বলল “ওকে ধরার দরকার নেই ছেড়ে দাও।” সেনারা ছেড়ে দিতেই জেসিয়ার নিক্ষিপ্ত বর্শা তার বুকে বিদ্ধ হলো এবং সেনাপতি বুদাইল শাহাদাত বরণ করলেন।
কেন্দ্রীয় কমান্ডের অভাবে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। বিক্ষিপ্তভাবে আরব সৈন্যরা সন্ধ্যা পর্যন্ত লড়াই করল। কিন্তু যুদ্ধের কায়া পাল্টে গেল। মুসলিম সৈন্যদের মধ্যে আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়তে লাগল। অবশেষে অন্ধকার উভয় বাহিনীর মধ্যে দেয়াল সৃষ্টি করলে যে যেদিকে পারে পালাতে লাগল। অন্যথায় মুসলিম বাহিনী প্রায় নিঃশেষে নিহত হতো কিংবা বন্দি হয়ে পৌত্তলিকদের জিন্দানখানায় ধুকে ধুকে মরতে হতো।
সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েলের মৃত্যু ও মুসলিম বাহিনীর পরাজয়ের খবর যখন বসরায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে পৌছাল, অপমান ক্ষোভ ও অনুতাপে তার মাথা ঝুকে গেল। হাজ্জাজের মনে হচ্ছিল বর্শা সেনাপতি বুদাইলের বুক বিদীর্ণ করেনি, হাজ্জাজের নিজের বুক বিদীর্ণ করেছে। তিনি যখন মাথা ওপরে ওঠালেন, তখন ক্ষোভে তার চেহারা রক্তিম হয়ে গেছে, চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে রক্তবাণ। “এতোটা কাপুরুষ তো ছিল না বুদাইল!” অনুতাপ অনুশোচনা স্বগতোক্তি করলেন হাজ্জাজ। সে একটি শত্রুবাহিনীকে পরাজিত করে আরেকটি বাহিনীর কাছে হেরে গেল কেন?”
“আমীরে ইরাক! আপনার ওপর আল্লাহ্ রহম করুন। আল্লাহ্ সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েলের বীরত্ব ও শাহাদাত কবুল করুন। তিনি ভীরু কাপুরুষ ছিলেন না। তিনি শত্রুদের আক্রমণ করতে দুশমনদের মধ্যভাগে চলে গিয়েছিলেন। সেনাপতির কথা ভুলে তিনি সিপাহীতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি হিন্দু সেনাপতির রক্ষণভাগ গুড়িয়ে দিয়েছিলেন। শত্র সেনাপতির নিরাপত্তা ব্যুহ ভেদ করে তার ঘোড়াকে শত্রু সেনাপতির হাতির কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় হাতির ওপর থেকে শত্রু বাহিনী তার ওপর যেভাবে তীর বর্শা নিক্ষেপ করছিল, তা থেকে তিনি নিজেকে রক্ষা করে শত্রু সেনাপতিকে বহনকারী হাতির শুঁড় কেটে দিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু আহত
হাতির ভয়ঙ্কর চিৎকারে তার ঘোড়া ভড়কে গিয়ে লাফিয়ে উল্টে পড়লে তিনি মাটিতে পড়ে যান, আর শত্রু বাহিনীর বর্শা তার গায়ে আঘাত হানে। তার
এই সাহসিকতা বর্ণনাতীত। আল্লাহর কসম! তিনি ভীরু ছিলেন না, ভয় শংকার লেশমাত্র ছিল না তার মধ্যে।”
ডাভেল থেকে ফিরে আসা তিন সেনার একজন এ কথাগুলো হাজ্জাজের উদ্দেশ্যে বলল।
“তুমি কি সেখানে উপস্থিত ছিলে?”
“জী, হ্যাঁ, আমীরে ইরাক! আমি যা বলছি, নিজের চোখে তা দেখে এসেছি। আমি তার পিছনেই ছিলাম, তিনি যখন বর্শার আঘাতে লুটিয়ে পড়েন, তখন তার কাছ থেকে কয়েক হাত দূরে ছিলাম আমি।”
“বুদাইল মারা গেল আর তুমি পালিয়ে এলে? রক্তচক্ষু নিয়ে সেনার দিকে তাকিয়ে রাগত স্বরে বললেন হাজ্জাজ। ওর জীবন বাঁচাতে তুমি মরণ স্বীকার করতে পারলে না। সিংহের মতো বাহাদুর সেনাপতিকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করে তুমি পালিয়ে এলে?”
