হারেস আলাফী তাকে পুরো ঘটনা জানালেন, যা তাদের বসতির পাশের চৌকিতে ঘটেছে এবং পরিস্থিতি কতোটা বিস্ফোরনুখ হয়ে রয়েছে। ঘটনা শুনে বিন কাসিম স্থবির হয়ে গেলেন।
হারেস আলাফী বললেন, “প্রিয় বিন কাসিম! তোমরা যাদেরকে বিদ্রোহী বলল, আমি অনেক কষ্টে তাদেরকে তোমাদের জন্যে নেপথ্যে সহযোগিতা করার জন্যে সম্মত করেছি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, এ মুহূর্তে তুমি যদি ওখানে যাও, তবে জানি না, তোমার দেহে কতগুলো বর্শা ও তরবারী আঘাত হানবে। আমি উত্তপ্ত পরিস্থিতি একটা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠাণ্ডা করে এসেছি। আমি যদি তাদের ধারণার চেয়ে বেশী সময় এখানে কাটিয়ে ফিরে যাই, তাহলে আমাকে পথেই তারা পাবে এবং খুন করে ফেলবে।”
“ঠিকই বলেছেন সর্দার! এমন ঘটনায় তাদের এরচেয়ে বেশী বিক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ ঘটনাটা এমন নয় যে, কথায় তাদের ঠাণ্ডা করা যাবে।”
“আমাকে বলো বিন কাসিম! তুমি এখন কি করবে? যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে আমাকে বলো, আমি কি করতে পারি?” “এ মুহূর্তে আমার কাজ ডাভেল আক্রমণ করা। কিন্তু এর আগে অবশ্যই আমি এ ব্যাপারটি সুরাহা করবো।”
মুহাম্মদ বিন কাসিম তখনই তার ঘোড়া আনতে নির্দেশ দিলেন এবং গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফীকে সঙ্গে নিলেন। তার দেহরক্ষীরা তার রওয়ানা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রওয়ানা হলো। বলা হয়, যে কোন জটিল ঘটনার কারণ উদঘাটনে বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন শাবান ছাকাফী।
হারেস আলাফী তার দুই সঙ্গীসহ মুহাম্মদ বিন কাসিমের সাথে রওয়ানা হলেন। তারা ভেবেছিলেন অন্তত দ্বিপ্রহরের দিকে বসতিতে পৌছে যেতে পারবেন, কিন্তু মুহাম্মদ বিন কাসিম আরমান ভিলা থেকে বের হয়েই এভাবে ঘোড়া ছুটালেন যেন তিনি উড়াল দিয়ে সেখানে চলে যাবেন। তিনি ছিলেন সবার আগে এবং গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী ছিলেন তার পাশাপাশি। তিনি শা’বান ছাকাফীর সাথে ঘটনা সম্পর্কে কথা বলতে বলতে অগ্রসর হতে লাগলেন।
দ্বিপ্রহরের অনেক আগেই তারা দুর্ঘটনা স্থলে পৌছে গেলেন। সেনাপতিদের আসতে দেখে চৌকির সব সিপাহী চৌকি থেকে বেরিয়ে এলো। মুহাম্মদ বিন কাসিম চৌকির কাছে গিয়ে পিছনে চলে এলেন আর
শাবান ছাকাফী চৌকির সৈন্যদের কাছে চলে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন-গতকাল বিকেল বেলার টহলে কে কে ডিউটিতে ছিল?
চার সিপাহী হাত উঁচিয়ে নিজেদের ডিউটিতে থাকার কথা জানালো।
“তোমরা চারজনই কি তিন তরুণির ওপর হামলা করেছিলে? না। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ ছিল, যে চায়নি এ কাজে শরীক হতে?”
