৬২৭ খিষ্টাব্দের ১৮ মার্চ মঙ্গলবার মদীনার আবহাওয়ায় হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে। চারদিকে নিরবতা। বাতাস থেমে যায়। শীত-শীত ভাব। থমথমে অবস্থা। কিন্তু এটা ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস। তুফানের পূর্বাভাস। হঠাৎ করে পৃথিবী অন্ধকারে ছেয়ে যায়। শুরু হয় ঘূর্ণিঝড়। বাতাস এত বেগে প্রবাহিত হয় যে, তাঁবু দোল খেতে থাকে এবং উড়ে যাবার উপক্রম হয়। বাতাসের ঝাপটা খুবই শীতল। আঁধারের তীব্রতা এবং বজ্রধ্বনিতে ঘোড়া, উট ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে রশি ছেড়ার মত অবস্থা।
মুসলিম ক্যাম্প ছিল পাহাড় সালা সংলগ্ন এলাকায়। যার ফলে ঘূর্ণিঝড় কুরাইশদের ন্যায় তাদের পর্যদুস্ত করে না। মক্কার সৈন্যরা ছিল খোলামাঠে। ঘূর্ণিঝড় তাদের রসদ-সামগ্রী উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাঁবু ছিড়ে ফেলে কিংবা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। নেতৃস্থানীয় এবং সাধারণ সৈন্য সকলেই ব্যক্তিগত কাপড় গায়ে জড়িয়ে বসে ছিল। তাদের জন্য ঘূর্ণিঝড় খোদার গজব হয়ে দেখা দেয়। থেকে থেকে বিকট বজ্রধ্বনি তাদের কানে শেলের মত আঘাত হানছিল।
আবু সুফিয়ান এই মহা দুর্যোগ সহ্য করতে পারে না। সে উঠে যায় কিন্তু ঘোড়া খুঁজে পায় না। কাছে একটি উট শুয়ে আরাম করছিল। আবু সুফিয়ান তার পৃষ্ঠে চড়ে উটকে দাঁড় করায়। ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের বর্ণনামতে আবু সুফিয়ান যাবার কালে চিৎকার করতে থাকে– “কুরাইশগণ! কা’ব বিন আসাদ তোমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। ঘূর্ণিঝড়েও আমরা দারুণভাবে বিধ্বস্ত। এখানে থাকা আত্মঘাতির শামিল। মক্কায় ফেরৎ চল।… আমি চলে যাচ্ছি।… আমি চললাম।”
সে কারো উত্তর বা কোন কিছুর অপেক্ষা করে না। একাই মক্কাপানে উট হাঁকিয়ে দেয়।
আজ খালিদের চোখে ভাসতে থাকে একটি বেদনাবিধুর দৃশ্য। যে বহুজাতিক বাহিনী মক্কা ত্যাগ করে রওনা হলে খালিদের বুক ফুলে দ্বিগুণ হয়েছিল, তারা আবু সুফিয়ানের আহ্বানে তার পেছনে পেছনে ভীতু বাঘের মত দৌড়ে পালাতে শুরু করেছিল। খালিদ এবং আমর ইবনুল আসের ব্যক্তিগত ধারণা ছিল, হয়ত মুসলমানরা পিছু হঁটা সৈন্যদের উপর পেছন দিক হতে চড়াও হতে পারে। তাই তারা তাদের বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সৈন্যদের একেবারে পেছনে গিয়ে সতর্ক অবস্থান নেয়। আবু সুফিয়ান সর্বাধিনায়ক হয়ে নিরাপত্তার এদিকটা বিবেচনা করেনি। পলায়নের চিন্তায় সে ছিল বিভোর। মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষাকারী।
পিছু হঁটা এই বাহিনীতে একমাত্র অনুপস্থিত ছিল হযরত নু’আইম বিন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ঘূর্ণিঝড় চলাকালীন সময় যখন কুরাইশ সৈন্যরা ফিরে যায় তখন তিনি সুযোগ করে পরিখায় নেমে পড়েন এবং সোজা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চলে যান।
