ত্রণহীন সত্তার আকাঙ্ক্ষা বোধ করি। কিন্তু আকাঙ্ক্ষাটুকু যত শক্তিশালী হোক না কেন, প্রায়শঃই একজন সাধু বস্তুজগৎ হতে নিজেকে মুক্ত করা কঠিন আবিষ্কার করেন। মরণশীল মানুষ আবেগের ঝঞ্ছাবিক্ষুব্ধ জীবন ও দেহের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভর করে বাঁচবে?
অচিরেই এই সমস্যার মুখোমুখি হলেন গৌতম। তিনি আবিষ্কার করলেন, সমক্ষ্যের সত্য সাধনা প্রকৃত মুক্তি বয়ে আনেনি। কিন্তু প্রথমে দীর্ঘপথ পেরিয়ে যান তিনি। আলারা কালাম শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করেন তাঁকে এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে অচিরেই তিনি ধম্ম উপলব্ধি করতে পারবেন, গুরুর সমান জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। এই মতবাদ আপন করে নেবেন। অল্প দিনেই প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আত্মস্থ করে নিলেন গৌতম। অচিরেই সংঘের অন্যান্য সদস্যের মতোই অনর্গল গুরুর শিক্ষা আবৃত্তি করতে শিখে গেলেন। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারলেন না। কিছু একটা ঘাটতি রয়েছে। আলারা কালাম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এইসব শিক্ষা ‘উপলব্ধি’ করতে পারবেন তিনি, সেগুলোর সম্পর্কে ‘প্রত্যক্ষ জ্ঞান’ অর্জন করবেন। সেসব আর বাহ্যিক সত্য হিসাবে রয়ে যাবে না বরং তার আপন সত্তার সঙ্গে মিশে গিয়ে জীবনের বাস্তবতায় পরিণত হবে। অচিরেই তিনি ধম্মের একজন জ্বলন্ত মূর্ত প্রকাশ হয়ে উঠবেন। কিন্তু তেমন কিছু ঘটছিল না। তিনি আলারা কালামের ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক মতবাদে ‘প্রবেশ করে’ তাতে ‘বসবাস’ করছেন না, শিক্ষা দূরবর্তী রয়ে গেছে। শিক্ষা অধিবিদ্যিক দূরবর্তী বিমূর্ত বিষয় রয়ে গেছে, তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সামান্যই সম্পর্ক আছে মনে হয়েছে। সর্বাত্মক প্রয়াস সত্ত্বেও প্রকৃত সত্তার কোনও আভাস পেলেন না তিনি। প্রকৃতির দুর্ভেদ্য আচ্ছাদনে একগুঁয়ের মতো আড়ালে রয়ে গেছে। এটা খুবই সাধারণ ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা। মানুষ প্রায়শঃই অন্যের সাক্ষ্য মেনে নিয়ে কোনও ঐতিহ্যের সত্যকে বিশ্বাস করে নেয়। কিন্তু দেখে যে, ধর্মের সারৎসার, আলোকময় সত্তা আড়ালে রয়ে গেছে। কিন্তু এই পথে চলার মতো অবকাশ গৌতমের ছিল না। কখনওই কোনও কিছু আপসে মেনে নেননি তিনি। পরে তাঁর নিজস্ব সংঘ গঠনের পর শিষ্যদের লাগাতার যে কোনও রকম জনশ্রুতিকে নির্বিচারে মেনে নিতে নিষেধ করেছেন। তারা যেন গুরুর সমস্ত কথাই বিনা সমালোচনায় মেনে না নেয়। বরং প্রত্যেক ক্ষেত্রে ধম্মকে যাচাই করে, নিজস্ব অভিজ্ঞতায় অনুরণিত হচ্ছে কিনা সেটা নিশ্চিত করে।
