————
১. এটা বলা ঠিক নয় যে (এখানে কেবল টাকার অঙ্কে প্রকাশিত মজুরির কথা বলা হয়েছে) মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে, কেননা তা অপেক্ষাকৃত সস্তা দামে অপেক্ষাকৃত বেশি জিনিস ক্রয় করতে পারছে। (ডেভিড বুকানন কৃত অ্যাডাম স্মিথের ওয়েলথ…’-এর সংস্করণে, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ৪১৭, টীকা)।
২. আমরা অন্যত্র আলোচনা করব উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কে কোন্ কোন ঘটনা এই নিয়মটিকে আলাদা শিল্প-শাখার সঙ্গে উপযোজিত করতে পারে।
৩. অ্যাডাম স্মিথের বিরুদ্ধে তার তর্কযুদ্ধে জেমস এণ্ডার্সন মন্তব্য করেন। “অনুরূপ ভাবে এই প্রসঙ্গেও মন্তব্য হওয়া উচিত যে, যদিও শ্রমের দাম দরিদ্র দেশগুলিতে সচরাচর কম, যেখানে মাটির ফসল এবং সাধারণ ভাবে দানাশস্য সন্তা, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বাস্তবিক পক্ষে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। কারণ শ্রমিককে দিন-প্রতি যে মজুরি দেওয়া হয়, তা শ্রমের আসল দাম নয়, যদিও তা তার আপাত দাম। আসল দাম হল যা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম সম্পাদন করার জন্য নিয়োগকর্তাকে বস্তুতই ব্যয় করতে হয়। এবং এই আলোতে দেখলে, শ্রম প্রায় সর্ব ক্ষেত্রেই দরিদ্র দেশের তুলনায় ধনী দেশে সস্তা, যদিও দানাশস্য ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর দাম ধনী দেশের তুলনায় দরিদ্র দেশে ঢের কম। দিনের ভিত্তিতে হিসাব করা শ্রম ইংল্যাণ্ডের তুলনায় স্কটল্যাণ্ডে অনেক কম। সংখ্যার ( ‘পিস-এর ভিত্তিতে হিসাব করা শ্রম ইংল্যাণ্ডে সাধারণতঃ অপেক্ষাকৃত সস্তা।” (জেমস এণ্ডার্সন, অবজার্ভেশনস অন দি মিনস অব এক্সাইটিং এ স্পিরিট অব ন্যাশনাল ইণ্ডাষ্ট্রি’, ১৭৭৭, পৃ: ৩৫, ৩৫১)। বিপরীত দিকে, মজুরির নিম্নহার আবার তার বেলায় শ্রমের মহাতা ঘটায়। ইংল্যাণ্ডের তুলনায় আয়াল্যাণ্ডে শ্রম মহার্ঘতর কেননা মজুরি এত বেশি নিয়তর। (নং ২০৭৪, “রয়্যাল কমিশন অন রেলওয়েজ, মিনিটস’, ১৮৬৭)।
৪. ‘এসে অন দি রেট অব ওয়েজেস উইথ অ্যান এগজামিনেশন অব দি কজেস অব দি ডিফারেন্সস ইন দি কণ্ডিশন অব দি লেবারিং পপুলেশন থআউট দি ওয়ান্ড” ফিলাডেলফিয়া, ১৮৩৫। (মজুরির হার প্রসঙ্গে প্রবন্ধ : তৎসহ সমগ্র বিশ্বে শ্রম জীবী জনসংখ্যার অবস্থায় পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে একটি সমীক্ষা)।
২৩. সরল পুনরুৎপাদন
সপ্তম বিভাগ —মূলধনের সঞ্চয়ন
মুল্যের যে-পরিমাণটি মূলধন হিসাবে কাজ করতে যাচ্ছে, তা যে-প্রথম পদক্ষেপটি নেয়, সেটি হল একটি টাকার অঙ্ককে উৎপাদনের উপায়-উপকরণে এবং শ্রমশক্তিতে রূপান্তরিতকরণ। এই রূপান্তরণ ঘটে বাজারে, সঞ্চলনের পরিধির মধ্যে। দ্বিতীয় পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ হয় তখনি, যখন উৎপাদনের উপায় উপকরণগুলি এমন পণ্যদ্রব্যাদিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যার মূল্য সেই দ্রব্যাদির গঠনকারী অংশগুলির মূল্যকে ছাড়িয়ে বেশি হয়, এবং সেই কারণে বিধৃত করে প্রারম্ভে অগ্রিম-প্রদত্ত মূলধনটিকে একটি উদ্বৃত্ত-মূল্যকে। এই পণ্যদ্রব্যগুলিকে তখন অবশ্যই সঞ্চলনে ছুড়ে দিতে হবে, সেগুলিকে বিক্রি করতে হবে, সেগুলির মূল্যকে টাকার অঙ্কে রূপায়িত করতে হবে, এই টাকাকে আবার নোতুন করে মূলধনে রূপান্তরিত করতে হবে—এবং এই ভাবেই চলতে থাকবে বারংবার।
