একথা বলেই মায়ারাণী সেখান থেকে সরে গেল। কুবলা মায়ার জন্যে অদূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে মায়ারাণীর উদ্দেশ্যে বলল, কি হুকুম মহারাণী?
“আগে যা ছিল তাই।” বলল মায়ারাণী।
মায়া জেলখানা থেকে বের হতেই বন্দি গারদ থেকে বেলালকে বের করে আনা হলো। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছিল না। তাকে টেনে হেঁচড়ে বের করলো প্রহরীরা। বেলালকে পিঠমোড়া করে বাঁধা হলো। তার পা দুটোও বাঁধা হলো শক্ত রশি দিয়ে। এরপর তাকে হামাগুড়ি দিয়ে মাথা নীচ করে বসিয়ে দেয়া হলো জল্লাদের বলিখানায়। জল্লাদ তার মাথার চুল ধরে নীচের দিকে ঝুকিয়ে দিয়ে দীর্ঘ চওড়া একটি ধারালো রামদা দিয়ে এক কোপে ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। সেই সাথে চিরদিনের জন্য দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেল বেলাল।
বেলালের শিরোচ্ছেদের দুদিন পর সেনাপতি বুদাইল বিন তোকায়েল হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশে তিনশ অশ্বারোহী নিয়ে মাকরানে পৌছলেন। মাকরানের গভর্নর মুহাম্মদ বিন হারুন হাজ্জাজের নির্দেশে তিন হাজার অশ্বারোহী সেনাকে প্রস্তুত রেখেছিলেন। সেনাপতি বুদাইল মাত্র একরাত মাকরান যাপন করে পরদিন ফজরের নামায পড়েই ডাভেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। সেনাপতি বুদাইল জানতেন না, আরব বন্দীদেরকে কোন জায়গায় বন্দি করে রাখা হয়েছে। ইতিহাসে বলা হয়েছে মাকরানের গভর্নরও জানতেন না, বন্দি আরব মুসাফিরদেরকে রাজা দাহির কোথায় বন্দি করে রেখেছিল।
হাজ্জাজ নির্দেশ দিয়েছিলেন, সবার আগে ডাভেল কব্জা করবে কারণ। ডাভেল সিন্ধু অঞ্চলের একমাত্র সমুদ্র বন্দর। হাজ্জাজ মনে করেছিলেন সমুদ্র বন্দর কব্জায় এসে গেলে সমুদ্র পথে সামরিক সাহায্য ও রসদপত্র পাঠানো সহজ হবে। হাজ্জাজের নির্দেশ পালন করতেই সর্বাগ্রে সেনাপতি বুদাইল ডাভেল বন্দরের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন।
রাজা দাহির মাকরানের আশ্রিত মুসলমানদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য মাকরানের আশপাশে বহু সেনা সদস্যকে বেদুঈনের বেশে পরিবারপরিজনসহ নিয়োগ করে রেখেছিল। হারেস আলাফী দ্বিতীয়বার আরব আক্রমণ প্রতিরোধে অস্বীকৃতি জানানোর পর দাহির তার গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে
জোরদার করে। রাজা দাহিরের ছদ্মবেশী সেনাদের একজন সেনাপতি বুদাইলের অগ্রবর্তী সেনাদেরকে ডাভেলের দিকে অগ্রসর হতে দেখে একটি দ্রুতগামী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ডাভেলের দিকে রওয়ানা হয়।
ডাভেলের অধিবাসী ও সেনা কর্মকর্তারা মুসলমানদের এ অভিযান সম্পর্কে একেবারেই বেখবর ছিল। কিন্তু রাজা দাহিরের গোয়েন্দা সদস্য বুদাইলের সহকর্মীদের একদিন আগেই ডাভেল পৌছে ডাভেলের শাসককে বলল, আরব সেনারা আসছে। সে তার দেখা সেনা বাহিনীর সংখ্যা ও অবস্থা সম্পর্কেও সংবাদ দিলো। খবর পাওয়া মাত্রই ডাভেলের শাসক শহর জুড়ে প্রচার করে দিলো, “সবাই হুশিয়ার হয়ে যাও, সকল যুবক তুণ ধনু নিয়ে তৈরী হয়ে যাও, আরব মুসলমানরা আবার শহর দখল করার জন্য এগিয়ে আসছে। সেনাবাহিনী শহরের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করবে, বেসামরিক লোকেরা শহরের ভিতরে অস্ত্র নিয়ে তৈরী থাকবে। দেবদেবী ও মন্দিরের সম্মান রক্ষায় জীবন বিলিয়ে দেয়ার আবার সময় এসেছে।”
