একদিকে রডারিক জাদু-মন্ত্রের সাহায্য নিচ্ছিল যেন একলাখ ফৌজের ওপর তার কোন ভরসা নাই। অপর দিকে মুসলমানদের ক্যাম্পে কেবল মাত্র আল্লাহ্ আল্লাহ্ রব ছিল। তারেক ইবনে যিয়াদ তার সালারদেরকে বলেছিলেন তাদের মুকাবালায় তাদের চেয়ে আটগুণ বেশী ফৌজ আসছে। একজন মুজাহিদকে আটজনের সাথে মুকাবালা করতে হবে। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এবং জুময়ার খুৎবাতে যেমনি তার সে স্বপ্ন শুনাতেন যাতে রাসূল (স) বিজয়ের বাশারত দিয়েছিলেন তেমনি কুরআনের ঐ সকল আয়াত পাঠ করে শ্রবণ করাতেন যার মাঝে আল্লাহ্ তায়ালা মুমিনদেরকে বিজয় ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
“বহুবার ছোটদল বড় দলের ওপর বিজয় অর্জন করেছে।” এ আয়াত পাঠ করে তারেক ইবনে যিয়াদ তার ফৌজদেরকে বুঝাতেন, ছোট দলে ফৌজ সদস্যও তার আমীরের মাঝে কিরূপ গুণাবলী ও কি পরিমাণ ঈমানী শক্তি পয়দা করলে আল্লাহ তায়ালা বড় দলের ওপর বিজয় দান করেন।
“স্মরণ কর! সে সময়ের কথা যখন তোমাদের জন্যে করলাম সাগরকে দ্বিধা বিভক্ত ও তোমাদেরকে দিলাম পরিত্রাণ আর ফেরাউন সম্প্রদায়কে করলাম নিমজ্জিত।”,
তারেক ইবনে যিয়াদ এ আয়াত বারংবার পাঠ করে তার ফৌজী বাহিনীকে শ্রবণ করাতেন। তিনি তার ফৌজদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন, এ আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা সম্বোধন করেছেন বনী ইসরাঈলদেরকে। ফেরআউনের জাদুর চ্যালেঞ্জে মুসা (আ.) এমন মুজেজা দেখিয়ে ছিলেন যার ফলে ছামেরীর ভেলকীবাজী হয়েছিল খতম আর ফেরআউন হয়েছিল হতভম্ব। যখন বনী ইসরাঈল মিশর হতে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের সম্মুখে নিল নদ বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সামনে বিশাল নদী পশ্চাদে ফেরআউন ও তার ফৌজ। এহেন পরিস্থিতে মুসা (আ) তাঁর লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত হানলে তা দ্বিভক্ত হয়ে রাস্তায় পরিণত হয়। সে রাস্তা দিয়ে মুসা তার বাহিনী নিয়ে সুন্দরভাবে নদী অতিক্রম করে চলে যান কিন্তু সে রাস্তায় ফেরআউন তার বাহিনী নিয়ে অবতরণ করার সাথে সাথে উভয় দিকের পানি একত্রিত হয়ে ফেরআউনও তার গোটা ফৌজ বাহিনী নিমজ্জিত হয়ে চিরতরে খতম হয়ে যায়।
তারেক ইবনে যিয়াদ মুজাহিদদেরকে লক্ষ্য করে ভাষণ দিয়ে বললেন, “কিন্তু মুহাজিদ ভাইরা! আল্লাহ্ তায়ালা হযরত মুসা (আ)-কে চল্লিশ দিনের জন্যে আহ্বান করেছিলেন। সে আহ্বানে তিনি সাড়া দিলে তার অবর্তমানে ইসরাঈলরা গো বৎসের পূজা শুরু করেছিল যার পরিণাম তাদের বিপর্যয় ডেকেআনে। মুজাহিদ ভাইরা আমার! পরিবেশ-পরিস্থিতি যতই তোমাদের প্রতিকুল হোকনা কেন সর্বাবস্থায় আল্লাহর ইবতে রত থাকবে। এ ধরনের বিভিন্ন আয়াত পাঠ করে তিনি মুজাহিদদেরকে ঈমানী বলে বলিয়ান করে তাদের মাঝে জিহাদের স্পৃহা উদ্দীপনা বৃদ্ধি করছিলেন। তিনি যুদ্ধের জন্যে যে জায়গা নির্ধারণ করেছিলেন, দিনের বেলা মুজাহিদ বাহিনীকে সেখানে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং দিতেন।
