পণ্যের মালিকমাত্রেই চায় তার পণ্যটিকে হাতছাড়া করতে কেবল এমন সব পণ্যের বিনিময়ে, যেসব পণ্য তার কোন-না-কোন অভাব মেটায়। এই দিক থেকে দেখলে, তার কাছে বিনিময় হল নিছক একটি ব্যক্তিগত লেনদেন। অন্যদিকে, সে চায় তার পণ্যটিকে বাস্তবায়িত করতে, সমান মূল্যের অন্য যে-কোনো উপযুক্ত পণ্যে রূপান্তরিত করতে-তার নিজের পণ্যটির কোন ব্যবহার-মূল্য অন্য পণ্যটির মালিকের কাছে আছে কি নেই, তা সে বিবেচনা করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, তার কাছে বিনিময় হল আর্থিক চরিত্রসম্পন্ন একটি সামাজিক লেনদেন। কিন্তু এক প্ৰস্ত এক ও অভিন্ন লেনদেন একই সঙ্গে পণ্যের সমস্ত মালিকদের কাছে যুগপৎ একান্তভাবে ব্যক্তিগত এবং একান্তভাবে সামাজিক তথা সার্বিক ব্যাপার হতে পারে না।
ব্যাপারটাকে আরেকটু ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যাক। একটি পণ্যের মালিকের কাছে, তার নিজের পণ্যটির প্রেক্ষিতে, বাকি প্রত্যেকটি পণ্যই হচ্ছে এক-একটি সমার্ঘ সামগ্ৰী এবং কাজে কাজেই, তার নিজের পণ্যটি হল বাকি সমস্ত পণ্যের সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রী। কিন্তু যেহেতু এটা প্রত্যেক মালিকের পক্ষেই প্রযোজ্য, সেহেতু কাৰ্যতঃ কোন সমার্ঘ সামগ্ৰী নেই, এবং পণ্যসমূহের আপেক্ষিক মূল্য এমন কোনো সাবিক রূপ ধারণ করেন, যে-রূপে মূল্য হিসেবে সেগুলির সমীকরণ হতে পারে এবং তাদের মূল্যের পরিমাণের তুলনা করা যেতে পারে। অতএব এই পর্যন্ত; তারা পণ্য হিসেবে পরস্পরের মুখোমুখি হয় না, মুখোমুখি হয় কেবল উৎপন্ন দ্রব্য বা ব্যবহার-মূল্য হিসেবে। তাদের অসুবিধার সময়ে আমাদের পণ্য-মালিকেরা ফাউস্টের মতোই ভাবে “Im Antang war die That”। সুতরাং ভাববার আগেই তারা কাজ করেছিল এবং লেনদেন করেছিল। পণ্যের স্বপ্রকৃতির দ্বারা আরোপিত নিয়মাবলীকে তার সহজাত প্ৰবৃত্তি বলেই মেনে চলে। তারা তাদের পণ্যসমূহকে মূল্য-রূপে, এবং সেই কারণেই পণ্যরূপে, সম্পর্কযুক্ত কত্বতে পারে না–সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্ৰী হিসেবে অন্য কোন একটিমাত্র পণ্যের সঙ্গে তুলনা না করে। পণ্যের বিশ্লেষণ থেকে আমরা তা আগেই জেনেছি। কিন্তু কোন একটি বিশেষ পণ্য সামাজিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে সর্বজনীন সমার্ঘ সামগ্ৰী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে না। সুতরাং নির্দিষ্ট সামাজিক প্রক্রিয়ার ফলে বাকি সমস্ত পণ্য থেকে ঐ বিশেষ পণ্যটি স্বাতন্ত্র্য লাভ করে এবং বাকি সমস্ত পণ্যের মূল্য এই বিশেষ পণ্যটির মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। এইভাবে ঐ পণ্যটির দেহগত রূপটিই সমাজ-স্বীকৃত সৰ্বজনীন সমার্ঘ সামগ্রীর রূপে পরিণত হয়। সর্বজনীন সমার্ঘ রূপে পরিণত হওয়াটাই এই সামাজিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে ওঠে। উক্ত সর্ব-ব্যাতিরিক্ত পণ্যটির নির্দিষ্ট কাজ। এই ভাবেই তা হয়ে ওঠে-“অৰ্থ”। “Illi unum consilium habent et virtutem et virtutem et potestatem suam bestiae tradunt. Et ne quis possit emere aut vendere, nisi qui habet characterem aut nomen bestiae, aut numerum nominis ejus.” (Apocalypse.)