একথা শুনে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শাবান ছাকাফীর দিকে তাকিয়ে রইলো।
“তোমরা দেখতেই পাচ্ছো, প্রধান সেনাপতি নিজে এসেছেন। তা থেকেই বুঝতে পারছো ব্যাপারটি কতো জটিল। আর এ ক্ষেত্রে তোমাদের অপরাধ পরিষ্কার। লুকানোর কোন অবকাশ নেই।”
“শত্রু ভূমিতে দাঁড়িয়ে যা তা বলবেন না সেনাপতি।” ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল চার অভিযুক্তের একজন। জন্মভূমি থেকে দূরে এনে এভাবে আমাদের অপমান করার কোন অধিকার আপনার নেই।”
“এক সিপাহীর কথা শেষ না হতেই বিন কাসিমের দিকে হাত প্রসারিত করে চার অভিযুক্তের অপর একজন বলল, “সম্মানিত সেনাপতি! সেই আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, যে আল্লাহর নামে আমরা আপনার সাথে এখানে জিহাদ করতে এসেছি। আপনার কাছে জানতে চাই, এ লোক আমাদের ওপর কেন অপবাদ দিচ্ছে? আমরা কি আপনার বাহিনীর সৈনিক নই?”
“সিপাহীর প্রশ্নের উত্তরে মুহাম্মদ বিন কাসিম কিছুই বললেন না। কারণ অনুসন্ধানের কাজটি তিনি শা’বান ছাকাফীর দায়িত্বে ন্যস্ত করেছিলেন। আসলেও এটি ছিল শা’বান ছাকাফীর কাজ। অভিযুক্ত হওয়ার পর চার সিপাহী হা-হুতাশ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করল। আলাফী ও তার দুই সঙ্গী দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে এসব দেখছিলেন।
শাবান ছাকাফী হারেস আলাফীকে বললেন, “সর্দার! আক্রান্ত তিন তরুণীকে বসতি থেকে এখানে নিয়ে আসুন এবং তাদের সাথে যতো লোক আসতে চায় আসতে বলুন।”
হারেস আলাফী বসতির উদ্দেশ্যে চলে যাওয়ার পর চৌকির কমান্ডারকে গোয়েন্দা প্রধান ছাকাফী বললেন, এ মুহূর্তে যারা টহলে রয়েছে তাদেরকেও নিয়ে এসো। কমান্ডার সেনাপতির নির্দেশ পালনে চলে গেল। এমন সময় চৌকি থেকে একটু দূরে গিয়ে বিন কাসিম ও গোয়েন্দা প্রধান ছাকাফী পরস্পর কথা বললেন।
শুরুতে শুধু অভিযুক্ত চার সিপাহী নিজেদের ওপর মিথ্যা অভিযোগের জন্যে হা-হুতাশ করেছিল, কমান্ডার ও আলাফী চলে যাওয়ার পর সবাই চেচামেচি শুরু করে দিলো এবং সেনাপতিদের সম্পর্কে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে শুরু করল। মুহাম্মদ বিন কাসিমের কানে এসব কথা গেলেও তিনি নীরবে সিপাহীদের গালমন্দ সহ্য করলেন। অথচ এসব কটুবাক্য সাধারণ সৈনিকও সহ্য করত কি-না সন্দেহ। এক পর্যায়ে গোয়েন্দা প্রধান শা’বান ছাকাফী সিপাহীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা শান্ত হও। এ ব্যাপারে তোমরা নিশ্চিত থাকতে পারো, তোমাদের ওপর কোন ধরনের বে-ইনসাফী করা হবে না।”
একজন বয়স্ক সিপাহী বলল, “সম্মানিত সেনাপতি! দেখেতো মনে হলো যে তিনজন লোক আপনার সাথে এসেছিল এরা সেই লোক; যারা আরব থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে এসে রাজার আশ্রয় নিয়েছে। পরিষ্কার বোঝা যায় এরা আমাদের বিরুদ্ধে রাজার নিমক হালালী করছে। আমি বলি, হিন্দুদের আগে-এদের পরিষ্কার করা জরুরী। এরা আমাদের ঘোরতর শত্রু।”
