নিজ নিজ এলাকায় উপনিবেশ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে কোনও কোনও মুসলিম শাসক স্বেচ্ছায় আধুনিকীকরণের প্রয়াস পেয়েছিলেন। অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ১৮২৬-এ জেনিসারিদের বিলুপ্তি ঘোষণা করে এক টানযিমাট (বিধি) জারি করেছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীকে আধুনিক করেন এবং কিছু নতুন প্রযুক্তি যোগ করেন। ১৮৩৯-এ সুলতান আবদুলহামিদ গুলহান (Gulhane) ডিক্রি জারি করেন, যার বলে তাঁর শাসন প্রজাদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কে পরিণত হয় এবং তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কারের চিন্তা করেছিলেন। অবশ্য মিশরের আলবেনীয় পাশা মুহাম্মদ আলীর (১৭৬৯-১৮৪৯) আধুনিকীকরণ কর্মসূচি ছিল আরও বেশী গতিশীল, তিনি মিশরকে কার্যত ইস্তাম্বুলের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে ফেলেন এবং বলতে গেলে একাকী এই পশ্চাদপদ প্রদেশটিকে আধুনিক বিশ্বে তুলে আনেন। কিন্তু তাঁর কৌশলের নিষ্ঠুরতা দেখায় যে, এত তীব্র গতিতে আধুনিকীকরণের প্রয়াস কতখানি অসুবিধাজনক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে দেন তিনি; বলা হয়ে থাকে, মিশরের সেচ আর নৌযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে তেইশ হাজার কৃষক প্রাণ দিয়েছিল; অন্য কৃষকরা মুহাম্মদ আলীর আধুনিক সেনাবাহিনীতে যোগদানের ভয়ে এতই শঙ্কিত ছিল যে, তারা নিজেরাই তাদের দেহ বিকৃত করেছে: কেউ হাতের আঙুল কেটেছে, কেউবা অন্ধ হয়ে গেছে। দেশকে সেক্যুলার করার জন্য মুহাম্মদ আলী স্রেফ ধর্মীয় কারণে প্রদত্ত জমিজমা রাজেয়াপ্ত করেন এবং পরিকল্পিতভাবে উলেমাদের ক্ষমতাহীন করে তোলেন, কোনও ক্ষমতাই আর তাদের রাখতে দেননি। ফলাফল, আধুনিকতাকে মারাত্মক আঘাত হিসাবে বিবেচনাকারী উলেমাগণ আরও বেশী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং স্বদেশে অস্তিত্বমান নতুন পৃথিবীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। মুহাম্মদ আলীর পৌত্র ইসমায়েল পাশা (১৮০৩-৯৫) ছিলেন আরও বেশী সফল: তিনি সুয়েয খালের নির্মাণ ব্যয় বহন করেন, নয়শো মাইল দীর্ঘ রেল পথ নির্মাণ করেন, এর আগে পর্যন্ত চাষাবাদ অযোগ্য ১৩,৭৩,০০০ একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেন, ছেলে এবং মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং কায়রোকে এক আধুনিক নগরীতে পরিবর্তন করেন। দুঃখজনকভাবে, উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি মিশরকে দেউলিয়া করে দেয়, দেশ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে বাধ্য হয় আর ইউরোপীয় শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৮৮২-তে সামরিক দখলদারি প্রতিষ্ঠার অজুহাত পায় ব্রিটেন। মুহাম্মদ আলী এবং ইসমায়েল মিশরকে আধুনিক স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উল্টো, আধুনিকীকরণের পরিণামে এটা কাৰ্যত স্রেফ ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল।
প্রাথমিক সময়ের এই সংস্কারকদের কেউই ইউরোপের পরিবর্তনের পেছনে ক্রিয়াশীল ধারণাসমূহ পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারেননি। সুতরাং তাঁদের সংস্কার প্রয়াস ছিল উপরিগত। কিন্তু সাদ্দাম হুসেইন পর্যন্ত পরবর্তীকালের সংস্কারকরা সবাই কেবল সামরিক প্রযুক্তি আর আধুনিক পশ্চিমের বাহ্যিক সৌন্দর্যই অর্জন করার প্রয়াস পেয়েছেন, সমাজের বাকি অংশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে একটুও চিন্তা করেননি। অবশ্য বেশ আগে থেকেই কোনও কোনও সংস্কারক এসব বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। প্রথম সতর্কবাণী উচ্চারণকারীদের অন্যতম হলেন ইরানি রাজনৈতিক কর্মী জামাল-আল-দিন (১৮৩৯-৯৭), নিজেকে যিনি “আল-আফগানি” (“আফগান”) বলে অভিহিত করেছিলেন; সম্ভবত তাঁর ধারণা ছিল ইরানি