“আমীরে সিরাজ! আপনার ওপর আল্লাহ রহম করুন!” বলল দূত। বন্দীদের উদ্ধার করতে গিয়ে দু’টি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে, দু’জন সেনাপতি ইতোমধ্যে জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং দু’বার মুসলিম বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে।”
“দু’জন সেনাপতি প্রাণ দিয়েছেন? বলো কি? বিস্ময়ে হতবাক হলেন মুহাম্মদ বিন কাসিম। তিনি দূতকে বললেন, বলো, তাড়াতাড়ি বলো, কি ঘটেছিল সেখানে, কারা ছিলেন সেনাপতি?”
“প্রথম অভিযানে আব্দুল্লাহ বিন নাবহান সেনাপতি ছিলেন। তিনি সিন্ধু উপকূলের ডাভেল বন্দর দখলের অভিযানে শাহাদাত বরণ করেন। তার বাহিনীর অধিকাংশ যোদ্ধাও শাহাদাত বরণ করে। দ্বিতীয় অভিযানের সেনাপতি ছিলেন বুদাইল বিন তোফায়েল। তিনিও শাহাদাত বরণ করেন।
তার শাহাদাত আমাদের বাহিনীর জন্য পরাজয়ের কারণ ঘটে। তৃতীয়বার সেনাপতি আমের বিন আব্দুল্লাহ তাকে সিন্ধু অভিযানে পাঠানোর জন্য আপনার চাচার কাছে প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু হাজ্জাজ বললেন, না, আর কারো প্রতি আমি আস্থা রাখতে পারছি না। আমার ভাতিজা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে আমি অভিযানে পাঠাব। আমার বিশ্বাস, বিজয় তার পদচুম্বন করতে বাধ্য হবে।”
দূতের কথা শুনে মুহাম্মদ বিন কাসিমের চেহারায় যে পরিবর্তন দেখা দিলো, তা ছিল ব্যাপক অর্থবোধক। একটা গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন করে ফেলল বিন কাসিমকে। তিনি দাঁড়িয়ে পিছনে হাত বেঁধে দৃঢ় পায়ে কক্ষ জুড়ে পায়চারী করছিলেন, আর দূত তার পিছু পিছু হাঁটছিল। তিনি গভীর দৃষ্টিতে নীচের দিকে তাকিয়ে কি যেন হিসাব করছিলেন। দূত নিবিষ্ট মনে তাকে অনুসরণ করছিল। “ইবনে নাবহান ও ইবনে তোফায়েল তো পরাজয় বরণ করার মতো সেনাপতি ছিলেন না।” দাঁড়িয়ে দূতকে লক্ষ্য করে বললেন বিন কাসিম।
‘আল্লাহর কসম! তারা রণাঙ্গনে পিঠ দেখানোর মতো ব্যক্তি ছিলেন না। উভয়েই বেপরোয়াভাবে শত্রু বাহিনীর রক্ষণভাগে ঢুকে পড়েছিলেন।”
দূত দুটি সিন্ধু অভিযান সম্পর্কে মুহাম্মদ বিন কাসিমের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা দিলো। আরো জানালো, হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মানসিক অবস্থা।
“তার অবস্থা এমনটিই হওয়া উচিত।” বললেন বিন কাসিম। আরবদের নাওয়া খাওয়া হারাম হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। প্রতিটি আরব মুসলমানের স্ত্রী গমন হারাম করে দেয়া উচিত।”
ঠিক আছে। তুমি এখন গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করো। শরীরটা ঠিক হলে চলে যেয়ো। চাচাকে বলবে, আপনার ভাতিজা আপনার আশা পূরণ করবে ইনশাআল্লাহ! হ্যাঁ, আমি অবশ্যই আমাদের বন্দীদের মুক্ত করবো এবং আল্লাহ্ যদি সহায় হন, সিন্ধু অঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু মন্দির চূড়ায় ইসলামের পতাকা উড্ডীন করব।”
