দু দলের মাঝে ব্যবধান কমে আসছে। এখন দূরত্বটা কয়েক শ গজের বেশি হবে না। সম্মুখের আরোহীদ্বয় আড়াল থেকে সামনে চলে আসে। পিছনে দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা ঘোড়ার পদধ্বনি শুনে ফেলেছে তারা। তারা একদিকে সেরে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
আলী বিন সুফিয়ানের ঘোড়ার গতি আরো বেড়ে যায়। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ঘোড়া আপত্তি জানায় না। তারাও জানে, এই মিশনে আলী ও আইউবীকে সফল হতেই হবে। অতএব, কর্তব্যে অবহেলা করা চলবে না।
দলবলসহ পাহাড়ের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন আলী। দুটি ঘোড়া সে পথে অতিক্রম করেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেলো। কিন্তু এখনো বেশিদূর যেতে পারেনি। বোধ হয় পিলেয় ভয় ধরে গেছে তাদের। সম্ভবত তারা বেরুবার পথ পাচ্ছে না। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে ছুটাছুটি করে ফিরছে শুধু।
আলী বিন সুফিয়ান ঘোড়াগুলো এক সারিতে বিন্যস্ত করে সামনে-পিছনে ঘুরিয়ে দেন এবং পলায়নপর আরোহীদের কাছাকাছি পৌঁছে যান। দু দলের মাঝের দূরত্ব এখন মাত্র একশ গজ। এক তীরন্দাজ ধাবমান ঘোড়ার পিঠ থেকে তীর ছোঁড়ে। তীরটা একটি ঘোড়ার সামনের এক পায়ে গিয়ে বিদ্ধ হয়। ঘোড়াটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আরো কিছু দৌড়-ঝাপের পর পলায়নপর লোক দুজন আলীর বাহিনীর বেষ্টনীতে চলে আসে। তারা অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
আলী বিন সুফিয়ান তাদের পরিচয় জানতে চান। তারা মিথ্যা বলে। নিজেদের ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু তল্লাশি নেয়ার পর সেই বার্তাটি পাওয়া গেলো, যেটি নাজি তাদের দিয়ে প্রেরণ করেছিলো। উভয়কে হেফাজতে নিয়ে নেয়া হলো। ঘোড়াগুলোকে বিশ্রামের জন্য সময় দেয়া হলো। অভিযান সফল করে আলী বিন সুফিয়ান ফেরত রওনা হন।
অস্থিরচিত্তে অপেক্ষা করছেন সুলতান আইউবী। দিন কেটে গেছে। রাতটাও অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাতে সুলতান আইউবী ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাঁর চোখ লেগে গেছে। অপেক্ষায় অপেক্ষায় কতোক্ষণ বসে থাকা যায়।
রাতের শেষ প্রহরে আইউবীর কক্ষের দরজায় আলতো করাঘাত পড়ে। তার চোখ খুলে যায়। ধড়মড় করে উঠে দরজা খোলেন। আলী বিন সুফিয়ান দাঁড়িয়ে আছেন। পিছনে দণ্ডায়মান তার আট অশ্বারোহী ও দু কয়েদি। সুলতান আইউবী আলী এবং কয়েদী দুজনকে নিজের শয়নকক্ষে ডেকে নিয়ে যান এবং নজির পত্ৰখানা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করেন। প্রথম প্রথম তার চেহারার রং বিবর্ণ হয়ে ওঠলেও পরক্ষণেই মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
