এ অভিযানে হাজ্জাজ একটি মারাত্মক ভুল করলেন। গোয়েন্দারা তাকে রাজা দাহিরের সমরশক্তি ও সেনাদের যুদ্ধ ক্ষমতার সঠিক তথ্য চিত্র দিয়েছিল কিন্তু অত্যধিক ক্ষুব্ধ থাকার কারণে হাজ্জাজ রাজা দাহিরের বাহিনীর সমর শক্তি পর্যালোচনা করেন নি। তিনি তার সেনাদের লড়াই ক্ষমতার ওপর বেশী আশ্বস্ত ছিলেন। ভেবেছিলেন ডাভেলের পৌত্তলিক সেনারা এদের মোকাবেলায় দাঁড়ানোরই সাহস পাবে না। কিন্তু ঘটনা হাজ্জাজের ধারণার বিপরীত ঘটে গেল। রাজা দাহির অসতর্ক ছিল না। সে বুঝতে পেরেছিল তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ পত্রের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় আরবরা যে কোন মূল্যে কয়েদীদের মুক্ত করতে তার দেশে আক্রমণ চালাবে। এজন্য সে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত রেখেছিল। মুসলিম বাহিনী পৌছার খবর পেয়ে সে সকল সেনাদেরকে দুর্গ বন্দি করে
তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুলল। দাহিরের সেনাদের মধ্যে বিচক্ষণ কমান্ডারের অভাব ছিল না। এরা দুর্গের বাইরে গিয়ে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলায় যুদ্ধ করতে রাজাকে রাজী করালো এবং তুমুল যুদ্ধ শুরু করল। শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ল মুসলিম বাহিনী। সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে নাবহান প্রথম দিনের যুদ্ধেই আচমকা এক আঘাতে নিহত হলেন ফলে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো।
সেনাপতির অবর্তমানে সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। আব্দুল্লাহ ইবনে নাবহান শত্রুদের মোকাবেলায় কোন ত্রুটি করেননি কিন্তু তার মৃত্যুটা ছিল একটা দুর্ঘটনা। সেনাপতির মৃত্যুর ফলশ্রুতিতে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যখন হতাশা ছড়িয়ে পড়লো এর পূর্ণ সুযোগ নিলো দাহিরের বাহিনী। তারা আরো প্রবল বিক্রমে আঘাত হানলো। সেনাপতি হারা বাহিনী আঘাতের তীব্রতা সামলাতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হলো। এই অনাকাক্ষিত পরাজয় হাজ্জাজের জন্য বয়ে আনলো মারাত্মক বিপর্যয়।
০৩. পরাজয়ের গ্লানি
পরাজয়ের গ্লানি হাজ্জাজ হজম করে নিলেন বটে কিন্তু এ পরাজয় তার ঘুম, নাওয়া-খাওয়া, আরাম স্বস্তি সবই দূর করে দিলো। স্বভাবতই হাজ্জাজ ছিলেন কঠিন হৃদয়ের মানুষ। সেই সাথে আগ্রাসী। তার স্বভাব চরিত্রে ক্ষোভ ও গব ছিল রক্তের শিরায় শিরায় মেশানো। হাজ্জাজ যখন কারো বিরুদ্ধে ক্ষেপে যেতেন তখন মনে হতো তার হৃদয়ে দয়া মায়ার লেশমাত্র নেই। মায়া মমতা কি জিনিস এটা বোধ হয় হাজ্জাজ কখনও বুঝেন নি। খেলাফতের যেসব বিদ্রোহী ভয়ে আরব দেশ ত্যাগ করে আরব সাগরের এপারে এসে মাকরানে বসতি স্থাপন করেছিল, তারা কোন না কোন শর্তে খলিফার আনুকূল্যে দেশে ফিরে যেতে পারত।