দূত চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মুহাম্মদ বিন কাসিম তার পারিষদবর্গকে ডেকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পয়গামের কথা ব্যক্ত করলেন।
পারিষদবর্গের একজন বললেন, আমীরে মুহতারাম! রায়া অঞ্চলের বিদ্রোহ দমন মুলতবি করে দেয়ার কথাটা হাজ্জাজ ঠিক বলেননি। সিন্ধু
অভিযানে এখান থেকে শুধু আপনিই যাচ্ছেন। আর আপনার ক’জন দেহরক্ষী যাবে। আর আমরা তো এখানেই আছি। আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে, আপনার অবর্তমানেও বিদ্রোহ দমন অভিযান আমরা অব্যাহত রাখব।”
“আমরা যদি এ পর্যায়ে এসে বিদ্রোহ দমন অভিযান মুলতবি করে দেই, তাহলে উপজাতিদের গোয়ার্তুমী প্রকাশ্য বিদ্রোহের আকার ধারণ করবে।” বললেন অপর একজন কর্মকর্তা।
“আমি আপনাদের অনুমতি দিচ্ছি। কিন্তু এ কথাটি আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে, দু’বার সিন্ধু অভিযানে পরাজিত হওয়ার পর তৃতীয় কোন পরাজয়ের সংবাদ হাজ্জাজ কোন অবস্থাতেই শুনতে চাইবেন না। পরাজয় তার কাছে অসহ্যকর হয়ে গেছে। তিনি পরাজয়ের জন্য আর কোন সৈনিক, সেনাপতিকে ক্ষমা করার কথা ভাবতেও রাজি হবেন না। আপনারা সবাই তাকে কমবেশী জানেন। আমি এখান থেকেই বুঝতে পারছি, তার মানসিক অবস্থা এখন কেমন।”
“পরিণতির কথা মাথায় রেখেই আমাদেরকে বিদ্রোহ দমনাভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।” বললেন অপর কর্মকর্তা।
“হাজ্জাজের ওপরে আল্লাহ আছেন। আমাদের হাজ্জাজের সন্তুষ্টি নয় আল্লাহর সন্তুষ্টিই কাম্য হওয়া উচিত।” বললেন একজন সেনাপতি।
“তার পারিষদবর্গ কি বলছে সেদিকের চেয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমের বেশী মনোযোগ আকৃষ্ট করে ফেলেছিল সিন্ধু অঞ্চলের মানচিত্র। তিনি সিন্ধু অঞ্চলের মানচিত্র মেলে ধরে সেদিকে তাকিয়ে পারিষদবর্গের কথা শুনছিলেন। আর সিন্ধু অঞ্চলের অবস্থা চিন্তা করে গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মন-মানসিকতা অনুধাবন করা আর কারো পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না। প্রতিশোধের নেশায় হাজ্জাজ প্রায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। হাজ্জাজ যদি কারো ওপরে ক্ষেপে যেতেন, তবে কেবল সেই আন্দাজ করতে পারত ক্ষোভের গভীরতা। হাজ্জাজের মতের বিরুদ্ধে কেউ বাধা দিলে তিনি তার শিরচ্ছেদ করে ফেলতেন। কখনো এমন মনে হতো যে, স্বজাতির সকল মানুষকেই হত্যা করে ফেলবেন হাজ্জাজ। কোন অধীনস্থ তার হুকুমের ব্যতিক্রম করাকে তিনি মোটেই বরদাশত করতে পারতেন না।
মামুলী ব্যাপারেও অনেক ক্ষেত্রে হাজ্জাজ তার অধীনস্থদের কঠোর শাস্তি দিতেন। হাজ্জাজের হাতে স্বজাতির যতো লোক নিহত হয়েছে, এতো লোক। শত্রুপক্ষেরও নিহত হয়নি। যে পরিমাণ মুসলমানের রক্ত হাজ্জাজের হাতে প্রবাহিত হয়েছে, এ পরিমাণ দুশমনদেরও সম্ভবত হয়নি। সেই কঠোর কঠিন হাজ্জাজ কিভাবে নিরপরাধ আরব নারী শিশুদের এক লুটেরা হিন্দু রাজার হাতে নির্যাতিত হওয়াকে সহ্য করতে পারেন। অবশ্য একথা বলা চলে, হাজ্জাজ তার বিরুদ্ধাচরণকারীদের জন্য ছিলেন কঠোর আর দুশমনদের জন্যে ছিলেন সাক্ষাত মৃত্যু।
