সুতরাং, নতুন ইউরোপের বৈশিষ্ট্য প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে মুসলিমদের পক্ষে নিরেট কোনও যুক্তি ছিল না। বহু শতাব্দী ধরে এমন কিছু মূল্যবোধের বিকাশ ঘটিয়েছে তারা যেগুলো আধুনিক পশ্চিমের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিভাত হবে: সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তীব্র আবেগ, এক সাম্যবাদী রাজনীতি, বাক স্বাধীনতা এবং তাওহীদের আদর্শ সত্ত্বেও, প্রকৃতপ্রস্তাবে যা (শিয়াবাদের ক্ষেত্রে) ধর্ম ও রাজনীতির নীতিগত বিচ্ছিন্নতা। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ অধিকাংশ সচেতন মুসলিম মানতে বাধ্য হয় যে ইউরোপ তাদের ছাড়িয়ে গেছে। গোড়ার দিকে অটোমানরা ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে নাস্তানাবুদ করেছিল বটে, কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে তারা আর তাদের সামনে দাঁড়াতেই পারছিল না, সমানে সমানে লড়তেও পারছিল না তারা। ষোড়শ শতাব্দীতে সুলেইমান ইউরোপীয় বণিকদের কূটনৈতিক নিরাপত্তা (Immunity) দান করেন। এই চুক্তিগুলো ক্যাপিটুলেশনস (কারণ এগুলো প্রণীত হয়েছিল capita : শিরোনামের নিচে) নামে পরিচিত ছিল যার সারকথা ছিল এই যে অটোমান এলাকায় বাসকারী ইউরোপীয় বণিকদের দেশীয় আইন মেনে চলার আবশ্যকতা নেই; তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী নিজেদের আদালতে তাদের অপরাধের বিচার হত, যেখানে সভাপতিত্ব করতেন তাদের নিজস্ব কনসাল। সুলেইমান সমপর্যায়ে থেকে ইউরোপের বিভিন্ন জাতির সঙ্গে এইসব চুক্তিতে উপনীত হয়েছিলেন। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে ক্যাপিটুলেশনগুলো অটোমানদের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে, বিশেষ করে ১৭৪০-এ যখন সাম্রাজ্যের ক্রিশ্চান মিল্লেটদের (millets) জন্যে পরিবর্তিত হল, ইউরোপীয় বিদেশীদের মতই “নিরাপত্তার অধিকারী” (Protected) হয়ে উঠল তারা, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন রইল না আর।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অংশে এসে অটোমান সাম্রাজ্যের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে দাঁড়ায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও অবনতি ঘটে; অরবীয় প্রদেশগুলোর বেদুঈন গোত্রগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়; আর স্থানীয় পাশাগণ আর ইস্তাম্বুলের যাথাযথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলেন না, প্রায়শ দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়েছিলেন তাঁরা, জনগণকে শোষণ করতে থাকেন। এদিকে পাশ্চাত্য অবশ্য একের পর এক জয় লাভ করে যাচ্ছিল। কিন্তু অটোমানগণ অযথা উদ্বিগ্ন বোধ করেনি। সুলতান তৃতীয় সেলিম ইউরোপকে অনুসরণ করার প্রয়াস পান, তিনি ভেবেছিলেন পশ্চিমা কায়দায় সেনাবাহিনীর সংস্কার করা গেলে শক্তির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যাবে। ১৭৮৯তে তিনি ফরাসি ইন্সট্রাকটরদের নিয়ে সামরিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, যেখানে ছাত্ররা ইউরোপীয় ভাষা শিক্ষা আর আধুনিক মার্শাল আর্টের পাশাপাশি নতুন পাশ্চাত্য বিজ্ঞান অধ্যায়ন করে। কিন্তু পশ্চিমের হুমকি মোকাবিলার জন্যে এসব যথেষ্ট ছিল না ৷ মুসলিমরা বুঝে উঠতে পারেনি যে অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ইউরোপ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের এক সমাজের বিকাশ ঘটিয়েছে, এবং এখন অপ্রতিরোধ্যভাবে ইসলামী বিশ্বকে অতিক্রম করে গেছে- অচিরেই বিশ্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠবে তারা।