কিন্তু তাদের কেউ হাজ্জাজের ভয়ে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করারও সাহস করত না। কারণ তারা জানত খলিফা তাদের বিদ্রোহের অপরাধ ক্ষমা করে দিলেও হাজ্জাজ তাদের কখনও ক্ষমা করবে না। যে হাজ্জাজের নির্মমতা ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে খলিফা নিজেও গুণে গুণে তার সাথে কথা বলতেন, সেই হাজ্জাজের পক্ষে এতো বড় পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করা সম্ভব ছিল না। হাজ্জাজ যখন খবর পেলেন, তার পাঠানো সেনাবাহিনী শোচনীয়ভাবে দাহির বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে এবং সেনাপতি নাবহান মৃত্যুবরণ করেছেন, তখন তিনি সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েলকে ডেকে তাকে ডাভেল আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে বললেন—
“তোমাকেও যদি রণাঙ্গন থেকে পিছপা হতে হয়, তাহলে এদিকে আর ফিরে এসো না। যেসব বিদ্রোহী মাকরানে বসতি গড়েছে, ওদের ওখানে গিয়ে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিও। কারণ ওদের জন্য আরবের দরজা বন্ধ। ওখানে গিয়ে মরে যেয়ো। আমি যে কোন মূল্যে রাজা দাহিরের কব্জা থেকে
ডাভেলের দুর্গ ছিনিয়ে আনতে চাই, সেই সাথে চাই দাহিরের মৃত কিংবা জীবিত দেহ। এর বিকল্প অন্য কিছু আমার দরকার নেই।”
“আপনার ভাগ্য প্রসন্ন হোক ইবনে ইউসুফ! বললেন সেনাপতি বুদাইল বিন তোফায়েল। আমি ডাভেল ফেরত সৈন্যদের জিজ্ঞেস করে জেনেছি, সেনাপতি আব্দুল্লাহ রণাঙ্গনে পিঠ দেখায়নি। সাহসিকতার সাথে সে শত্রুদের মোকাবেলা করেছে। সে দাহির বাহিনীর মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে ওদের মধ্যভাগে ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু রাজা দাহিরের ছিল হস্তি বাহিনী। ওরা হাতির ওপর থেকে অসংখ্য তীর বৃষ্টি ছুড়ে তাকে ঘায়েল করে ফেলে। মুহতারাম ইবনে ইউসুফ! আপনি ইরাকের শাসক। আব্দুল্লাহর বাহাদুরী ও মৃত্যুকে কাপুরুষতার ভারতীয় আবর্জনা দিয়ে ঢেকে দেবেন না। মৃত্যু যে কোন মানুষের জীবনে যে কোন মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে। আল্লাহর কুদরতকে নিজের কব্জায় নেয়ার চেষ্টা থেকে বিরত হোন সম্মানিত আমীর!”।
“আল্লাহর কসম করে বলছি ইবনে তোফায়েল। তোমার এই সাহসিকতার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। আসলে পরাজয়ের গ্লানি ও প্রতিশোধের আগুন আমাকে এমন ভয়ানক কুফরী কথার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন।” বুদাইল! তুমি একটু ভেবে দেখো। আমার সিন্ধু অভিযানে খলিফা মোটেও রাজি ছিলেন না। তাকে অনেক ফুসলিয়ে রাজি করিয়েছি। এই ভয়ানক ক্ষয়ক্ষতি ও পরাজয়ের খবর পেয়ে তিনি আমাকে যে পয়গাম পাঠিয়েছেন, তা আমার মাথাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, “ইবনে ইউসুফ! আমি সিন্ধু অভিযানে সম্মতি না দেয়ার কোন কারণ উল্লেখ
করায় আপনি রুষ্ট হয়েছিলেন। এখন বুঝলেন তো কেন আমি এতোদিন আপনাকে সিন্ধু অভিযানের অনুমতি দেইনি?” পুনর্বার আমাদের অভিযানের জন্য কি খলিফার অনুমতি পাওয়া যাবে? হাজ্জাজকে জিজ্ঞেস করল সেনাপতি বুদাইল। “কারো অনুমতির প্রয়োজন নেই আমার। এটা আমার পরাজয়, এটা ইসলামের পরাজয়। এ পরাজয়কে অবশ্যই বিজয়ে রূপান্তরিত করতে হবে। আমি আমীরুল মুমিনীনকে বুঝাতে চাচ্ছি, সিন্ধু এলাকার অধিকার কেন আমাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে।
