এসব জাট (অনেকে এদেরকেই গোখা বলেন) সৈন্যরাই পাঁচ, সাতজনের একেকটি ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নিজেদেরকে শিকলে বেঁধে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। এতে করে কেউ পালিয়ে যেতে চাইলেও পালাতে পারতো না এবং প্রতিপক্ষ অগ্রসর হতে চাইলে শিকলে পেঁচিয়ে বাধাগ্রস্ত হতো।
এসব আমি আমার উস্তাদের কাছে শুনেছি চাচাজান। উস্তাদের কাছ থেকে আমি যা শুনেছি, সবই আমি হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছি। শিকলে বেঁধে যুদ্ধ করেছিল বলেই এই যুদ্ধকে “জঙ্গে সালাসিল” বলা হয়। পারসিক সেনাপতি হরমুজ খালিদ বিন ওয়ালিদের মুখোমুখি যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। এরপর পারসিকদেরকে মুসলমানরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
“আমার গোয়েন্দা সিন্ধু দেশের খবরাখবর আমাকে নিয়মিত পাঠাচ্ছে। আমার গোয়েন্দারাও বিদ্রোহীদের বেশ ধারণ করে ওদের সাথে রয়েছে। রাজা দাহির এতোটাই বদমাশ হয়ে পড়েছে যে, সমুদ্রের ডাকাতদেরও সে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এসব ডাকাত দল সন্দ্বীপ ও মালাবার অঞ্চল থেকে যেসব মুসলমান হজ্জ্ব করতে আসে এবং যেসব আরব মুসলমান ব্যবসায়িক
মালপত্র নিয়ে ওদের সমুদ্রকূল দিয়ে যাতায়াত করে, এসব ডাকাতেরা তাদের সবকিছু লুটে নেয়। এরই মধ্যে কয়েকটি মুসলিম জাহাজ এরা লুট করেছে।
“আমাদেরকে অবশ্যই মুসলমানদের যাতায়াত ব্যবস্থা এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা করতে হবে।” বললেন মুহাম্মদ বিন কাসিম।”
“আমি ব্যবস্থা বলতে একটাই বুঝি, সিন্ধু অঞ্চল আমরা দখল করতে না পারলেও অন্তত সিন্ধু অববাহিকার সমুদ্র অঞ্চল ও উপকূলের নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই আমাদের কব্জায় আনতে হবে।” বললেন হাজ্জাজ। সিন্ধু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বন্দর হলো ডাভেল। এটিকে দখলে নিতে পারলেই সমুদ্র পথ আমাদের নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে।” “আমীরুল মুমেনীন থেকে যুদ্ধের অনুমতি নিয়ে দিন। পরে একটু সময় দিন আমি ডাভেল বন্দরের নিয়ন্ত্রণ আপনার অধীনে এনে দেবো।” বললেন মুহাম্মদ। “খলিফার অনুমতি নেয়ার চেষ্টা আমি অনেকদিন থেকেই করছি।” বললেন হাজ্জাজ। কিন্তু তিনি অনুমতি দিচ্ছেন না। হয়তো অনুমতি তিনি দেবেনই না। রাজা দাহির। নিজের বোনের স্বামী। আমি ওর দেহকে আরবদের ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হতে দেখতে চাই, ওকে আমি তুলা ধোনা করতে চাই…।” “পরদিন মুহাম্মদ বিন কাসিম চাচা হাজ্জাজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিরাজ নগরে চলে গেলেন।
এর প্রায় দু’মাস পরের ঘটনা। বসরায় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ দুপুরের আহারের পর আরাম করছিলেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন তার নিরাপত্তারক্ষী কাউকে ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে, আর লোকটি ভিতরে প্রবেশে দ্বাররক্ষীর বাধা মানতে চাচ্ছে না। এ নিয়ে দ্বাররক্ষী ও আগন্তুকের মধ্যে বাদানুবাদ হচ্ছে। এরই মধ্যে কারো কণ্ঠে শোনা গেল “হে হাজ্জাজ সাহায্য করো! হে হাজ্জাজ সাহায্য করো! হাজ্জাজ আমাদের সাহায্য করো।”
হাজ্জাজ দ্বাররক্ষীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাইরে কি হচ্ছে?”
“বাইরে এক ক্লান্ত-শ্রান্ত লোক এসেছে। সে সন্দ্বীপ থেকে এসেছে বলে দাবী করছে। বলছে তাদের জাহাজ ডাকাতরা লুটে নিয়েছে এবং আরোহী সবাইকে ডাকাত দল বন্দি করে নিয়ে গেছে…।”
“তাকে এক্ষুণি ভিতরে নিয়ে এসো। জলদি যাও! আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকো না।”
“হাজ্জাজ দ্বাররক্ষীকে বিদায় করে সাহায্যপ্রার্থীকে নিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি নিজেই দ্বাররক্ষীর পিছনে পিছনে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। তিনি বাইরে এসে দেখতে পেলেন, একজন অশ্বারোহী ঘোড়ার পিঠে ঝুঁকে রয়েছে, আর ঘোড়াটি অত্যধিক খাটুনীর কারণে ঘেমে নেয়ে গেছে এবং হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ধুকছে ঘোড়াটি। আরোহীর মাথা বুকের সাথে মিশে গেছে। লোকটি হাজ্জাজের আগমন টের পেয়ে মাথা উঁচু করলে হাজ্জাজ দেখতে পেলেন, তার মুখ ব্যাদান হয়ে রয়েছে এবং চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ঠোট দুটো সাদা হয়ে শুকিয়ে গেছে। শরীরে ধুলোবালির আস্তরণ পড়ে গেছে। লোকটি হাজ্জাজকে দেখে বলে উঠলো, “হে হাজ্জাজ! আমাদের জাহাজ হিন্দুস্তানের ডাকাতরা লুট করেছে এবং আরোহী সবাইকে ধরে রাজা দাহিরের রাজমহলে নিয়ে গেছে।”
“তাড়াতাড়ি আরোহীকে পানি পান করানো হলো। হাজ্জাজের নির্দেশে তাকে মেহমানখানায় নিয়ে যেতে চাইলে লোকটি বলল, আগে আমার কথা শুনে নাও। পরে শোনার কথা বললে আরোহী বলল, এক্ষুণি আমার কথা শুনে নাও। আমার প্রাণ বায়ু ফুরিয়ে যাচ্ছে। হায়াত আমাকে বেশী সময় দেবে বলে মনে হচ্ছে না। আমি এক নির্যাতিতা আরব কন্যার ফরিয়াদ বার্তা নিয়ে এসেছি।”
আগন্তুক বলল, সন্দীপে বসবাসকারী মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি। পাচ্ছিল। মুসলমানদের জীবনযাত্রা ও তাদের উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সেখানকার শাসক মুসলমানদের সাথে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন।
তিনি মুসলিম খলিফার কাছে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ আটটি জাহাজ বোঝাই করে উপহার উপঢৌকন পাঠালেন। এসব উপহার উপঢৌকনের মধ্যে দামী তৈজসপত্র ছাড়াও ছিল কিছু হিন্দুস্থানী উন্নত ঘোড়া অন্যান্য গৃহপালিত ও বন্য পশু, কিছু সংখ্যক হাবশী দাস দাসী।
এসব উপহার সন্দ্বীপের রাজা পাঠিয়েছিলেন সন্দীপে বসবাসকারী মুসলমানদের দিয়ে। তাদের জাহাজে ছিল কিছু সংখ্যক আরব ব্যবসায়ী যারা আরব ও হিন্দুস্তানে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে যাতায়াত করতেন। তাছাড়া কিছু
