আমরা দেখেছি যে বাকি সমস্ত পণ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যে মূল্য-সম্পর্ক সমূহ বিদ্যমান, সেই সম্পক সমূহেরই প্রতিক্ষেপ হচ্ছে অর্থ-রূপ-যা উৎক্ষিপ্ত হয়েছে একটি মাত্র পণ্যের উপরে। সুতরাং ঐ অর্থও যে একটা পণ্য(৯) তা কেবল তাঁদের কাছে একটা নতুন আবিষ্কার বলে প্রতীয়মান হবে যারা তাঁদের বিশ্লেষণ শুরু করেন। অর্থের পূর্ণ-বিকশিত রূপটি থেকে। অর্থরুপে রূপান্তরিত পণ্যটি বিনিময়-ক্রিয়ার ফলে মূল্য-মণ্ডিত হয় না, কেবল তার নির্দিষ্ট মূল্যরূপ প্ৰাপ্ত হয়। এই দুটি সুস্পষ্ট ভাবে আলাদা আলাদা ব্যাপারকে একাকার করে ফেলে কিছু কিছু লেখক এই সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌছেছেন যে সোনা এবং রূপের মূল্য হচ্ছে কাল্পনিক(১০) কতকগুলি ব্যাপারে অর্থের নিছক প্ৰতীকগুলিই যে অর্থের কাজ করে থাকে তা থেকে আরো একটা ভ্ৰাস্ত ধারণার উদ্ভব হয় তা এই যে অর্থে নিজেই একটা প্ৰতীক মাত্র। যাই হোক এই ভ্ৰাস্তির পেছনে একটি মানসিক সংস্কার উকি দেয় তা এই যে কোন সামগ্রীর অৰ্থরূপ সেই সামগ্ৰীটি থেকে বিচ্ছেদ্য কোন অংশ নয়, বরং সেটা হল এমন একটা রূপ যার মাধ্যমে কতকগুলি সামাজিক সম্পর্কের আত্মপ্ৰকাশ ঘটে। এই দিক থেকে প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে একটি প্রতীক কেননা যেহেতু তা হচ্ছে মূল্য, সেই হেতু সে হচ্ছে তার উপরে ব্যয়িত মনুষ্য-শ্রমের বস্তুগত লেফাফা মাত্ৰ।(১১) কিন্তু যদি ঘোষণা করা হয় যে একটা নির্দিষ্ট উৎপাদন-পদ্ধতির অধীনে বিভিন্ন সামগ্ৰী কর্তৃক অজিত সামাজিক চরিত্রগুলি কিংবা শ্রমের সামাজিক গুণাবলী কর্তৃক অজিত বস্তুগত রূপগুলি নিছক প্ৰতীক মাত্র, তা হলে একই নিঃশ্বাসে এটাও ঘোষণা করা হয় যে, এই চরিত্র-বৈশিষ্ট্যগুলি মানবজাতির তথাকথিত সর্বজনীন সম্মতির দ্বারা অনুমোদিত খেয়ালখুশিমতো দেওয়া অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। আঠারো শতকে এই ধরনের ব্যাখ্যা বেশ সমর্থন লাভ করেছিল। মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কগুলি নানান ধাঁধা-লাগানা রূপ ধারণ করেছিল, সেগুলি ব্যাখ্যা করতে না পেরে, লোকে চেয়েছিল সেগুলির উৎপত্তি সম্বন্ধে একটা গৎবাঁধা বৃত্তান্ত হাজির করে সেগুলিকে তাদের অদ্ভুত দৃশ্যরূপ থেকে বিবস্তু করতে।
এর আগেই উপরে মন্তব্য করা হয়েছে যে পণ্যের সমার্ঘ্যরূপ তার মূল্যের পরিমাণ বোঝায় না। সুতরাং যদিও আমরা এ-বিষয়ে অবহিত থাকতে পারি। যে সোনা হচ্ছে অর্থ, এবং সেই কারণেই তা বাকি সব পণ্যের সঙ্গে সরাসরি বিনিমেয়, তবু কিন্তু এই তথ্য থেকে আমরা এটা কোন ক্রমেই জানতে পারিন যে এতটা সোনার, ধরা যাক, ১০ পাউণ্ড সোনার মূল্য কতটা। অন্যান্য পণ্যেধ ক্ষেত্রে যেমন, অর্থের ক্ষেত্রেও তেমন, অন্যান্য পণ্যের মাধ্যমে ছাড়া সে তার নিজের মূল্য প্রকাশ করতে পারে না। এই মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনে প্রয়োজনীয় শ্ৰম-সময়ের পরিমাণ দিয়ে এবং তা প্ৰকাশিত।– হয় একই পরিমাণ শ্রম সময়ে উৎপাদিত অন্য যে-কোন পণ্যের মাধ্যমে।