.
.
.
৩.৩ অর্থ
যে পণ্যটি নিজেই স্বশরীরে বা কোন প্রতিনিধির মাধ্যমে মূল্যের পরিমাপ হিসেবে কাজ করে, সেই পণ্যটিই হচ্ছে অর্থ। অতএব সোনা { কিংবা রূপা) হচ্ছে অর্থ। একদিকে যখন তাকে নিজেকেই তার স্বর্ণময় স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে হয়, তখন সে কাজ করে অর্থ হিসেবে। তখন সে মূল্যের পরিমাপ হিসেবে, কিংবা সঞ্চলনী মাধ্যম হিসেবে অন্যের প্রতিনিধিত্বে উপস্থাপিত হতে সক্ষম ভাগবতরূপমাত্র নয়; তখন সে হচ্ছে অর্থপণ্য। অন্যদিকে সে অর্থ হিসেবেও কাজ করে, যখন সে নিজের কর্মগুণে তা সে কর্ম স্বয়ং স্বশরীরে সম্পাদিত হোক বা কোন প্রতিনিধির মাধ্যমেই সম্পাদিত হোক-মূর্ত হয়ে ওঠে মূল্যের একমাত্র রূপ হিসেবে বাকি সমস্ত পণ্য যে-ব্যবহারমূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, তার বিপরীতে বিনিময়মূল্যের অস্তিত্বধারণের একমাত্র যথোপযোগী রূপ হিসেবে।
ক. মওজুদ
রূপান্তরণের দুটি বিপরীতমুখী আবর্তের মধ্যে পণ্যসমূহের এই যে নিবন্তর আবর্তন কিংবা বিক্রয় ও ক্রয়ের এই যে বিরতিবিহীন পরম্পরা, তা প্রতিফলিত হয় অর্থের অবিরাম চলাচলে কিংবা সঞ্চলনের ‘perpetuum mobile” হিসেবে অর্থের যে ভূমিকা সেই ভূমিকায়। কিন্তু যে-মুহূর্তে রূপান্তরণ বাধাপ্রাপ্ত হয়, যে-মুহূর্তে বিক্রয় আর তৎপরবর্তী ক্রয়ের দ্বারা পরিপূরিত না হয়, সেই মুহূতেই অর্থও হয়ে পড়ে চমৎশক্তিরহিত; বয়সগিলেবাট্-এর ভাষায় বলা যায় যে সে রূপান্তরিত হয় “জঙ্গম” থেকে “স্থাবরে”, সচল থেকে অচলে, মুদ্রা থেকে অর্থে।
পণ্যদ্রব্যাদির সঞ্চলনের সেই প্রথম পর্যায়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গেই, বিকাশ লাভ করে প্রথম রূপান্তরণের ফলটিকে ধরে রাখবার আবশ্যিকতা ও উদগ্র কামনা। এই ফলটি হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পণ্যেরই পরিবর্তিত রূপ কিংবা তার স্বর্ণস্ফটিক।[১] অতএব অন্যান্য পণ্য ক্রয় করার জন্য পণ্যাদি বিক্রয় করা হয় না; বিক্রয় করা হয় তাদেব অর্থরূপকে তাদের পণ্যরূপের স্থলাভিষিক্ত করার জন্য। কেবলমাত্র পণ্য সঞ্চলন সম্পাদন করার মাধ্যম হিসেবে না থেকে, এইরূপ পরিবর্তনই হয়ে ওঠে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এইভাবে সংশ্লিষ্ট পণ্যটির পরিবর্তিত রূপটির বিরত রাখা হয় তার নিঃশর্তভাবে পরকীকরণীয় রূপ হিসেবে যে কাজ তথা তার বিশুদ্ধ ক্ষণস্থাৰী অৰ্থরূপ হিসেবে যে কাজ, সেই কাজটি সম্পাদন করা থেকে অর্থশিলীভূত হয় মওজুদের আকারে এবং বিক্রেতা পরিণত হয় অর্থের মওজুদদারে।
পণ্য-সঞ্চলনের গোড়ার যুগগুলিতে কেবল উদ্বৃত্ত ব্যবহার-মূল্যই রূপান্তরিত হত অর্থে। সুতরাং সোনা এবং রূপা নিজেরাই তখন দেখা দিত বাহুল্য বা ধনসমৃদ্ধির সামাজিক অভিব্যক্তি হিসেবে। যে সমস্ত সমাজে আভ্যন্তরীণ অভাবগুলি যোগাবার জন্য একটি নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ পরিমাণ দ্রব্যাদি চিরাচরিত উৎপাদন-পদ্ধতি অনুসারে উৎপন্ন হয়, সেইসব সমাজেই কেবল মওজুদের এই সরল রূপটি চালু থাকে। এশিয়া এবং বিশেষ করে, ইষ্ট ইণ্ডিজের জন জীবনে এই ঘটনাই ঘটেছে। ভাণ্ডারলিন মনে করেন যে, কোন দেশে দাম নির্ধারিত হয় সেই দেশে প্রাপ্ত সোনা ও রূপার পরিমাণের দ্বারা; তিনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন ভারতের পণ্যসামগ্রী এত সস্তা কেন। তার উত্তর এই : কারণ হিন্দুরা (ভারতীয়) তাদের অর্থ এই মাটির তলায় পুতে রাখে। ১৬০২ থেকে ১৩৪ সাল পর্যন্ত, তার মন্তব্য অনুসারে, মাটির তলায় পুতে রাখা অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ১৫০ মিলিয়ন রৌপ্য নির্মিত পাউণ্ড স্টার্লিং যা শুরুতে এসেছিল আমেরিকা থেকে ইউরোপ।[২] ১৮৫৬ থেকে ১৯১৮ সালের এই দশ বছরে মধ্যে ইংল্যাণ্ড ভারতে এবং চীনে রূপার অঙ্কে রপ্তানী করে £১২০,০০০,০০০ পউণ্ড-যা। পাওয়া গিয়েছিল অষ্ট্রেলিয়ার সোনার বিনিময়ে। চীনে যে-পরিমাণ রূপা রপ্তানী করা হয়েছিল তার বেশির ভাগটাই ভারতে চলে যায়।