‘অর্থ হচ্ছে একটি স্ফটিক , বিভিন্ন বিনিময়ের মাধ্যমে শ্রমের বিবিধ ফল কাৰ্যক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে সমীকৃত হয় এবং এইভাবে নানাবিধ পণ্যে পরিণত হয়; সেই সব বিনিময়ের ধারায় প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এই স্ফটিক গড়ে ওঠে। বিনিময়ের ঐতিহাসিক অগ্রগমন ও সম্প্রসারণের ফলে পণ্যের অন্তঃস্থিত ব্যবহার-মূল্য এবং মূল্যের মধ্যে তুলনাগত বৈষম্যটি বিকাশ লাভ করে। বাণিজ্যিক আদানপ্রদানের উদ্দেশ্যে এই তুলনা-বৈষম্যের একটি বাহিক অভিব্যক্তি দেবার জন্য মূল্যের একটি স্বতন্ত্র রূপ প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা দেখা দেয় এবং যতকাল পর্যন্ত পণ্য এবং অর্থের মধ্যে পণ্যের এই পার্থক্যকরণের কাজ চিরকালের জন্য সুসম্পন্ন না হয়েছে ততকাল পৰ্যন্ত এই আবশ্যকতার অবসান ঘটে না। তখন, যে-হারে উৎপন্ন দ্রব্যের পণ্যে রূপান্তরণ ঘটে থাকে, সেই হারেই একটি বিশেষ পণ্যের ‘অর্থ”-রূপে রূপান্তরণ সম্পন্ন হয়।(৪)
দ্রব্যের পরিবর্তে দ্রব্যের প্রত্যক্ষ বিনিময় (দ্রব্য-বিনিময় প্রথা) এক দিকে মূল্যের আপেক্ষিক অভিব্যক্তির প্রাথমিক রূপে উপনীত হয়, কিন্তু আরেকদিকে নয়। সেই রূপটি এই : ও পণ্য ক = ঔ পণ্য খাঁ। প্রত্যক্ষ দ্রব্য-বিনিময়ের রূপটি হচ্ছে এই ও ব্যবহার মূল্য ক = ঔ ব্যবহার মূল্য খ।(৫) এই ক্ষেত্রে কী এবং খ জিনিস দুটি এখনো পণ্য নয়। কিন্তু কেবল দ্রব্য-বিনিমযের মাধ্যমেই তারা পণ্যে পরিণত হয়। যখন কোন উপযোগিতা-সম্পন্ন সামগ্ৰী তার মালিকের জন্য একটি না-ব্যবহার মূল্য উৎপাদন করে তখনি বিনিময় মূল্য অর্জনের দিকে সেই সামগ্ৰীটি প্রথম পদক্ষেপ অৰ্পণ করে, এবং এটা ঘটে কেবল তখনি যখন তা হয়ে পড়ে। তার মালিকের আশু অভাব পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিসের অতিরিক্ত কোন অংশ। জিনিসগুলি নিজের তো মানুষের বাইরে অবস্থিত এবং সেই কারণেই তার দ্বারা পরকীকরণীয়। যাতে করে এই পরকীকরণ পারস্পরিক হয়, সেই জন্য যা প্রয়োজন তা হল পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে পরস্পরকে ঐ পরকীকরণীয় জিনিসগুলির ব্যক্তিগত মালিক হিসাবে এবং, তার মানেই, স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা। কিন্তু সর্বজনিক সম্পত্তির উপরে ভিত্তিশীল আদিম সমাজে-ত প্ৰাচীন ভারতীয়-গোষ্ঠী সমাজের পিতৃ-তান্ত্রিক পরিবারই হোক, বা পেরুভীয় ইনকা রাষ্ট্ৰই হোক-কোথাও এই ধরনের পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্যমূলক অবস্থানের অস্তিত্ব ছিল না। সেই ধরনের সমাজে স্বভাবতই পণ্য-বিনিময় প্রথম শুরু হয় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, যেখানে যেখানে তারা অনুরূপ কোন সমাজের বা তার সদস্যদের সংস্পর্শে আসে! যাই হোক, যত দ্রুত কোন সমাজের বাইরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রব্য পরিণত হয় পণ্যে তত দ্রুতই তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রেও দ্রব্য পরিণত হয় পণ্যে। কখন কোন হারে বিনিময় ঘটবে, তা ছিল গোডার দিকে নেহাৎই আপতিক ব্যাপার তাদের মালিকদের পারস্পরিক ইচ্ছার পরকীকরণই বিনিময় যোগ্য করে তোলে। ইতিমধ্যে উপযোগিতা-সম্পন্ন বিদেশীয়-দ্রব্য সামগ্রীর অভাববোধও ক্রমে ক্ৰমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। বিনিময়ের নিত্য পুনরাবৃত্তির ফলে তা হয়ে ওঠে একটি মামুলি সামাজিক ক্রিয়া। কালক্রমে অবশ্যই এমন সময় আসে যে শ্রমফলের অন্ততঃ একটা অংশ উৎপন্ন করতে হয় বিনিময়ের বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। সেই মুহুর্ত থেকেই পরিভোগের জন্য উপযোগিতা এবং বিনিময়ের জন্য উপযোগিতার মধ্যকার পার্থক্যটি দৃঢ় ভাবে প্ৰতিষ্ঠা লাভ করে। কোন সামগ্রীর ব্যবহার-মূল্য এবং তার বিনিময়-মূল্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা দেয়। অন্য দিকে যে পরিমাণগত অনুপাতে বিভিন্ন জিনিসপত্রের বিনিময় ঘটবে, তা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাদের নিজেত্ব নিজের উৎপাদনের উপরে। প্রথাগত ভাবে এক-একটি জিনিসের উপরে এক-একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যের ছাপ পড়ে যায়।