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ তিনটি বিশাল সাম্রাজ্যই পতনের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল। এর কারণ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অযোগ্যতা বা অদৃষ্টবাদ নয়, যেমনটি ইউরোপীয়রা প্রায়ই উদ্ধতভাবে মনে করে থাকে। যেকোনও কৃষিনির্ভর রাজনীতির আয়ুষ্কাল সীমাবদ্ধ এবং এই মুসলিম রাজ্যগুলো, যা কৃষিভিত্তিক আদর্শের চূড়ান্ত বিকাশের প্রতিভূ ছিল, স্রেফ স্বাভাবিক এবং অনিবার্য সমাপ্তির মুখোমুখি হয়েছে। প্রাক-আধুনিক যুগে পশ্চিমা ও ক্রিশ্চান সাম্রাজ্যও উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে। ইসলামী রজ্যেও ইতিপূর্বে পতন ঘটেছে; প্রতিবারই মুসলিমরা ভস্মস্তূপ থেকে ফিনিক্সের মত পুনরুজ্জীবিত হতে পেরেছে এবং এগিয়ে গেছে উত্তরোত্তর ব্যাপক সাফল্যের দিকে। কিন্তু এবারের ব্যাপারটি ছিল ভিন্ন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে মুসলিমদের দুর্বলতা আর পাশ্চাত্যের একেবারে ভিন্ন ধরনের সভ্যতা সমসাময়িক হয়ে দাঁড়ায় এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা অনেক বেশী দুরূহ বলে আবিষ্কার করবে মুসলিম বিশ্ব।
০. ইসলামের ঘটনাক্রমপঞ্জী
অনুবাদকের কথা
বিশ্বের নবীন এবং আধুনিকতম একেশ্বরবাদী ধর্ম ইসলামকে নিয়ে ক্যারেন আর্মস্ট্রং লিখেছেন ইসলাম: আ শর্ট হিস্ট্রি গ্রন্থটি। সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা দেয়ার প্রয়াস পেয়েছেন লেখক এ গ্রন্থের মাধ্যমে। পয়গম্বর মুহাম্মদের (স:) মাধ্যমে প্রবর্তনের পর থেকে শুরু করে রাশিদুনদের আমল, একাধিক ফিৎনাহ্র বিবরণ, ইসলামে খেলাফতের নামে রাজতন্ত্রের আবির্ভাব, ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার, বিভাজন, পতন এবং তার পেছনে ক্রিয়াশীল কারণ বিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন ক্যারেন আর্মস্ট্রং। বিভিন্ন সময়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিলুপ্তির উপান্তে পৌঁছেও ইসলাম ধর্ম কোন বৈশিষ্ট্য বা সুপ্ত শক্তির কারণে পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠেছে বারবার তাও দেখিয়েছেন লেখক। দেখিয়েছেন কখনও ইসলামের নামে আবার কখনও আধুনিকতা আর সেক্যুলারিজমের দোহাই দিয়ে মুসলিম শাসকরা কীভাবে ইসলামের মৌল নীতি অর্থাৎ সমতার মূল্যবোধের লংঘন করেছেন, নির্যাতন চালানোর মাধ্যমে রুদ্ধ করেছেন ভিন্নমত। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতায় ইসলামকে কেন আপাতদৃষ্টিতে পশ্চাদবর্তী বলে মনে হচ্ছে বোঝার প্রয়াসে লেখক ব্যাখ্যা খাড়া করেছেন, সেই সঙ্গে তুলে ধরেছেন আগামীর উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে, যা ভাবনার খোরাক জোগায়, আশাবাদী করে তোলে। ইসলামের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মীয় আন্দোলন ও অতীন্দ্রিয়বাদী মতবাদ তুলে ধরে দেখিয়েছেন ধর্মটির অন্তর্নিহিত শক্তিকে। এ-বইটি পাঠ করে একজন সাধারণ আগ্রহী পাঠক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি এখানে সন্নিবেশিত তথ্য দর্শন ও ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষার্থীদেরও প্রয়োজন মেটাবে বলে বিশ্বাস করি।
