কর্ডোভা থেকে সেনা সাহায্য আসার অপেক্ষা না করে আমরা কেন খ্রিষ্টান নেতাদেরকে ডেকে ওদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করছি না? এক কমান্ডার বললো, ওদেরকে জিজ্ঞেস করুন, ওরা কী চায়?
ওরা যদি দাবী করে, টলয়টার পুরো প্রদেশ আমাদের হাতে তুলে দাও তাহলে এই দাবী কি আমরা মেনে নেবো? ইবনে ওসীম উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, তোমরা কি এটা বলতে চাচ্ছে যে, আমরা পরাজয় স্বীকার করার পর আমাদের দুশমনের সাথে সন্ধির জন্য ভিক্ষা চাইবো? পবিত্র কুরআনের নির্দেশের বিরুদ্ধে চলবো?…..
পবিত্র কুরআন কী বলেছে জানো? যে পর্যন্ত কাফেরদের ফেতনা ফাসাদ চলতে থাকবে সে পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাও। ঐ কাফের সন্ত্রাসীদেরকে আমি অনুমতি দিতে পারি না যে, কাফের সন্ত্রাসীরা তাদের সন্ত্রাস আমার ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত বিস্তার করুক।
আমার উদ্দেশ্য এটা নয়, কামন্ডার বললো, বিদ্রোহীদের সঙ্গে আমি কোন সন্ধি–সমঝোতা করতে বলছি না। আমরা কিছু সময় কালক্ষেপণ করতে চাচ্ছি। সেনা সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত এমন কোন চাল চালতে হবে যাতে বিদ্রোহীদের তৎপরতা কিছুটা বন্ধ রাখা যায়।
আমরা যদি সন্ধি-সমঝোতা এবং চুক্তি করার ব্যাপারে এক পা আগে বাড়াই, সেটা আমরা একটা চাল বা কৌশল হিসাবে করলেও আমাদের আমীর একেই নিজের রীতি বানিয়ে নেবে। মুহাম্মাদ ইবনে ওসীম বললেন,
ভোগ বিলাস করে বাদশাহী করার উত্তম পদ্ধতি হলো, বন্ধুকে শত্রু এবং শত্রুকে বন্ধ বলো এবং দেশবাসীকে থোকার মধ্যে রাখো। আর নিজেকে এমন প্রতারণায় ডুবিয়ে রাখো যে, আমরা আল্লাহর সিপাহী এবং ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ।
এমন এক সময় আসবে যখন আমাদের মুসলমান জাতি দুশমনের সামান্য হুমকিতেই ভয়ে কুকড়ে যাবে। এ নিয়ে বেঁচে থাকতে আপ্রাণচেষ্টা করবে। আর জাতির শাসকরা ইসলামের বীরত্বগাথা ইতিহাস নিয়ে মিথা গর্বে বুকে ফোলাবে।
এ সময় দারোয়ান এসে জানালো, এক কমান্ডার সাক্ষাৎ করতে এসেছে।
এতে অনুমতির কী প্রয়োজন? ওসীম বললেন, কাউকেও বাঁধা দিয়ো না। যে কেউ আমার সাক্ষাতে আসবে সোজা ভেতরে পাঠিয়ে দেবে। আমি বাদশাহও নই। উন্দলুসের আমীরও নই।
কমান্ডার ভেতরে এলো। তার কাপড় রক্তে লাল।
তুমি কি যখমী?
আমি আমার যখম দেখাতে আসিনি। কমান্ডার বললো, আমি এক শত সিপাহীর একটি দল নিয়ে এক চৌকির সাহায্যে যাচ্ছিলাম। পথে বিদ্রোহীরা আমাদেরকে ঘিরে ফেলে। ওদের সংখ্যা এর চেয়ে কিছুটা বেশি ছিলো। আমার সিপাহীরা যে বীরদর্পে লড়ে যায় তা স্বচক্ষ্যে না দেখলে শুধু বলে বোঝানো যাবে না। তবে আমি আমার সিপাহীদের বীরত্বগাঁথা শোনাতে আসিনি।….