শিয়ার চেয়ে বরং আফগান সুন্নী হিসাবে মুসলিম বিশ্বে অনেক বেশী শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবেন তিনি। ১৮৫৭তে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু এবং মুসলিমদের মহাবিদ্রোহের সময় ভারতে অবস্থান করেছিলেন তিনি; আরব, মিশর, টার্কি, রাশিয়া কিংবা ইউরোপের যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই তিনি পশ্চিমের সর্বব্যাপী ক্ষমতার আঁচ পেয়েছেন এবং উপলব্ধি করেছেন যে, অচিরেই তা মুসলিম বিশ্বের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এবং ধ্বংস ডেকে আনবে। পাশ্চাত্য ধারার জীবনের অগভীর অনুকরণের বিপদ দেখতে পেয়েছিলেন তিনি এবং ইসলামী বিশ্বের জনগণের প্রতি ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে একাত্ম হবার আহ্বান জানিয়েছিলেন; তাদেরকে অবশ্যই নিজেদের মত করে নতুন বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে হবে। সুতরাং তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অর্থাৎ ইসলামের বিকাশ ঘটাতে হবে। কিন্তু খোদ ইসলামকেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রতি সাড়া দিয়ে আরও যৌক্তিক ও আধুনিক হয়ে উঠতে হবে। মুসলিমদের অবশ্যই দীর্ঘদিনব্যাপী “ইজতিহাদের রুদ্ধ দ্বারের” বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হবে, এবং স্বাধীন যুক্তির ব্যবহার করতে হবে, যেমনটি কুরান এবং পয়গম্বর নির্দেশ দিয়েছেন।
পাশ্চাত্যের দখলদারিত্ব রাজনীতিকে আবার ইসলামী অনুভূতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পয়গম্বর মুহাম্মদের(স:) আমল থেকেই মুসলিমরা চলমান ঘটনাবলীকে থিওফ্যানি হিসাবে দেখে এসেছে; তারা এমন একজন ঈশ্বরকে দেখেছে যিনি ইতিহাসে উপস্থিত রয়েছেন এবং একটি উন্নত বিশ্ব গড়ে তোলার স্থায়ী চ্যালেঞ্জ জারি করে রেখেছেন। মুসলিমরা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ঐশী তাৎপর্যের সন্ধান করেছে এবং তাদের ব্যর্থতা আর দুঃখজনক ঘটনাগুলো থিওলজি ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আব্বাসীয় খেলাফতের পতনের পর মুসলিমরা যখন কুরানের চেতনার অনেক কাছাকাছি এক ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল, তখন উম্মাহ্ রাজনৈতিক স্বাস্থ্য নিয়ে কম উদ্বিগ্ন ছিল তারা। অভ্যন্তরীণ ধার্মিকতার বিকাশ ঘটানোর স্বাধীনতা বোধ করেছিল। কিন্তু তাদের জীবনে পাশ্চাত্যের অনুপ্রবেশ জন্ম দিয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় জিজ্ঞাসার। উম্মাহ্ অপদস্থ হওয়ার ব্যাপারটা কেবল রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়, বরং মুসলিমদের একেবারে আত্মায় আঘাত হেনেছিল। নতুন দুর্বলতা ইসলামের ইতিহাসে মারাত্মক কোনও বিচ্যুতি ঘটে যাবারই লক্ষণ। কুরানের প্রতিশ্রুতি ছিল যে ঈশ্বরের প্রকাশিত ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণকারী কোনও সমাজ ব্যর্থ হতে পারে না। মুসলিম ইতিহাস এর সত্যতা প্রমাণ করে। বারবার, যখনই বিপদ নেমে এসেছে, ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেছে, ধর্মকে নতুন পরিস্থিতিতে বাঙময় করে তুলেছে এবং উম্মাহ্ কেবল পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠেনি বরং সাধারণভাবে আরও ব্যাপক সাফল্যের পথে অগ্রসর হয়েছে। সেক্যুলার, ঈশ্বরহীন পাশ্চাত্যের প্রাধান্যে ইসলামী জগৎ কেমন করে ক্রমাগত পতিত হতে পারছে? এই সময় পর্ব হতে মুসলিমরা অধিক সংখ্যায় এইসব প্রশ্নে আলোড়িত হতে থাকে এবং মুসলিম ইতিহাসকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তাদের প্রয়াসকে কখনও কখনও মরিয়া এবং এমনকি হতাশাব্যঞ্জক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আত্মঘাতী বোমারু বিমান- ইসলামী ইতিহাসের প্রায় নজীরবিহীন ঘটনা– দেখায় যে কোনও কোনও মুসলিম ধরে নিয়েছিল যে তারা অনতিক্রম্য বাধার মুখোমুখি হয়েছে।
