শত্রুদেরকে যদি দুর্বল করে দেয়া যায়, তাহলে সেটি হবে বিজয়ের জন্য সহায়ক। তখন খুব তাড়াতাড়ি শত্রুদের মাথা কেটে দেয়া সম্ভব হবে।”
“কিভাবে শত্রুদেরকে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই দুর্বল করে দেয়া যায়?”
“কিছু কিছু দুর্বলতা মানুষের মধ্যে এমন থাকে যা বীর বাহাদুরকে দুর্বল এবং দুর্বলকেও বীর বাহাদুর করে ফেলে। রাজা যেমন রাজ সিংহাসন ছাড়া থাকতে পারে না, পুরুষ ও দ্রুপ নারীসঙ্গ ছাড়া স্বস্তি পায় না। রাজা যেমন তার মুকুট জগতের সবচেয়ে মূল্যবান মণিমুজ দিয়ে সাজাতে চায়, প্রতিটি সামর্থবান পুরুষও চায় তার চাহিদা মেটানোর জন্য সবচেয়ে সুন্দরী রূপসী নারীর সঙ্গ।”
‘কথাটা বুঝলাম না উজির। পরিষ্কার করে বলে এবং সেই কথা বলো যা কার্যকর করা সম্ভব।” উম্মা মাখা কণ্ঠে বলল রাজা।
“মহারাজ! নারী একটা নেশা। সম্পদ ও ক্ষমতা এই নেশাকে আরো তীব্র করে তোলে। ক্ষমতা হাতে এসে গেলে এ নেশা মেটানোর সুযোগ পূর্ণতা পায় এবং নেশাগ্রস্ত পুরুষ তার ব্যক্তিত্ব আত্মসম্মান ও কর্তব্যবোধ ভুলে যায়। পাচ ছয়শ মুসলমান অনেক দিন যাবত আমাদের আশ্রয়ে রয়েছে আমি তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি এবং আরবদেরও খবর নিয়েছি, এদের শাসকদের ব্যাপারেও জেনেছি, এদের মধ্যে নারী ও দৌলতের দুর্বলতা খুবই কাজ করে। কাজেই তলোয়ার দিয়ে আঘাত করার আগে এদেরকে নারী ও দৌলত দিয়ে অন্ধ বানিয়ে ফেলা হবে বেশী কার্যকর।”
“বুদ্ধিমান! তুমি কি হাজ্জাজ ও হাজ্জাজের বাহিনীর কথা বলছো?” পরিষ্কার বুঝে উঠতে না পেরে উজিরের কাছে জানতে চাইলো রাজা দাহির।
“না, আমি বলছি সেই আরবদের কথা যাদেরকে আপনি আপনার আশ্রয়ে রেখেছেন। বলল উজির। মহারাজ প্রথম যুদ্ধের বেলায়ই দেখেছেন এই আরবরা আক্রমণকারী আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেছে। অথচ শাসকরা ওদের ঘোর দুশমন। তাদের শত্রু কবিলার হাতে খেলাফতের ক্ষমতা। এসব আশ্রিত আরব হলো বনী উসামা গোত্রের। আর বর্তমান আরব শাসকরা হচ্ছে বনী উমাইয়া গোত্রের। তদুপরি স্বদেশীদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরতে এরা নারাজ। এখন এদের মধ্যে ওদের জাতিগত শত্রুতা আর শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষকে চাঙ্গা করতে হবে। এমন কোন পন্থা
অবলম্বন করতে হবে, যার ফলে আগত আরব সৈন্যদের প্রতি আশ্রিত আরবদের ঘৃণা ও হিংসা আক্রোশে পরিণত হয়।”
“তাতো বুঝলাম। কিন্তু এখন সেই কথা বলো, যা দিয়ে আমি এসব আরবের রক্তে শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আগুন ধরিয়ে দিতে পারি।” বলল রাজা দাহির।
