আইউবী নাজির অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় কোন মন্তব্য করলেন না। আইউবীকে তোষামোদের ঝরনায় স্নাত করে নাজি যখন বিশিষ্ট মেহমানদের কাছে নিজের বাহাদুরী প্রকাশে ব্যস্ত, এ সুযোগে সালাহুদ্দীন আইউবী আলীকে বললেন—
আমি যা দেখতে চেয়েছিলাম, দেখেছি। সুদানী ফৌজ মদ আর বিশৃংখলায় অভ্যস্ত। তুমি বলেছিলে এদের মধ্যে ইসলামী চেতনা ও দেশপ্রেম নেই। আমি দেখছি এদের সামরিক মোগ্যতাও নেই। এই বাহিনীকে যুদ্ধে পাঠালে যুদ্ধের চেয়ে এরা নিজের জীবন বাঁচানোর ধান্ধায় থাকবে বেশী। গনীমতের সম্পদ লুণ্ঠনের নেশায় থাকবে বিভোর। বিজিত এলাকায় নারীদের বাগে নিয়ে তাদের সাথে পাশবিক আচরণ করবে নিশ্চিত।
এর প্রতিকার হলো, আমাদের নতুন রিক্রুটকৃত মিসরীয় সৈনিকদেরকে এদের সাথে একীভূত করে দেয়া। তাহলে ভালোরা ভ্রষ্টগুলোর নৈতিকতাবোধ উন্নত করতে পারবে। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
সালাহুদ্দীন আইউবী মুচকি হাসলেন। বললেন–আলী! তুমি দেখছি আমার মনের কথাই বলছে! আমিও কিন্তু তা-ই ভাবছিলাম। কিন্তু বিষয়টা আমি এখনই প্রকাশ করতে চাই না। সাবধান! এ পরিকল্পনার কথা যেন কেউ জানতে না পারে।
আলী বিন সুফিয়ানের অসাধারণ মেধা। তিনি চেহারা দেখেই মানুষের মনের লেখা পড়ে ফেলতে পারেন। মানুষ চেনার ব্যাপারে আলী কখনো ভুল করেন না। তিনি আইউবীকে কী যেন বলতে চাচ্ছিলেন। এ সময়ে মঞ্চের সামনে, হঠাৎ করে জ্বলে উঠলো বাহারী ঝাড়বাতি। মঞ্চের সামনে দামী গালিচা বিছানো। বাদক দলের যন্ত্রে বেজে উঠলো মনমাতানো সুর। ব্যাণ্ড দলের সুরের লহরি আর মরুর মৃদু বাতাসে দুলতে শুরু করলো মঞ্চের শামিয়ানা।
মঞ্চের পিছন থেকে বাজনার সুরে সুরে নৃত্যের তালে তালে এগিয়ে এলো একদল তরুণী। সংখ্যায় বিশজন। পরনে নাচের ঝলমলে পোশাক। আধখোলা দেহ। উক্ত কাঁধে ছড়ানো রেশমী চুল।
মরু রাতের মৃদুমন্দ বাতাসে উড়ছে তরুণীদের গায়ের কাপড়। চোখ-মুখ; ঢেকে দিচ্ছে চুল। প্রত্যেকের পোশাকের রঙ ভিন্ন; কিন্তু শরীরে গড়ন এক। সবাই উর্বশী তরুণী। আবক্ষ খোলা বাহু দিগন্তে প্রসারিত। বকের মত ডানা মেলে যেন। এক গুচ্ছ ফুটন্ত গোলাপ উড়ে আসছে। দেখা যাচ্ছে না তাদের পায়ের নড়াচড়া। এগিয়ে আসছে নৃত্যের ছন্দে দুলে দুলে, যেন বাতাসে ভর করে।
মঞ্চের সামনের গালিচায় এসে অর্ধ বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গেলো তারা। আইউবীর দিকে দু হাত প্রসারিত করে একই সাথে মাথা ঝুঁকালো সবাই। ওদের খোলা চুল এলিয়ে পড়লো কাঁধে। যেন কতগুলো তারা খসে পড়ছে আসমান থেকে। মাথার উপর কারুকার্যমণ্ডিত শামিয়ানা। পায়ের নীচের মহামূল্যবান কার্পেট। নর্তকীদের লতানো শরীর আর অপূর্ব সুরের মূর্ঘনায় সৃষ্টি হলো এক স্বপ্নীল নীরবতা।
মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে দৈত্যের মত এক হাবশী ক্ষীপ্রগতিতে এগিয়ে এলো। পরনে চিতা বাঘের চামড়ার মত পোশাক। হাতে বিশাল এক ডালা। ডালায় আধফোঁটা পদ্মের ন্যায় একটি বস্তু।