পণ্য-উৎপাদন বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে, প্রত্যেক উৎপাদনকারীই ‘nexus rerum’ বা সামাজিক অঙ্গীকারটি পম্পর্কে নিশ্চয়তা লাভ করতে বাধ্য হয়েছিল।[৩] তার অভাবগুলি নিরন্তর তাকে তাড়না করে এবং অন্যান্য লোকজনের কাছ থেকে পণ্যাদি ক্রয় করতে নিরন্তর বাধ্য করে, যখন তার নিজের পণ্য উৎপাদনে সময়ের প্রয়োজন পড়ে এবং নানাবিধ ঘটনারর উপরে নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে বিক্রয় না করেও ক্রয় করার জন্য, সে নিশ্চয়ই আগেভাগে ক্রয় না করেও বিক্র করে থাকবে। এই প্রক্রিয়া ব্যাপক আকারে চললে একটি দ্বন্দ্ব আত্ম প্রকাশ করে। কিন্তু মহার্ঘ ধাতুগুলি তাদের উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সরাসরি বিনিমিত হয়। এবং এখানে। আমরা বিক্রয় প্রত্যক্ষ করি (পণ্য দ্রব্যাদি মালিকদের দ্বারা ক্রয় ব্যাতিরেকেই (সোনা ও রূপার মালিকদের দ্বারা)। [৪] এবং অন্যান্য উৎপাদনকারীদের দ্বারা পরবর্তী বিক্রয়াদি-যে-বিক্রয়াদির পরে কোন ক্ৰয়াদি ঘটেনি-এমন বিক্রয়াদি কেবল সংঘটিত করে নতুন উৎপাদিত মাহার্ঘ ধাতুসমূহের বণ্টন-পণ্যদ্রব্যাদির সকল মালিকদের মধ্যে। এইভাবে আগাগোড়া বিনিময়ের ধারা ধরে বিভিন্ন পরিমাণের সোনা ও রূপার মওজুদ সঞ্চিত হতে থাকে। একটি বিশেষ পণ্যের আকারে বিনিময়-মূল্য ধরে রাখা ও সঞ্চিত কৰাৰ এই সম্ভাব্যতার সঙ্গে সঙ্গে সোনার প্রতি লোলুপতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সঞ্চলনের সম্প্রসারণ-লাভের সঙ্গে সঙ্গে, বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় অর্থের ক্ষমতা–ব্যবহারের জন্য সদা-প্রস্তুত, ধনসম্পদের নিঃশর্ত সামাজিক রূপস্বরূপ যে অর্থ তার ক্ষমতা। “সোনা একটা আশ্চর্য জিনিস! যে-ই সোনার মালিক, সে তার সব চাওয়া-পাওয়ারও মালিক সোনার দৌলতে আত্মাগুলোকেও এমনকি স্বর্গে পর্যন্ত চালান করে দিতে পারে।” [ কলাম্বাস-এ জামাইকা থেকে লেখা চিঠি, ১৫০৩] যেহেতু কোন জিনিসটা সোনার রূপাতি হয়েছে সেটা সে ফাস করে দেয়না, সেহেতু, পণ্য হোক, বা না হোক, সব কিছুই সোনায় রূপান্তরিত হতে পারে। সব কিছুই হয়ে ওঠে বিক্রয়হোগ্য এবং ক্রয়যোগ্য। সঞ্চলন পরিণত হয় এমন একটি বিরাট সামাজিক বকযন্ত্রে যার মধ্যে সব কিছুই নিক্ষিপ্ত হয় কেবল আবার স্বর্ণস্ফটিকের আকারে নিষ্ক্রান্ত হবার জন্য। এমনকি সাধুসন্তদের অস্থি পর্যন্ত এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া থেকে আত্মরক্ষা করতে পারেনা, তা থেকে ঢের বেশী কমনীয় res sacrosanctae, extra commercium hominum’-এর বেলায় তো আত্মরক্ষার প্রশ্নই ওঠে না।[৫] যেমন পণ্যদ্রব্যাদির প্রত্যেকটি গুণগত পার্থক্যই অর্থে নির্বাণ লাভ করে, ঠিক তেমনি অর্থও আবার আমূল সমতাবাদী হিসেবে তার যে ভুমিকা, সেই ভূমিকায় সমস্ত পার্থক্যকে সমান করে দেয়। [৬]কিন্তু অর্থ নিজেও তো একটা পণ্য, একটা বাহ্য বিষয় যা কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে। এইভাবে সামাজিক ক্ষমতা পরিণত হয় ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষমতায়। এই জন্যই প্রাচীনের। অর্থকে ধিক্কার জানিয়েছেন অর্থনৈতিক ও নৈতিক বিধিব্যবস্থার পক্ষে বিপর্যয়কর বলে। আধুনিক সমাজ-যে সমাজ ভূমিষ্ঠ হবার অব্যবহিত পরেই পৃথিবীর জঠর থেকে [৭] পুটাসকে চুল ধরে টেনে তোলে—সেই সমাজ সোনাকে বন্দনা করে তার পবিত্র পাত্র হিসেবে, তার নিজের জীবনের মৌল তত্ত্বের জ্যোতির্ময় বিগ্রহ হিসেবে।