নাজির বার্তাটি বেশ দীর্ঘ। সে খৃষ্টানদের জনৈক সম্রাট ফ্রাংককে লিখেছে, অমুক দিন, অমুক সময় ইউনানী, রোমান ও অন্যান্য খৃষ্টানদের সমুদ্র পথে রোম উপসাগরের দিক থেকে সৈন্য অবতরণ করিয়ে আক্রমণ করুন। আপনার আক্রমণের সংবাদ পেলেই পঞ্চাশ হাজার সুদানী সৈন্য আইউবীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসবে। মিসরের নতুন বাহিনী আপনার আক্রমণ ও আমার বিদ্রোহের একসঙ্গে মোকাবেলা করতে পারবে না। বিনিময়ে সমগ্র মিসর কিংবা মিসরের সিংহভাগ অঞ্চলের শাসন আপনাকে দান করা হবে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী বার্তাবাহী লোক দুজনকে কয়েদখানার পাতাল প্রকোষ্ঠে ফেলে রাখেন। তৎক্ষণাৎ নিজের নতুন বাহিনী প্রেরণ করে নাজি ও তার নায়েবদের নিজ গৃহে নজরবন্দি করে ফেলেন। হেরেমের সকল নারীকে মুক্ত করে দেন এবং নাজির যাবতীয় সহায়-সম্পত্তি ক্রোক করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করেন। এ সকল অভিযান গোপন রাখা হয়।
নাজির উদ্ধারকৃত পত্রটিতে আক্রমণের যে তারিখ ছিলো, সুলতান আইউবী সেটি পরিবর্তন করে অন্য তারিখ লিখে দুজন বিচক্ষণ লোককে সম্রাট ফ্রাংকের নিকট প্রেরণ করেন। বলে দেন, তোমরা নিজেদেরকে নাজির লোক বলে পরিচয় দেবে। তাদের রওনা করিয়ে সুলতান সুদানী বাহিনীকে মিসরী বাহিনীতে একীভূত করে ফেলার নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেন।
আটদিন পর দূতরা ফিরে আসে। তারা সম্রাট ফ্রাংককে নাজির পত্র পৌঁছিয়ে উত্তর নিয়ে আসে। ফ্রাংক লিখেছেন, আমার আক্রমণের দুদিন আগে যেনো সুদানীরা বিদ্রোহ করে, যাতে আইউবীর আক্রমণ মোকাবেলা করার হুঁশ-জ্ঞান না থাকে। আলী বিন সুফিয়ান সুলতান আইউবীর অনুমতিক্রমে এই দূত দুজনকে নজরবন্দি করে রাখেন, যাতে তথ্য ফাঁস হওয়ার কোন সম্ভাবনা না থাকে।
যেসব স্থানে খৃষ্টানদের নৌযান এসে ভেড়ার কথা, সুলতান আইউবী সেই স্থানগুলোতে নিজের সৈন্য লুকিয়ে রাখেন।
পত্রে উল্লেখিত তারিখে সম্রাট ফ্রাংক আক্রমণ চালান। নির্দিষ্ট দিনে যথাসময়ে খৃষ্টানদের সম্মিলিত বাহিনী রোম উপসাগরে আত্মপ্রকাশ করে। ঐতিহাসিকদের পরিসংখ্যান মোতাবেক খৃষ্টানদের যুদ্ধ জাহাজের সংখ্যা ছিলো একশত পঁচিশ। তন্মধ্যে বারোটি ছিলো বেশ বড়। সেগুলোতে বোঝাই ছিলো সৈন্য, যারা মিসর আক্রমণ করতে এসেছিলো। এই বাহিনীর কমাণ্ডার ছিলেন এম্লার্ক, যার পালতোলা জাহাজগুলোতে রসদ ছিলো। লাইন ধরে আসছিলো জাহাজগুলো।
প্রতিরক্ষার কমাণ্ড নিজের হাতে রাখেন সুলতান আইউবী। তিনি খৃষ্টানদেরকে সাগরের কূলে ভেড়ার সুযোগ দেন। সর্বাগ্রে বড় জাহাজটি লঙ্গর ফেলে। হঠাৎ তার উপর আগুনের বর্ষণ শুরু হয়ে যায়। এগুলো মিনজানিক দ্বারা নিক্ষিপ্ত আগুন। মুসলমানদের বর্ষিত এই অগ্নিগোলা খৃষ্টানদের জাহাজ কিশতিগুলোর পালে আগুন ধরিয়ে দেয়। কাঠের তৈরি জাহাজগুলোর গায়েও আগুন ধরে যায়। অপর দিক থেকে মুসলমানদের লুকিয়ে থাকা জাহাজ এসে পড়ে। তারাও খৃষ্টানদের জাহাজের উপর আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এখন মনে হচ্ছে, যেনো রোম উপসাগরে অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেছে এবং সাগরটা জ্বলছে। খৃষ্টানদের জাহাজগুলো মোড় ঘুরিয়ে পরস্পর ধাক্কা খেতে ও একটি অপরটিতে আগুন ধরাতে শুরু করে দেয়। নিরুপায় হয়ে জাহাজের খৃষ্টান সেনারা সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের যারা কূলে এসে ভিড়ে, তারা সুলতান আইউবীর তীরন্দাজদের নিশানায় পরিণত হয়।