কথা শেষ করতে করতে হাজ্জাজ তরবারী কোষমুক্ত করে এক আঘাতেই সেনার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন।
“কাপুরুষ, ভীতু! ভীতু না হলে কেউ সেনাপতিকে শক্ৰবেষ্টিত রেখে পালিয়ে আসতে পারে না” বলে হাজ্জাজ রক্তমাখা তরবারীটি তার একান্ত প্রহরীর দিকে ছুড়ে মারলেন।
দ্বিতীয় অভিযানের শোচনীয় পরাজয়ের খবরও যথারীতি দামেশকে পৌছে গেল। খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক পরপর দু’বার অভিযান ও পরাজয়ের সংবাদে উদ্বিগ্ন হয়ে হাজ্জাজকে দামেশকে আসার জন্য বার্তা পাঠালেন।
“আমীরুল মুমিনীন! খলিফার বার্তার লিখিত জবাব দিলেন হাজ্জাজ। আপনি নিষেধ করার পরও কেন দ্বিতীয়বার আমি সিন্ধু অঞ্চলে সেনা পাঠালাম আর শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলাম, এর জবাবদিহির জন্য যদি ডেকে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে এ মুহূর্তে আমি আসতে পারছি না। প্রথম অভিযানের সময় আমি এ শর্তে আপনার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলাম যে, যে ক্ষয়ক্ষতি এ অভিযানে হবে আমি রাজকোষ এর দ্বিগুণ সম্পদে ভরে দেবো। আমি তখনই আমিরুল মুমিনীনের মুখোমুখী হবো, যখন আমার শর্ত আমি পূরণ করতে সক্ষম হবো। সিন্ধু অভিযান এখন আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, এখন আমি আমার ভাতিজা মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সিন্ধু অভিযানে পাঠাব। আশা করি আমিরুল মুমিনীন আমার এ সিদ্ধান্তে বাধা দেবেন না। জাতির সামনে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন হওয়া থেকে রক্ষা করবেন। পৌত্তলিকদের অহমিকা চূর্ণ করে মুসলমানদের বিজয় কেতন সিন্ধু রাজার রাজপ্রাসাদে উড্ডীন করার সুযোগ দিয়ে জাতির আত্মসম্মান অক্ষুন্ন রাখার সুযোগ দেবেন।”
“ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক হাজ্জাজের চারিত্রিক অবস্থা জানতেন। জানতেন হাজ্জাজ কোন ব্যাপারে জিদ ধরলে তা না ঘটিয়ে ক্ষান্ত হয় না। এসব কারণে হাজ্জাজকে তিনি রীতিমত আতঙ্ক মনে করতেন।
খলিফার দূত হাজ্জাজের সকাশে থাকাবস্থায়ই সেনাপতি আমের বিন আব্দুল্লাহ হাজ্জাজের সাথে দেখা করতে এলেন এবং বললেন
“সম্মানিত আমীর! আপনি যদি আমাকে সিন্ধু অভিযানে পাঠান, তাহলে আমি কেবল আগের দু’পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েই ক্ষান্ত হবো না, অভিযানে যতো ব্যয় হয়েছে, তাও পূরণ করে দেবো। আর সিন্ধু এলাকার কর্তৃত্ব আপনার পায়ের নীচে এনে দেবো।” “তোমার মনে যদি কোন বদ চিন্তা না থেকে থাকে, একজন সেনাপতি হিসাবে এ প্রস্তাব করে থাকো, তাহলে তোমার প্রস্তাবের জন্য আমি মোবারকবাদ জানাই। কিন্তু আমার মন বলছে, এ অভিযানের সাফল্য ঘরে তুলতে হলে মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রয়োজন।” সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েল ছিলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের খুবই প্রিয় ব্যক্তি। সেনাপতি বুদাইলের রণকৌশল ও বীরত্বের প্রতি হাজ্জাজ ছিলেন আস্থাশীল। সেনাপতি বুদাইলের মৃত্যুতে হাজ্জাজ খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি একদিন বসরার কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াযিনকে ডেকে বললেন, “আল্লাহ্ তোমার ওপর রহম করুন এবং তোমার কণ্ঠের আওয়াজকে আরো বুলন্দ করে দিন। তুমি আজ থেকে প্রত্যেক আযানের পর সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েলের নাম উচ্চ আওয়াজে উচ্চারণ করবে, যাতে আমি তার কথা ভুলে না যাই, তার রক্তের প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতির ব্যাপারে সতর্ক থাকি এবং প্রতি নামাযের পর বুদাইলের জন্য দোয়া করতে পারি।”
