যে স্বর্ণমুদ্রা ও রূপ সৌন্দর্যের জৌলুসে মুগ্ধ হয়ে কাসেম জামিলাকে নিয়ে কাফেলা ত্যাগ করে পালিয়ে এলো, সেই রূপ আর টাকার আকর্ষণ কাসেমের কাছে ফিকে হয়ে গেছে। কাসেম অনুভব করছে, তারও শরীরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। তবুও মুখে কৃত্রিম শুষ্ক হাসির রেশ টেনে জামিলাকে এক হাতে জড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। কাসেম অনুভব করল, জামিলার শরীরের স্পর্শে আর আগের মত পুলক নেই। জামিলা নিষ্প্রাণ দেহের মতো। জামিলা কাসেমের আহ্বাদে শরীরটা এলিয়ে দিল কাসেমের গায়ে। জামিলার গণ্ডদেশে কাসেম ঠোঁট স্পর্শ করল, তার ঘর্মাক্ত শরীরের সবটা ভার কাসেমের উপর ছেড়ে দিল। এলো চুল কাসেমের গলায় জড়িয়ে গেল। জামিলা তার ঘাড়, গলা কাসেমের গলায় হেলিয়ে দু’হাতে উল্টোভাবে ওর গলা জড়িয়ে ধরল। কিন্তু ঘর্মাক্ত জামিলার শরীরটা কাসেমের কাছে দুর্গন্ধময় আবর্জনার মতো মনে হলো। আর জামিলার হেলিয়ে দেয়া শরীরটা কাসেমের কাছে বিরাট বোঝা অনুভূত হতে থাকল। কিছুক্ষণ পরেই কাসেম জামিলাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে সরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল। প্রচণ্ড খরতাপ ও পাহাড়ের অগ্নি বিচ্ছুরণের কারণে ঘামে উভয়ের কাপড় ভিজে শরীরের সাথে লেপটে গেছে।
কাসেমের শরীর অবশ হয়ে আসছিল। দীর্ঘ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক হিসেবে কষ্টকর অশ্বারোহণ তার পক্ষে এতোটা অসহনীয় ছিল না কিন্তু এই পলায়নে জিহাদের ময়দানের যে আত্মশক্তি থাকে তা নেই। যে জামিলা ছিল তার পালানোর প্রেরণা সেই জামিলার প্রতি ভালবাসার পরিবর্তে বিতৃষ্ণার উদ্রেক হলো। নিজের প্রতিও ঘৃণা জন্মাল।
কাসেম অনুভব করল, এ ঘোড়াটিরও দম ফুরিয়ে আসছে। জিহ্বা বের করে দিয়েছে ঘোড়া। ঘন ঘন সশব্দে শ্বাস নিচ্ছে, দৌড়ের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। বারবার হোঁচট খাচ্ছে। যে দুটি ঘোড়া নিয়ে কাসেম পালিয়ে এসেছে, এগুলো সেনাবাহিনীর ঘোড়া নয়। সেনাবাহিনীর ঘোড়া দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিতে এবং পানাহার না করেও অবিরাম পাহাড় পর্বত অতিক্রমে অভ্যস্ত থাকে। এগুলো ভাড়াটে ঘোড়া। যেগুলো সাধারণত বেসামরিক লোকেরা এখানে ওখানে যাওয়ার জন্যে ভাড়ায় নিয়ে থাকে। ইমরানের কথা মতো জগমোহন এগুলোকে পাশের গ্রাম থেকে ক’জন মেহমান আনা-নেয়ার কথা বলে ভাড়া করেছিল। এগুলো দুর্গম দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণে অভ্যস্ত নয়। তাই অবিরাম দানাপানি ও বিশ্রাম ছাড়া পাহাড়ী এলাকায় দৌড়ে চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল ঘোড়া।
ইমরানের পাকড়াও থেকে বাঁচার জন্য কাসেম আরো দুর্গম পথে পা বাড়াল। তালাশ করতে লাগল পাহাড়ের কোন গিরিপথ। তখন সূর্য মাথার উপরে। পাহাড়ের পাথরগুলো যেন খড়তাপে জ্বলছে। প্রচণ্ড তাপ বিকিরণ করছে পাহাড়। ঘোড়া এতোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, পাহাড়ের উঁচু নীচু বেয়ে আর এক কদম চলতে পারছে না। অগত্যা কাসেম ঘোড়া থেকে নামল। জামিলাকেও পাঁজাকোলা করে ঘোড়া থেকে নীচে নামাল। উভয়ে হাঁটতে থাকল হাত ধরাধরি করে। একটু হেঁটেই জামিলা ইশারা ইঙ্গিতে ঠোঁটে আঙ্গুল ধরে বুঝাল, পিপাসায় তার বুক শুকিয়ে যাচ্ছে, তার পক্ষে আর এক কদম হাঁটা সম্ভব নয়। কাষ্ঠ হাসি হেসে কাসেম জামিলাকে উৎসাহ দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার নিজেরও যে কষ্টে বুক শুকিয়ে আসছে। শরীরটা নিজের কাছেই ভারী মনে হচ্ছে কাসেমের । ঘোড়াটা আর এগুতে পারছে না। পা হেঁচড়ে চলছে। পাহাড়ের ঢালে একটু ছায়া পড়েছে। সেখানটায় বসে পড়ল কাসেম। জামিলা কাসেমের শরীরের উপর ধপাস করে পড়ে যাওয়ার মতো করে বসে পড়লো। স্বর্ণ মুদ্রার থলেটি জামিলা এভাবে ছুঁড়ে ফেলে দিল যে, এটি ময়লার থলে মাত্র। ঘোড়াটি হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক ওদিক করছিল।
আবার জামিলা কাসেমকে বোঝাল, পিপাসায় তার ছাতি ফেটে যাচ্ছে। কাসেম তাকে কিছুটা বিতৃষ্ণামাখা ভাব নিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করল, কষ্ট হলেও কিছু করার নেই। এখানে কোথাও পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জামিলা তাকে ইঙ্গিত করল এদিক ওদিক খুঁজে দেখতে। ক্লান্ত অবসন্ন শরীরটা কোন মতে টেনে তুলে কাসেম পানি তালাশে বেরিয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে-হতাশ হয়ে ফিরে আসল এবং জামিলার কাছে এসে অনিমেষ নেত্রে নিষ্পলক করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার অসহায়ত্ব তাকে বুঝাতে চাইল।
কাসেম যতটা ভয় করছিল ইমরানকে, তার চেয়েও বেশি নির্বিকার ছিল ইমরান কাসেম ও জামিলার ব্যাপারে। ওদের পিছু ধাওয়া করার বিন্দুমাত্র আগ্রহও ইমরানের ছিল না। কাসেম ও জামিলা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ইমরানের মাথা থেকে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল তারা।
ইমরান ও নিজাম আব্দুল জব্বার ওঝফে জগমোহন ও রাজিয়ায় রূপান্তরিত ঋষিকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছিল। রোদের তাপ বেড়ে যাওয়ায় তারা একটি ছায়াপড়া ঢালে এসে থামল। সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা সেই ছায়ায় বিশ্রাম করল।
বেলা ডুবে গেল। ইমরান সাথীদের নিয়ে শুকনো খাবার খেয়ে সংগৃহীত পানি থেকে সবাইকে অল্প অল্প করে পান করতে বলল। যাতে বাকী পথ অতিক্রম করতে কোন অসুবিধার মুখোমুখি না হতে হয়। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে মৃদু মন্দ বাতাসে পাহাড়ের পাথর কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে এল। ইমরান সাথীদের নিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করল।
