“তাহলে একটাই পথ আছে মহারাজ! আপনি যেসব আরবদেরকে এখানে আশ্রয় দিয়েছেন এদেরকে আপনার দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। করতে রাজি করুন।”
“কিন্তু এরাও তো সংখ্যায় বেশী নয়। মাত্র পাঁচশ বা এর কিছু বেশী হবে। এতো অল্প মানুষ কিভাবে বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করবে?” বলল রাজা।
“মহারাজ! আপনি কি জানেন না, এরা সেই জাতি যারা রোম ও পারস্যের বিশাল সমরশক্তিকে গুড়িয়ে দিয়ে বিজয় অর্জন করেছে। এরা লড়াকু জাতি। হাতে গোনা সৈন্য নিয়ে বিশাল বাহিনীর মোকাবেলায় বিজয় অর্জনের অভিজ্ঞতা এদের আছে।” বলল উজির।
তারিখে মাসুমীতে বর্ণিত হয়েছে “রাজা দাহির তার দেশ রক্ষার জন্য তার আশ্রিত আরবদের কাছে নিজে গিয়ে শত্রুদের মোকাবেলার অনুরোধ করল।” আশ্রিত মুসলমানের সংখ্যা ছিল পাঁচশ। এদের অধিকাংশই ছিল প্রথম সারির যোদ্ধা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সন্তান। আব্দুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে সাঈদ বিন আসলাম নামের মাকরানের গভর্নরকে এরা হত্যা করে বিদ্রোহ করেছিল। এই অপরাধে খলিফার রোষের শিকার হয়ে এরা সিন্ধুতে এসে রাজা দাহিরের কাছে আশ্রয় নেয়। আশ্রিতরা সবাই মিলে হারেস বিন আলাফীকে তাদের নেতা ঘোষণা করে।
রাজার আগমন সংবাদ শুনে আশ্রিত আরবদের সর্দার হারেস আলাফী রাজাকে স্বাগত জানিয়ে বলল— “মহারাজ! আজ আপনাকে অন্যদিনের মতো দেখাচ্ছে না। এমন ব্যতিক্রম দেখছি কেন মহারাজ!”
“আমার মর্যাদা এখন প্রশ্নের মুখোমুখি। তোমাদের তরবারীই পারে আমার সম্মান মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখতে। আমি তোমাদের উপকারের প্রতিদান নিতে আসিনি, উপকারের ডঙ্কা বাজাতে আসিনি। আমি বন্ধুত্বের দাবী নিয়ে এসেছি।” হারেস আলাফী তাকে বসিয়ে আরব আশ্রিতদের আরো কয়েকজন ( নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে ডেকে পাঠাল।
“মহারাজ! বলুন, আমাদের তরবারীর এমন কি প্রয়োজন পড়েছে আপনার? আমরা অবশ্যই আপনার বন্ধুত্বের হক আদায় করতে প্রস্তুত।”
“রাজা দাহির আশ্রিত আরব সর্দার হারেসকে জানাল, তার বিরুদ্ধে বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে এক শক্তিশালী বাহিনী আক্রমণ করতে আসছে। রাজধানী থেকে মাত্র দশ মাইল দূরে তাঁবু গেড়েছে শত্রুবাহিনী।
“একথা শুনে হারেস আলাফী বলল, “আল্লাহর কসম! মুসলমানরা বন্ধুত্বের দাবী আদায়ে কখনো পিছপা হয় না। আমরা অবশ্যই আপনার বন্ধুত্বের হক আদায় করব। প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করব না।”
“তাহলে এখনই কোন পরিকল্পনা তৈরী করে নাও, দয়া করে শত্রুদের হাত থেকে আমার দেশকে রক্ষা করো। রাজা দাহির হতাশ ও পরাজিতের স্বরে বলল। শুনেছি শত্রুদের হাতে পাগলা হাতি রয়েছে। হস্তিবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞকে কোন বাহিনীই রুখতে পারে না, ওদের চিৎকারেই সৈন্যরা ভয় পেয়ে যায়। তোমরা কি এসব হাতির মোকাবেলা করার ব্যবস্থা করতে পারবে?”