(১২) তার মূল্যের এবং বিধ পরিমাণগত নির্ধারণ তার উৎপাদনের উৎসক্ষেত্রেই দ্ৰব্য-বিনিময় প্রথার মাধ্যমে হয়ে থাকে। যখন তা অর্থক্কাপে চলাচল করতে শুরু করে তাধ আগেই কিন্তু তার মূল্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। সতের শতকের শেষের দশকগুলিতেই এটা প্ৰতিপন্ন হয়ে গিয়েছিল যে, অর্থ হচ্ছে একটা পণ্য , কিন্তু এই বক্তব্যে আমরা যা পাই তা হল এই বিশ্লেষণের শৈশব্যাবস্থা। অর্থ যে একটা পণ্য সেটা আবিষ্কার করা তেমন একটা সমস্যা নয়; সমস্যা দেখা দেয়। তখন যখন আমরা চেষ্টা করি কেন, কিভাবে, কি উপায়ের মাধ্যমে পণ্য অর্থে পরিণত হয়।(১৩)
মূল্যের সব চাইতে প্রাথমিক অভিব্যক্তি থেকে আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পেয়েছি যে ও পণ্য ক = ঔ পণ্য খ, দেখতে পেয়েছি যে যে সামগ্ৰীটি অন্য একটি সামগ্রীর মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, সেই সামগ্ৰীটি প্ৰতীত হয় যেন তার এই, সম্পর্ক থেকে নিরপেক্ষভাবেই এক সমার্ঘ রূপ আছে-যে-রূপটি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক গুণ যা প্ৰকৃতি তাকে দান করেছে। আমরা এই মিথ্যা প্ৰতীতিকে বিশ্লেষণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত তার চূড়ান্ত প্ৰতিষ্ঠা অবধি গিয়েছি; এই চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা তখনি পূর্ণ-সম্পন্ন হয় যখনি সর্বজনীন সমার্ঘ রূপটি একটি বিশেষ পণ্যের দৈহিক রূপের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করে এবং এইভাবে অর্থ-রূপে স্ফটিকায়িত (কেলাসায়িত) হয়। যা ঘটে বলে দেখা যায়, তা এই নয় যে সোনা পরিণত হয় অর্থে এবং তার ফলে বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য প্ৰকাশিত হয় সোনার মাধ্যমে, বরং উলটো যে, বাকি সমস্ত পণ্য সর্বজনীনভাবে তাদের মূল্য প্রকাশ করে সোনার মাধ্যমে কেননা সোনা হচ্ছে “অৰ্থ। আদ্যন্ত প্রক্রিয়াটির মধ্যবর্তী পৰ্যায়গুলি ফলতঃ অদৃশ্য হয়ে যায়; পেছনে কোনো চিহ্নই রেখে যায় না। পণ্যরা দেখতে পায় যে তাদের নিজেদের কোনো উদ্যোগ ছাড়াই তাদের মূল্য তাদেরই সঙ্গের আরেকটি পণ্যের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্ৰকাশিত হয়ে গিয়েছে। সোনা ও রূপো-এই সামগ্ৰীগুলি যেই মুহূর্তে পৃথিবীর জঠর থেকে বেরিয়ে আসে, সেই মুহুর্তেই তারা হয়ে ওঠে সমস্ত মনুষ্য-শ্রমের প্রত্যক্ষ মূর্তরূপ। এখান থেকেই অর্থের যাদু। উপস্থিত যে-সমাজ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সে সমাজে উৎপাদনের সামাজিক প্রক্রিয়ায় মানুষের আচরণ নিছক আণবিক (অণুর মতো)। এই কারণে উৎপাদন-প্ৰণালীতে তাদের সম্পর্কগুলি ধারণ করে এমন একটি বস্তুগত চরিত্র যা তাদের নিয়ন্ত্রণ ও সচেতন ব্যক্তিগত ক্রিয়াকর্ম থেকে নিরপেক্ষ। এই ঘটনাগুলি প্ৰথমে আত্মপ্ৰকাশ করে সাধারণ ভাবে উৎপন্ন দ্রব্যসমূহের পণ্যের রূপ পরিগ্রহ করার মধ্যে। আমরা দেখেছি কেমন করে পণ্য-উৎপাদনকারীদের এক সমাজের ক্ৰমিক অগ্রগতির ফলে একটি বিশেষ পণ্য অর্থ-রূপের মোহরাঙ্কিত হয়ে বিশেষ মৰ্যাদায় অধিষ্ঠিত হল। সুতরাং অর্থ যে কুহেলি সৃষ্টি করে তা আসলে পণ্যেরই সৃষ্ট কুহেলি; বৈশিষ্ট্য শুধু এইটুকু যে অর্থের কুহেলি তার সবচাইতে চোখ ধাঁধানে রূপ দিয়ে আমাদের ধাঁধিয়ে দেয়।