এটা শোনাতে এসেছি যে, আমার এক শ থেকে প্রায় এক ষট্টিজন সিপাহী শহীদ হয়ে গিয়েছে। তবে ওরা প্রায় একশত জন দুশমনকে শেষ করে দিয়ে ওদের ঘেরাও ভেঙ্গে গেছে। আর বাকিরা তাদের সঙ্গীদের লাশ ফেলে রেখে, যখমীদেরকে উদ্ধার না করে নিকটস্থ চৌকিতে গিয়ে পৌঁছে।
সে চৌকিকে কি বাঁচানো গিয়েছে?
না, কমান্ডার বললো, সে চৌকিতে অল্পসংখ্যক জোয়ান ছিলো। এর বিপরীতে বিদ্রোহীদের বিশাল একদল চৌকিকে অবরোধ করে। আমরা গিয়ে দেখি সে চৌকি ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আমার যেটা বলা উদ্দেশ্য সেটা হলো, বিদ্রোহীরা সংখ্যায় অনেক অনেক বেশি। সে তুলনায় আমাদের সৈন্য সংখ্যা নেহাতই কম।
আরেকটা খবর হলে, টলয়টা থেকে কিছু দূরের পাহাড়ি এলাকায় কিছু একটা রয়েছে। বিদ্রোহীদের সাহায্য সহযোগিতা ও দিক-নির্দেশনা ওখান থেকেই আসছে। হাশিম কামার ও রূপসী মেয়ে ফ্লোরা খ্রিষ্টানদের পবিত্র ব্যক্তিত্ব হিসাবে আভির্ভূত হয়েছে। এরা দুজন সম্ভবত: ওই পাহাড়ি অঞ্চলের কোথাও গোপন আস্তানা গেড়েছ। তাই এক জানাবায বাহিনী তৈরি করে খ্রিষ্টান সন্ত্রাসীদের ঐ মহা সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদেরকে ধরতে হবে এবং খতম করে দিতে হবে। এটা আমার শেষ আকুতি।
ঐ পাহাড়ি এলাকা সম্পর্কে আমার জানা আছে। মুহাম্মাদ ইবনে ওসীম বললেন, ওখানে কাউকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। প্রথমে দুজন গুপ্তচর পাঠিয়ে ওদের আস্তানাটা চিহ্নিত করতে হবে। তারপর জানবায বাহিনী পাঠাতে হবে।
আমি গোস্তাখী মাফ চাচ্ছি। কমান্ডার এবার ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে কাঁপা কণ্ঠে বললো, আপনি এখনো সম্ভব অসম্ভবের ভাষায় কথা বলছেন। আমাদেরকে তো অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখাতে হবে। কর্ডোভার প্রতীক্ষায় আর থাকা যাবে না। নিজেদের জযবার ওপর ভরসা রাখতে হবে। যে পর্যন্ত বিদ্রোহী দলের মূল হোতাদেরকে খতম করা না হবে সে পর্যন্ত বিদোহীদের দুর্বল করা যাবে না। আমাদেরকে জান কুরবান করতে হবে… আপনি অধিক প্রতীক্ষায় থাকলে…
কমান্ডার আর কিছু বলতে পারলো না। তার শরীর থর থর কেঁপে উঠলো এবং সে পড়ে গেলো। মুহাম্মাদ ইবনে ওসীমসহ সবাই ছুটে গেলো তার দিকে।
দেখা গেলো তার পেট একাধিক কাপড়ে ভাজ করা অবস্থায় ফুলে ফেঁপে আছে। পুরোটায় রক্তে চপচপে। কাপড় সরানো হলো। দেখা গেলো, পুরো পেটের মাঝখানে গর্ত করা। কাপড়ের ভাজ দিয়ে নাড়ি-ভুড়ি এতক্ষণে আটকে রেখে ছিলো আল্লাহর এই মহা সৈনিক।
এই জানবায এখানে যখন আসে তখনও জীবিত ছিলো না। ওসীম বললেন, ওর রূহ ওকে এখানে নিয়ে এসেছে। অনেক আগেই শহীদ হয়ে গেছে। আমাদেরকে মূল্যবান তথ্য দেয়ার জন্য ওর রূহ এতক্ষণ দুনিয়ার জগতে ছিলো। কিন্তু ইবনে ওসীম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