“মহারাজ। কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, এক আরব বৃদ্ধ। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগের ঘটনা স্মরণ করো। তখন তুমি খুবই ছোট ছিলে। পারস্যের অগ্নি পূজারীরা আমাদের কাছে পরাজিত হয়ে কাদেসিয়ার যুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ ঘটাল যে, এর আগে কোন যুদ্ধে এতো অধিক পরিমাণ সৈন্য সমাবেশ কোথাও ঘটেনি। অগ্নি পূজারীরা মনে করেছিল, এটাই হবে ওদের সাথে আমাদের শেষ লড়াই, এরপর আমাদের আর কোন অস্তিত্বই থাকবে না। ওরা বিশাল হস্তিবাহিনী নিয়ে এলো। আমরা অনেকে জীবনেও হাতি দেখিনি। হাতি ছিল আমাদের জন্যে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। আমি তখন যুবক। সে লড়াইয়ে ছিলাম আমি। হে রাজা! তুমি হয়তো জেনে থাকবে, পারস্য ম্রাটকে জঙ্গী হাতি সরবরাহ করেছিল তৎকালীন সিন্ধু অঞ্চলের রাজা….। আজ চল্লিশ বছর হয়ে গেছে। কিন্তু এখনও সেইসব হাতির চিৎকার আমার কানে বাজে। এসব হাতি আমাদের ভয়ানক ক্ষতি করেছিল। তবে আমরা হাতির সুড় কেটে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলাম। কি মনে করো রাজা! কাজটি খুব সহজ ছিল?”
“অবশ্যই নয়, দোস্ত!” বলল রাজা দাহির। হ্যাঁ, আমি বড় হয়ে শুনেছি। কাদেসিয়ার যুদ্ধে হস্তিবাহিনী মুসলমানদের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও মুসলমানরা যখন হাতিগুলোর সুড় কাটতে শুরু করে তখন আহত হাতিগুলোই
পারসিকদের জন্য হয়ে ওঠে বিপদ। হাতির পায়ে পিষ্ট হয়েই মারা পড়ে বহু পারসিক সৈন্য। ফলে শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।”
৬৩৫ খৃস্টাব্দে কাদেসিয়া যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তখন পারস্যের রাজা ছিলেন ইয়াজদগিদ। তিনি পূর্বাঞ্চলের সকল অমুসলিম রাজাদের কাছ থেকে এই বলে সাহায্য নিয়েছিলেন যে, যদি মুসলমানদের এখনই প্রতিরোধ না
করা যায়, তাহলে দুনিয়াতে কোন ধর্মই আর থাকবে না। মুসলমানরা সবাইকে গোলাম বাদীতে পরিণত করবে। পারস্যের রাজা ইয়াজদেগিদ সিন্ধু রাজার কাছেও সাহায্যের আবেদন করেছিল। সিন্ধু রাজা তার কিছু সৈন্যসহ এই ভয়ানক জঙ্গী হাতি উপহার দেয়। কতগুলো হাতি সিন্ধু রাজা পারস্য ম্রাটকে দিয়েছিল তা আমরা জানতে পারিনি। তবে এতটুকু জানতে পেরেছিলাম যে, সম্রাটের জন্য রাজা নিজের ব্যবহৃত সাদা কালো মিশ্রিত কাজলা রঙের হাতিটিও দিয়েছিল। কাদেসিয়া যুদ্ধে সেই হাতিতে সওয়ার ছিল পারস্যের বিখ্যাত সেনাপতি রুস্তম। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি রুস্তমের। কাদেসিয়া যুদ্ধেই আমাদের সৈন্যদের হাতে রুস্তম নিহত হয়।”