এদিকে রডারিকের বিশাল ফৌজী বাহিনী বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার ন্যায় প্রবল বেগে ধেয়ে আসছিল, তার গতিরোধ করার ক্ষমতা কারো ছিল না।
***
মেরীনা যে প্রাসাদে গিয়ে উঠেছিল ইতিপূর্বে কয়েক বার সে সেখানে গিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক বার তার বেশ-ভূশা পরিবর্তন করে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। টলেডোতে এ ধরনের আরো কিছু প্রাসাদ ছিল, যা দেখে লোকেরা বলতএখানে। সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকরা বাস করে। এসব প্রাসাদে এমনকার্যক্রম শুরু হয়েছিল যা পরবর্তীতে ইউরোপের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছে। আওপাস যেদিন ঝিল পাড়ে মেরীনার সাথে মিলিত হয়েছিল সেদিন থেকে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। আওপাস সেদিন মেরীনাকে বলেছিল, এখন সময় এসেছে যদ্বারা গোথা ও ইহুদীরা ফায়দা হাসিল করে রডারিককে সিংহাসন থেকে উৎখাত করতে পারে। আর তার একমাত্র উপায় হলো গোথা ও ইহুদী যেসব ফৌজ রয়েছে চূড়ান্ত লড়াই এর সময় তারা মুসলমানদের সাথে মিলে রডারিকের বিরুদ্ধাচরণ করবে।
মেরীনা ইহুদী ছিল একারণে তার মাথাতে জন্মগতভাবে ষড়যন্ত্রের বীজ ছিল। অধিকন্তু তার অন্তরে রডারিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের আগুন দাউ দাউ করে জুলছিল। পূর্বেই বলা হয়েছে রডারিক তার প্রেমের ছন্দময় জীবন নস্যাৎ করে ছিল। সে আওপাসের প্রেমে ছিল বিভোর। বিশ বছর পর যখন আওপাসের সাথে মিলন ঘটল তখন তার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের জ্বালা শতগুণে বেড়ে গেল। আওপাসের কথা শুনে সে বলেছিল রডারিকের বুকে খঞ্জর বিদ্ধ করে চিরতরে খতম করবে।
মেরীনা রডারিক থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের পরিকল্পনা শুরু করল। তার কাছে এক অত্যন্ত সুন্দরী লাড়কী ছিল। বাদশাহর খাছ মহলে ছিল তার যাতায়াত। মহলে দু’চার জন ইহুদী ও গোথা কওমের লোক বেশ উপরস্থ পদে সমাসীন ছিল। পূর্বেই বলা হয়েছে স্পেনে সবচেয়ে মাজলুম ছিল ইহুদী সম্প্রদায়। তাদের অধিকাংশ ছিল গরীব। মেরীনা যে প্রাসাদে গিয়েছিল সেখানে অধিকাংশ লোকছিল গোথা কওমের অধিকন্তু তারা ছিল ডেজার অত্যন্ত ভক্ত। তাদের মাঝে এক ব্যক্তির নাম ছিল জেওয়াজ। সে ছিল ডেজার বাল্য বন্ধু। মেরীনা তার সাথে সাক্ষাৎ করে আওপাসের মুলাকাতের কথাও সে যে আলোচনা করেছে তা বিস্তারিত বলল। জেওয়াজ কোন প্রকার চিন্তা-ফিকির ছাড়াই মেরীনার প্রস্তাব মেনে নিল। সে মেরীনাকে তার বাবা ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে আওপাস মেরীনাকে যা বলেছে তার বিবরণ দিল।