ডাভেল ছিল শহরের প্রধান মন্দীরের নাম। মন্দিরের নামেই শহরের নাম হয়ে যায় ডাভেল।
ডাভেলের শাসক সংবাদবাহী অশ্বারোহীকে বলল, তুমি অরুঢ় চলে যাও এবং রাজা দাহিরকে গিয়ে মুসলিম ফৌজ আসার খবর দাও।” ডাভেলের শাসক তার সেনাবাহিনীকে শহরের অদূরে ময়দানে এগিয়ে নিলো এবং যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সবাইকে কাতারবন্দি করে রাখলো। ডাভেলের শাসক এমন একটি এলাকায় সেনাবাহিনীকে নিয়ে গেল যে এলাকা পেরিয়ে মুসলিম বাহিনীকে ডাভেলে প্রবেশ করতে হবে। এলাকাটি ছিল অসমতল, অসংখ্য উঁচু নীচু টিলা ও গিরি খন্দকে ভরা। ডাভেল শাসক তার সেনাদেরকে বিভিন্ন উঁচু টিলার আড়ালে লুকিয়ে রাখলো। এবং কিছু সৈন্যকে রাখলো সমতল এলাকায়। এ জায়গাটি ছিল আড়াল থেকে অতর্কিত আক্রমণের জন্য খুবই উপযোগী। মুসলমানদের এ এলাকা সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। তাদের জন্যে এলাকাটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সিন্ধী সেনাদের মনোবল ছিল চাঙা। কারণ এর আগে তারা মুসলিম বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল। আর মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিকেও তারা শহীদ করে দিয়েছিল। সেই বিজয়ের
ঘটনা বলে সিন্ধুবাহিনীর সেনাপতিরা সেনাদের মনোবল আরো চাঙা করে তুলেছিল।
সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েল তার সেনাদের নিয়ে অনেকটা নির্ভয়েই আসছিলেন। অবশ্য আরবদের যুদ্ধকৌশলের অংশ হিসেবে তিনি সেনাদের একটি অংশকে অনেক আগে অগ্রবর্তী দল হিসাবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের দু’জন পিছিয়ে এসে সেনাপতি বুদাইলকে জানালো পথিমধ্যে ডাভেলের সৈন্যরা ওঁৎ পেতে রয়েছে। এরা দু’জন ডাভেল সেনাদের যে অবস্থায় দেখেছিল তা সবিস্তারে সেনাপতি বুদাইলকে জানালো। সেনাপতি বুদাইল ছিলেন অভিজ্ঞ যোদ্ধা। তিনি শত্রুদের রণপ্রস্তুতির খবর শুনেই বুঝতে পেরেছিলেন, প্রতিপক্ষ তাদের আগমন সংবাদ অনেক আগেই পেয়ে গেছে। তিনি সেনাদেরকে তিনভাগে ভাগ করে একটি অংশ নিজের সাথে রেখে মূল পথে অগ্রসর হতে লাগলেন এবং অপর দুই ভাগকে দু’দিকে অনেকটা ঘুরে শত্রু বাহিনীর পিছন দিয়ে দু’বাহুতে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। শত্রুপক্ষ ওঁৎ পেতে ছিল। তাছাড়া তারা মুসলিম বাহিনীর আগমন সংবাদ সরবরাহের জন্য কিছু সেনাকে অগ্রবর্তী দল হিসাবে পাঠিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শত্রু বাহিনীর অগ্রবর্তী দল সেনাপতি বুদাইলের বাহিনীকে তিনভাগ করে দু’ভাগ দু’পাশের বাহুতে আক্রমণের প্রস্তুতির খবর সংগ্রহ করতে পারেনি। শত্রু বাহিনীর অগ্রবর্তী দল শুধু সেনাপতি বুদাইলের কমান্ডে পরিচালিত সেনাদের দেখে ছিল। বুদাইলের সাথে যে সেনাবাহিনী ছিল শত্রুবাহিনী তাদেরকেই গোটা মুসলিম বাহিনী কিংবা অগ্রবর্তী বাহিনী ভেবেছিল। সেনাপতি বুদাইল গতি মন্থর করে দিলেন, যাতে তার ডান বামের দু’দল শত্রুদের ওঁৎপেতে থাকা জায়গায় দূরবর্তী পথ ঘুরে চলে আসতে পারে।
