না, তীর ছুঁড়েছিলেন ক্রিস্টোফর নিজেই। কিন্তু…
কিন্তু ক্রিস্টোফরের তীর ব্যর্থ গেছে, তাই না? যার তীরন্দাজী দেখে শাহ। অগাস্টাস অভিভূত হয়েছিলেন, এখানে এসে তার নিশানা এতই ব্যর্থ হয়ে গেলো যে, ছয় ফুট দীর্ঘ আর তিন ফুট চওড়া একটা সালাহুদ্দীন তার তীর থেকে বেঁচে গেলো! অভাগার হাতটা ভয়ে কেঁপে উঠেছিলো বোধ হয়। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো রবিন।
ব্যবধান ছিল অনেক। তাছাড়া ক্রিস্টোফর বললেন, ধনুক থেকে তীরটি বের হবে হবে অবস্থায় একটি পোকা এসে তার চোখে পড়ে এবং সে অবস্থায়-ই লক্ষ্যহীনভাবে তীরটি বেরিয়ে যায়।
তারপর কী হলো?
যা হওয়ার ছিলো, তা-ই হলো। সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে ছিলো তিনজন কমাণ্ডার এবং চারজন দেহরক্ষী। তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। আমাদের ভাগ্য ভালো ছিলো। ক্রিস্টোফর টিলার আড়ালে নিরাপদে ফিরে আসেন। আমরা তীর-ধনুকগুলো বালিতে পুঁতে ফেলে উপরে উট বসিয়ে রাখি। আইউবীর সিপাইরা এসে পড়লে ক্রিস্টোফর জানালেন, তারা পাঁচজন মারাকেশী বণিক আর আমরা ছয়টি মেয়ে সমুদ্র থেকে উদ্ধার পেয়ে তাদের কাছে আশ্রয় নিয়েছি। মুসলিম সৈন্যরা আমাদের সামান-পত্র অনুসন্ধান করে ব্যবসার পণ্য ছাড়া আর কিছু-ই পেলো না। তারা আমাদের সবাইকে সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট নিয়ে যায়। আমরা ভাবে বুঝালাম যে, আমরা সিসিলি ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানি না। ক্রিস্টোফর আইউবীকে বললেন, তিনি আমাদের ভাষা বুঝেন। আমরা মেয়েরা চেহারায় ভীতি ও শঙ্কার ভাব ফুটিয়ে তুললাম।
সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আরো যেসব কথা হলো, রবিনকে সবিস্তার সব শোনালো মুবি। এই সাতটি মেয়ে এবং মারাকেশী বণিকবেশী পাঁচজন পুরুষ আক্রমণের দুদিন আগে কুলে অবতরণ করেছিলো। বণিকবেশী পুরুষ পাঁচজন ক্রুসেডারদের অভিজ্ঞ গুপ্তচর ও সেনাকমাণ্ডার। মেয়েগুলোও গুপ্তচর। তারা অত্যন্ত রূপসী। গুপ্তচরবৃত্তি ও মনন ধ্বংসের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে তাদের। গোপনে হত্যাকাণ্ড সংঘটনেও তারা বেশ পারদর্শী। পুরুষ পাঁচজনের মিশন ছিলো সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা আর নাজির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। মিসরের ভাষা অনর্গল বলতে পারতো মেয়েগুলো। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবীর সামনে তা গোপন রাখে তারা। রবিন ছিলো এ মিশনের প্রধান। নাজির সঙ্গে সাক্ষাত করার পরিকল্পনা ছিলো তার। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানের সতর্ক কৌশলের সাথে পেরে উঠলো না তারা।
তোমরা কি সালাহুদ্দীন আইউবীকে ফাঁদে ফেলতে পারো না? জিজ্ঞেস করে রবিন।
এখানে সবেমাত্র প্রথম রাত। আমাদের ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যদি তা সত্যমনে দিয়ে থাকেন, তাহলে তার অর্থ হলো, তিনি মানুষ নন পাষাণ। আমাদের কারো প্রতি তার আকর্ষণ থাকতো, তাহলে তিনি রাতে কাউকে না কাউকে নিজের তাঁবুতে অবশ্যই ডেকে পাঠাতেন। লোকটাকে হত্যা করাও অতটা সহজ নয়। একবার-ই তিনি উপকূলে এসেছিলেন। তীর ছোঁড়া হলো। ব্যর্থ গেলো তীর। সব সময় তিনি সালার ও রক্ষীদের প্রহরা বেষ্টনীতে থাকেন। এদিকে একজন মাত্র প্রহরী আমাদের মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে আর তার তাঁবুটি ঘিরে রেখে আছে গোটা রক্ষী ইউনিট।
ওরা পাঁচজন কোথায়? জিজ্ঞেস করে রবিন।
এই তো সামান্য দূরে। আপাতত ওরা সেখানেই থাকবে। জবাব দেয় মুবী।
শোনো মুবী! এই পরাজয়টা আমাকে পাগল করে তুলেছে। এ ব্যর্থতার সব দায়-দায়িত্ব যেন চাপছে এসে আমার ঘাড়ে। ক্রুশের উপর হাত রেখে শপথ তো আমরা সকলেই নিয়েছি। কিন্তু সাধারণ সৈনিকদের শপথ আর আমার মতো একজন দায়িত্বশীলের শপথে পার্থক্য অনেক। তুমি আমার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য করে। আমার কর্তব্যসমূহকে সামনে রেখে বিবেচনা করে। যুদ্ধের অন্তত অর্ধেকটা আমাদের মটির নীচ থেকে আর পিঠের পিছন থেকে আক্রমণ করে জয়লাভ করার প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু আমি, তোমরা সাতজন এবং অরা পাঁচজন নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি। এই ক্রুশ আমার থেকে জবাব চাইছে।
গলায় ঝুলন্ত ক্রুশটা হাতে নিয়ে রবিন বললো–এটিকে আমি আমার বুক থেকে আলাদা করতে পারি না।
রবিন মুবীর বুকে হাত বুলিয়ে তার ক্রুশটাও হাতে নিয়ে বললো, তুমি তোমার পিতা-মাতাকে ধোকা দিতে পারো, কিন্তু এই ক্রুশের মর্যাদা রক্ষায় উদাসীন হতে পারো না। তোমার উপর যে দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে, তা তোমাকে পালন করতেই হবে। খোদা তোমাকে যে রূপ দিয়েছেন, তা-ই তোমাকে পাথর চিড়ে পথ করে দেবে। আমি তোমাকে আবারো বলছি, আমাদের এই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত মিলন প্রমাণ করে, সফল আমরা হব-ই। আমাদের বাহিনী নোম উপসাগরের ওপারে সংগঠিত হচ্ছে। যারা মারা গেছে, তারা তো মারা গেছে। যারা জীবিত আছে, তারা জানে, এটি কোন পরাজয় নয়–ছিল এক প্রতারণা। তুমি তোমার তাঁবুতে ফিরে যাও; সঙ্গী মেয়েদের বলো, তারা যেন তাঁবুতে-ই পড়ে না থাকে। বারংবার যেন সালাহুদ্দীন আইউবী ও তার সালারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার মন জয় করার চেষ্টা করে এবং মুসলমান হওয়ার ভান ধরে। তারপর কী করতে হবে, তা তাদের জানা আছে।
সর্বাগ্রে আমাদের জানা দরকার, ঘটনাটা ঘটল কী? সুদানীরা কি আমাদেরকে ধোকা দিলো? বললো মুবী।