“মহারাজের জয় হোক” উচ্ছসিত কণ্ঠে বলল উজির। এ কাজের দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে নিয়ে নিচ্ছি। মহারাজ সৈন্যদের দিকে নজর দিন, তাদের প্রস্তুত করুন। লড়াইয়ের কলাকৌশল মহারাজ আমার চেয়ে ঢের ভালো জানেন। তবে আমার মতামত হলো, দুর্গের বাইরে ময়দানে গিয়ে লড়াই করার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ মুসলিম বাহিনী ডাভেল পর্যন্ত আসবে। মহারাজের রাজধানী তাদের কাছে এতোটা মূল্যবান নয়, ডাভেল তাদের কাছে যতোটা দামী ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ডাভেল এ অঞ্চলের একমাত্র বড় সমদ্র বন্দর।
ডাভেলের আগে আমাদের আরো দুটি ছোট ছোট দুর্গ আছে। এগুলো মুসলমানরা হাতিয়ে নিতে পারবে। অবশ্য তাতে উপকার হবে মহারাজের। কারণ এসব দুর্গে মুসলমানদের যথেষ্ট শক্তি ক্ষয় হবে এবং অবরোধ আরোপ করে দীর্ঘদিন কাটাতে হবে। এতে করে তাদের আহার সামগ্রী ব্যয় হবে। ফলে ডাভেল পর্যন্ত পৌঁছতেই তাদের অর্ধেক সম্পদ ব্যয় হয়ে যাবে। তারা ডাভেলকে অবরোধ করলেও মহারাজ রাজধানীতেই অবস্থান করবেন, তাতে ফায়দা হবে এটাই যে, ডাভেল জয় করে যখন ওরা রাজধানীর দিকে অগ্রসর হবে তখন ওদের সৈন্যরা ক্লান্তি, অবসাদ ও রসদপত্রের ঘাটতির শিকার হবে। এমতাবস্থায় আমরা আশ্রিত আরবদের প্রস্তুত করে ওদের দিয়ে হাজ্জাজের বাহিনীর ওপর আঘাত করাবো।”
উজির বুদ্ধিমানের পরিকল্পনা ছিল যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। দৃঢ়তার ছাপ ছিল তার কথায়। রাজা ও রাজার অপর কোন সেনাপতি উজির বুদ্ধিমানের পরিকল্পনার বিপরীতে যৌক্তিক কোন কথাই বলতে পারেনি। তাই উজিরের পরামর্শ মেনে নিয়ে রাজা ও সেনাপতিরা সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে লেগে গেল। বুদ্ধিমানের পরামর্শে রাজা দাহিরের সেনাপতি কূটকৌশলের প্রতি বেশী নজর দিলো। অপর দিকে রাজা প্রধান সেনাপতিকে নির্দেশ দিলো কোন চৌকস গোয়েন্দাকে মাকরান পাঠিয়ে আরব বাহিনীর সৈন্যসংখ্যার সঠিক ধারণা নিয়ে আসার জন্য। রাজা এই নির্দেশও দিলো, গোয়েন্দাকে শুধু সৈন্য
সংখ্যা জেনে আসলে হবে না, মুসলিম বাহিনীর কমান্ড কে করছে তাও জেনে আসতে হবে।”
মাকরানের শাসক মুহাম্মদ বিন হারুন ও বিন কাসিম মনে করেছিলেন হারেস আলাফী তাদের সাথে সাক্ষাতে না আসার সম্ভাবনাই বেশী। এটা ছিল একটা অবিশ্বাস্য ধরনের ঘটনা যে, আলাফী শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট সময়ে তাদের সাথে সাক্ষাতের ওয়াদাই করেননি, আমীর মাকরানের পাঠানো দূতকে বিশেষ সম্মান ও ইজ্জত করে আগেই বিদায় করে দিয়েছেন এই বলে যে, তুমি গিয়ে আমীরে মাকরানকে বলল আমি অবশ্যই আসবো।” মুহাম্মদ বিন কাসিম এবং আমীরে মাকরান ইবনে হারুন কয়েকজন দেহরক্ষী নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছলেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম দেহরক্ষী নেয়ার পক্ষে ছিলেন না। কিন্তু বিন হারুন বললেন, “উমাইয়া শাসকদের প্রতি এদের মধ্যে যে ক্ষোভ ও ঘৃণা রয়েছে, তাতে এদের ওপর এতোটা আস্থা রাখা ঠিক হবে না। দেশ ত্যাগের বঞ্চনায় এদের মধ্যে কোন প্রতিহিংসা যে কোন সময় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে।”