সঞ্চয়নের প্রথম শর্ত এই যে, ধনিক নিশ্চয়ই তার পণ্যদ্রব্যাদি বিক্রয়ের এবং এই ভাবে প্রাপ্ত টাকার বৃহত্তর অংশকে মূলধন পুনঃরূপান্তরিত করার বন্দোবস্ত করেছে। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলিতে আমরা ধরে নেব যে, মূলধন তার স্বাভাবিক পথে সঞ্চলন করছে। দ্বিতীয় গ্রন্থে এই প্রক্রিয়াটির বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হবে।
যে-ধনিক উদ্বৃত্ত-মূল্য উৎপাদন করে, অর্থাৎ যে ধনিক শ্রমিকদের কাছ থেকে সরাসরি মজুরি-বঞ্চিত শ্রম আদায় করে এবং তাকে পণ্যদ্রব্যের মধ্যে স্থাপন করে, সে বস্তুতই এই উদ্বৃত্ত-মূল্যের প্রথম অধিকারকারী, কিন্তু কোন মতেই শেষ স্বত্বাধিকারী নয়। তাকে তা ভাগ করে নিতে হয় ধনিকদের সঙ্গে ভূস্বামী ইত্যাদিদের সঙ্গে, যারা সামাজিক জটিল বিন্যাসের মধ্যে অন্যান্য কাজ সম্পাদন করে। সুতরাং, উদ্বৃত্ত মূল্য নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তার অংশগুলি বিভিন্ন বর্গের ব্যক্তিদের ভাগে পড়ে এবং পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র বিবিধ আকার ধারণ করে, যেমন মুনাফা সুদ, ধনিকের মুনাফা, খাজনা ইত্যাদি। কেবল তৃতীয় গ্রন্থে গিয়েই আমরা উদ্বৃত্ত-মূল্যের এই সব উপযোজিত রূপ নিয়ে আলোচনার অবকাশ পাব।
তা হলে, এক দিকে সঞ্চলনের পরিধির মধ্যে থাকাকালে মূলধন যেসব নোতুন নোতুন রূপ পরিগ্রহ করে কিংবা এই সব রূপের অন্তরালে যে বাস্তব অবস্থাগুলি থাকে, সেগুলি সম্পর্কে মাথা না ঘামিয়ে, আমরা ধরে নিচ্ছি যে, ধনিক যে পণ্যভ্রব্যাদি উৎপাদন করে, সে সেগুলিকে তাদের স্ব-মূল্যেই বিক্রি করে। অন্য দিকে আমরা ‘নিক উৎপাদনকারীটিকে গণ্য করছি সমগ্র উদ্বৃত্ত-মূল্যের স্বত্বাধিকারী হিসাবে, বরং বলা ভাল, লুঠের মালে তার সঙ্গে বখরা নেয় এমন তামাম বখরাদারের প্রতিনিধি হিসাবে। সুতরাং, আমরা সর্বপ্রথমে মূলধন সঞ্চয়নকে আলোচনা করব একটি অমূর্ত দৃষ্টিকোণ থেকে—অর্থাৎ উৎপাদনের বাস্তব প্রক্রিয়ায় নিছক একটি পর্যায় হিসাবে।
যখন সঞ্চয়ন সংঘটিত হয়, তখন ধনিক নিশ্চয়ই সফল হয়েছে তার পণ্যদ্রব্যাদি বিক্রি করে দিতে, এবং সেই বিক্রয়লব্ধ টাকাকে মূলধনে পুনঃরূপান্তরিত করতে। অধিকন্তু, উদ্বৃত্ত-মূল্যের এই নানা খণ্ডে ভাগ হয়ে যাবার ঘটনাটি তার প্রকৃতিতেও কোনো পরিবর্তন ঘটায় না কিংবা যে অবস্থাবলীর মধ্যে তা সঞ্চয়নের একটি উপাদান হয়ে ওঠে, সেই অবস্থাবলীতেও কোন পরিবর্তন ঘটায় না। শিল্প-ধনিক নিজের জন্য যতটা রাখে কিংবা অন্যান্যদের জন্য যতটা ছাড়ে, তার অনুপাতে যাই হোক না কেন, সেই হচ্ছে একমাত্র ব্যক্তি, যে প্রথম পর্যায়ে তা দখল করে নেয়। সুতরাং, যা কার্যত ঘটে, তার চেয়ে বেশি কিছুই আমরা ধরে নিচ্ছি না। অন্য দিকে, সঞ্চয়ন প্রক্রিয়ার সরল মৌল রূপটি ঢাকা পড়ে যায় সঞ্চলনের ঘটনাটি দ্বারা যা সেটিকে ঘটায়, এবং উদ্বৃত্ত-মূল্যের ভাগাভাগি দ্বারা। অতএব এই প্রক্রিয়াটির একটি যথাযথ বিশ্লেষণ দাবি করে যে, আমরা আপাতত উপেক্ষা করব সেই যাবতীয় ব্যাপারকে, যা তার ভিতরকার আমি ব্যবস্থাটির ক্রিয়াকর্মকে আড়াল করে রাখে।