তরুণীদের অর্ধবৃত্তের সামনে এসে ডালাটা রেখে দ্রুত আড়াল হয়ে গেলো হাবশী।
সঙ্গীত দলের বাজনা তুঙ্গে উঠলো। বেজে উঠলো আরো জোরে। ডালা থেকে ধীরে ধীরে উত্থিত হলো এক কলি। দেখতে দেখতে সব পাপড়ী মেলে ফুটন্ত গোলাপের মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো এক অপ্সরী।
মনে হচ্ছিলো লাল মেঘের আবরণ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে দ্বাদশীর চাঁদ। এক অনিন্দ্য সুন্দরী তরুণী। ঠোঁটে মুক্তা ঝরানো হাসির ঝিলিক। এ যেন মাটির মানুষ নয়, এক হিরে-পান্নার তৈরী ভিন গ্রহের মায়াবিনী।
দু হাত প্রসারিত করে নৃত্যের তালে এক পাক ঘুরে অভিবাদন জানালো তরুণী। আইউবীর দিকে চোখের পটলচেরা কটাক্ষ হেনে পলক নেড়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। অভ্যাগত দর্শকরা নৃত্য সঙ্গীতের বাজনা আর তরুণীদের আখি মুদিরায় তন্ময়। নিঃশ্বাসটি বেরুচ্ছে না কারো।
আইউবীর দিকে তাকালেন আলী বিন সুফিয়ান। ঠোঁটে রহস্যপূর্ণ হাসি। বললেনল মেয়েটি এতটা সুশ্রী হবে ধারণা করিনি।
আমীরে মেসেরের জয় হোক বলতে বলতে এগিয়ে এলেন নাজি। আইউবীর সামনে এসে গদগদ চিত্তে বললেন–এর নাম জোকি। আপনার খেদমতের জন্যে একে আমি আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আনিয়েছি। এ তরুণী পেশাদার নর্তকী বা বারবণিতা নয়। মেয়েটি ভালো নাচতে ও গাইতে জানে। এটা এর শখ। কখনো কোন অনুষ্ঠানে নাচে না।
মেয়েটির পিতা আমার পরিচিত। মাছ ব্যবসায়ী। বাপ-বেটি দুজনই আপনার খুব ভক্ত। এই মেয়েটি আপনাকে পয়গম্বরের মতো শ্রদ্ধা করে। এক কাজে আমি এর বাবার সাথে সাক্ষাত করতে এদের বাড়ী গেলে মেয়েটি আমাকে বললো–শুনেছি, সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরের আমীর হয়ে এসেছেন। মেহেরবানী করে আপনি তাঁর সাথে আমার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিন। তাঁর পায়ে উৎসর্গ করার মতো আমার জীবন আর নাচ ছাড়া কিছুই তো নেই। আল্লাহর কসম! আমি তার খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করে ধন্য হতে চাই।
মহামান্য আমীর! আপনার কাছে নাচ-গানের অনুমতি চেয়েছিলাম শুধু এ মেয়েটিকে আপনার খেদমতে পেশ করার জন্যে।
আমি নগ্ন নারী আর নাচ-গান পছন্দ করি না, একথা কি আপনি ওকে বলেছিলেন? আর যে মেয়েদের আপনি পোশাক-পরিহিতা বলছেন, ওরা তো উলঙ্গ। বললেন আইউবী।
মাননীয় আমীর! আমি ওকে বলেছিলাম, মিসরের আমীর নাচ-গান পছন্দ করেন না। ও বললো, মাননীয় আমীর আমার নাচে অসন্তুষ্ট হবেন না। আমার নাচে কোন নোংরামী থাকবে না, থাকবে শৈল্পিক উপস্থাপনা। মাননীয় আমীরের সামনে আমি নৃত্যের শিল্প সুষমাই উপস্থাপন করবো। মেয়েটি আরো বললো, হায়! আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে মহামান্য আমীরের দেহরক্ষী বাহিনীতে যোগ দিয়ে নিজের জান তার জন্যে কুরবান করে দিতাম। স্বলাজ কম্পিত কণ্ঠে বললেন নাজি।
