এবার মুবী আরো তথ্য দিতে শুরু করে সঙ্গীদের। বলে, রবিন জখমের ভান করে সুলতান আইউবীর জখমীদের তাঁবুতে পড়ে আছেন। তিনি বলেছেন, নাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানতে হবে, তিনি বিদ্রোহ কেন করলেন না কিংবা পিছন থেকে কেন তিনি সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর আক্রমণ করলেন না। তাছাড়া নাজি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করলেন কিনা, রবিন তারও খোঁজ নিতে বলেছেন।
মুবীকে ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে দেখে ফখরুল মিসরী জিজ্ঞেস করে–ও কী বলছে?
একজন জবাব দেয়–ও বলছে, যদি এ লোকটি, অর্থাৎ তুমি যদি সালাহুদ্দীন আইউবীর সৈনিক না হতে, তাহলে ও তোমাকে বিয়ে করে নিতো। প্রয়োজনে ও মুসলমান হয়ে যেতেও প্রস্তুত আছে। কিন্তু ও বলছে, এখন আর কোন মুসলমানের উপর তার আস্থা নেই।
জবাব শুনে ব্যাকুল হয়ে উঠে ফখরুল মিসরী। খপ করে মেয়েটির দু বাহু ধরে ফেলে নিজের কাছে টেনে আনে। আপুত কণ্ঠে বলে–খোদার কসম! আমি যদি রাজা হতাম, তবুও তোমার খাতিরে আমি সিংহাসন ত্যাগ করতাম। শর্ত যদি এ-ই হয় যে, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর তরবারী ফেলে দেবো, তাহলে এই নাও আইউবীর তরবারী। নিজের কটিবন্ধ থেকে তরবারীটা বের করে কোষসহ মেয়েটির পায়ের উপর রেখে দেয় ফখরুল মিসরী। বলে–এ মুহূর্ত থেকে আমি আইউবীর সৈনিক নই, কমাণ্ডার নই।
আরো একটি শর্ত আছে। তোমার খাতিরে আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করবো। ঠিক; কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী থেকে প্রতিশোধ আমি নেবো-ই। বললো মেয়েটি।
তার মানে তুমি কি তাকে আমাকে দিয়ে হত্যা করাতে চাও? জিজ্ঞেস করে ফখরুল।
মুবী তার সঙ্গীদের প্রতি তাকায়। পরস্পর চোখাচোখী করে সকলে। জবাবটা কী দেবে স্থির করে নেয় ক্রিস্টোফর। অবশেষে বলে–এক সালাহুদ্দীন বিদায় নিলে তাতে তেমন কি আর লাভ হবে। আসবে আরেক সুলতান। সেও হবে তার-ই মতো। গোলাম হয়েই থাকতে হবে মিসরীদের। কাজেই ও-সবের প্রয়োজন নেই। তুমি বরং একটা কাজ করো; সুদানীদের সালার নাজির কাছে যাও এবং এই মেয়েটিকে তার সামনে উপস্থিত রেখে তাকে জানাও, সালাহুদ্দীন আইউবী আসলে কেমন মানুষ আর লক্ষ্য-ই বা তার কী?