আজ খালিদ ইতিহাসের গতি পরিবর্তন করে দেয়। বিশ্ব-ইতিহাস নতুন দিকে মোড় নেয়।
♣♣♣
ঘূর্ণিঝড় জগদ্বাসীর সম্মুখে এ বাস্তবতা তুলে ধরে যে, আল্লাহ্ তায়ালা সত্যপূজারীদের সাথে থাকেন।
দুশমনের পিছু ধাওয়া ছিল অনেকটা ঐ তৃণের মতো যা ঘূর্ণিঝড়ের তোড়ে উড়ে যায়। অথচ কেউ কারো খবর রাখে না।
খালিদের এই আশঙ্কা ছিল যে, মুসলমানরা পিছু নিবে। কিন্তু মুসলমানরা স্বপ্নেও এ চিন্তা করে নি। স্মরণকালের ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ে পশ্চাদ্ধাবন করলে তা হিতে বিপরীত হতে পারত। আল্লাহ নিজেই যাদের ভাগিয়ে দিচ্ছেন। তাদের পশ্চাদ্ধাবন করাটা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হত না। অবশ্য সর্বোচ্চ সতর্কতা হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে শত্রুদের উপর নজর রাখতে কয়েকজনকে উঁচু জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। যেন এমনটি না হয় যে, শত্রু কিছু দূর গিয়ে থেকে যাবে এবং আবার সংগঠিত হয়ে ফিরে আসবে।
ঘূর্ণিঝড় আরবের মাটি এবং বালু এত পরিমাণ উড়ায় যে, সামান্য দুরের কিছুও দেখা যাচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পর তিন-চার জন মুসলমান অশ্বারোহী ঐ স্থান দিয়ে পরিখা অতিক্রম করে, ইকরামা এবং হযরত খালিদের ঘোড়া যে স্থান দিয়ে পরিখা অতিক্রম করে। তারা দূর-দূরান্ত পর্যন্ত যায়। উৎক্ষিপ্ত ধুলা-বালু ছাড়া আর কিছুই তাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। তারা যাত্রাবিরতি করে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে না।
সন্ধ্যার কিছু পূর্বে ঘূর্ণিঝড় কিছুটা থামে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হয় এবং বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। দূরের দিগন্তে ভূপৃষ্ঠ থেকে ধূলি মেঘ উঠছিল। বহুজাতিক বাহিনীর পশ্চাদপসারণ ছিল এ ধূলিঝড়ের উৎস। ডুবন্তপ্রায় সূর্যের আলোতে এ ধূলিমেঘ স্পষ্টরূপে দেখা যায়। ধূলার কুণ্ডলী মক্কাভিমুখে যাচ্ছিল। পশ্চাদ্ধাবনে যাওয়া মুসলিম অশ্বারোহী দল গভীর রাতে ক্যাম্পে ফিরে আসে।
অনুসন্ধান টিম রিপোর্ট পেশ করে – “আল্লাহর শপথ! যারা আমাদের আকীদা-বিশ্বাস ধ্বংস এবং মদীনার ইট খুলতে এসেছিল, তারা এত ভীতি ও উদ্বেগ নিয়ে ফিরে গেছে যে, রাস্তায় কোথাও থামেনি। মুসাফিররা রাতেও কি কাফেলা থামায়? সৈন্যরা কি রাতেও যাত্রা অব্যাহত রাখে?… কেবল তারাই রাখে, যারা অতি দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে চায়।”
হাদীস এবং ঐতিহাসিকদের বর্ণনা মতে জানা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নিশ্চিত হন যে, শত্রুরা অত্যন্ত ঘাবড়ে পালিয়ে গেছে এবং সংগঠিত হয়ে পুনরায় ফিরে আসার কোনই সম্ভাবনা নেই, তখন তিনি তলোয়ার, খঞ্জর নিজ হোলেস্টার থেকে বের করে রেখে দেন এবং আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করে গোসল করেন।