বণিকবেশী খৃষ্টান কুচক্রীদের জানা ছিলো, খৃষ্টানদের সঙ্গে নাজির যোগসাজশ আছে এবং মুবী অকপটে তার সঙ্গে মিশন নিয়ে কথা বলতে পারবে। কিন্তু সুলতান আইউবী যে বিশ্বাসঘাতক নাজি ও তার সালারদের কৌশলে সংগোপনে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছেন, তা তাদের অজানা তথ্য নেয়ার জন্য নাজির কাছে যাওয়ার কথা ছিলো মেয়েটির। কিন্তু তার একা যাওয়া সম্ভব ছিলো না। ঘটনাক্রমে ফখরুল মিসরীকে পেয়ে গেছে সে। তাকেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত হয়।
মুবীকে নিয়ে রওনা হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয় ফখরুল মিসরীকে। একটি উট দেয়া হয় তাকে। পানির মশক এবং খাবারভর্তি একটি থলে বেঁধে দেয়া হয় উটের সঙ্গে। খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে কিছু জিনিস আছে, তাতে হাশীশ মেশানো। বিষয়টা জানা ছিলো মুবীর।
একটি লম্বা চোগা এবং ব্যবসায়ীর পোশাক পরিয়ে দেয়া হয় ফখরুল মিসরীকে। উটের পিঠে সম্মুখভাবে চড়ে বসে মেয়েটি। ফখরুল বসে পিছনে। চলতে শুরু করে উট।
আশ-পাশের কোন খবর নেই ফখরুল মিসরীর। এমনকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সম্পূর্ণ উদাসীন সে। এ মুহূর্তে লোকটা জানে শুধু একটা-ই–পৃথিবীর একটি সেরা সুন্দরী যুবতী তার মুঠোয়, সুলতান আইউবীকে উপেক্ষা করে যে তাকে বরণ করে নিয়েছে! মুবীকে দু বাহুতে জড়িয়ে ধরে পিঠটা তার নিজের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে বসেছে ফখরুল মিসরী।
মুবী বললো–তুমিও আবার খৃষ্টান কমাণ্ডার আর তোমার সুলতানের মতো হায়েনার পরিচয় দেবে না তো? আমি এখন তোমার মালিকানাধীন, তোমার হাতের মুঠোয়। যা মন চায় করার সুযোগ তোমার আছে। তবুও আমি তোমায় ঘৃণার চোখে দেখবো।
তুমি যদি বলো, আমি এখনি উটের পিঠ থেকে নেমে যাবো। আমাকে তুমি শুধু এতটুকু বলল, তুমি মনে-প্রাণে আমাকে কামনা করছে, না-কি নিছক বিপদে পড়ে আমার আশ্রয়ে এসেছো? বাহুবন্ধন থেকে মুবীকে ছেড়ে দিয়ে বললো ফখরুল মিসরী।
না, তা নয়। আশ্রয় তো আমি ঐ ব্যবসায়ীদেরও নিতে পারতাম। কিন্তু। তোমাকে আমার মনে ধরেছে বলেই নিজের ধর্মটা পর্যন্ত ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জবাব দেয় মুবী। আবেগময় কথা বলে মুবী ফখরুল মিসরীকে মাতিয়ে রাখে এবং কথায় কথায় রাত কাটিয়ে দেয়।
সফরটা ছিলো অন্তত পাঁচ দিনের । কিন্তু ফখরুল মিসরী পথ চলছে সাধারণ রাস্তা ছেড়ে অন্য পথে। কারণ, লোকটা দলছুট সৈনিক। ঘুম চাপতে শুরু করে মুবীর। তাই পিছনে হেলান দিয়ে মাথাটা ফখরুল মিসরীর বুকে এলিয়ে দিয়ে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায় সে। চলতে থাকে উট। জেগে আছে ফখরুল মিসরী।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সবেমাত্র ফজর নামায সমাপ্ত করেছেন। জায়নামাজ ছেড়ে এখনো ওঠেননি। কক্ষে প্রবেশ করে দারোয়ান সংবাদ জানায়, আলী বিন সুফিয়ান এসেছেন। সুলতান দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। সুলতানকে সালাম দেন আলী বিন সুফিয়ান। কিন্তু সালামের জবাব দেয়ার আগেই সুলতানের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে–ওদিকের খবর কী?
এখনো ভালো। তবে সুদানী সৈন্যদের মধ্যে অস্থিরতা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। তাদের মধ্যে আমি যে গুপ্তচর রেখে এসেছিলাম, তার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তাদের কোন একজন কমাণ্ডারও যদি নেতৃত্ব হাতে তুলে নেয়, তাহলে বিদ্রোহ ঘটে যাবে। জবাব দেন আলী বিন সুফিয়ান।
