“ওরা বেশিদূর যেতে পারেনি।” ইমরানের উদ্দেশে বলল নিজাম। “চলোলা এদেরকে আমরা পাকড়াও করব এবং নিজ হাতে এদের কতল করব।”
না, এর দরকার নেই। যে মেয়েটিকে কাসেম নিয়ে গেছে প্রকৃতপক্ষে ও আমাদের কেউ নয়। সোনা-দানা ও টাকা-পয়সা যা নিয়েছে এগুলোও গজনী সালতানাতের সম্পদ নয়। এদেরকে পাকড়াও করা আমাদের দায়িত্বও নয়। বরং এদের পেছনে দৌড়ানো আমাদের কর্তব্য পরিপন্থী…। নিজাম ভাই! আমি তোমাদেরকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিলাম এই জন্য যে, হতে পারত রাজা তোমাদের দুজনকে কজা করার জন্য সুন্দরী কোন ললনা লাগিয়ে দিত। নারী ও টাকা এমনি ভয়ঙ্কর জিনিস, পাথরের মতো কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও মোমের মত জ্বালিয়ে গলিয়ে দিতে পারে। এমনটা হলে তোমরা ভুলে যেতে তোমাদের দায়িত্ব, তোমাদের জাতিত্ব, ধর্ম, নীতি, আদর্শ। ভোগ-ঐশ্বর্যের কাছে জলাঞ্জলী দিতে ঈমান, আমল। হিন্দু রাজার ক্রীড়নক হয়ে গজনী সালতানাতের জন্য মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে তোমরা।
ধীরে ধীরে ঘোড়ার আওয়াজ ইথারে মিলিয়ে গেল। “আমার ঘুম চলে গেছে, চল আমরা অগ্রসর হতে থাকি।” বলল নিজাম।
একটি ঘোড়ার উপর ঋষিকে এবং অন্য গোড়ার উপর জগমোহনকে সওয়ার করে ইমরান ও নিজাম দু’জনে ঘোড়ার লাগাম টেনে হেঁটে চলল। সিদ্ধান্ত নিল, তারা পর্যায়ক্রমে সওয়ার হবে।
“ও হয়তো জামিলাকে জোর করে নিয়ে গেছে।” বলল ঋষি।
“না, জামিলাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার দরকার হয়নি। বরঞ্চ বলতে পার, জামিলাই কাসেমকে নিয়ে গেছে। যাই হোক, আপদ চলে গিয়ে ভাল হয়েছে।”
রাত পোহাল। পূর্বাকাশে উঁকি দিল লাল টকটকে সূর্য। ইত্যবসরে জামিলা ও কাসেম অনেক পথ অতিক্রম করেছে। ওরা মরণপণ ঘোড়া ছুটিয়েছে। কাসেম গজনীর সৈন্যদের নির্মিত রাস্তা ধরে এগুচ্ছিল। যে রাস্তা গজনী বাহিনী তৈরি করেছিল ভারত আক্রমণের উদ্দেশে। কাসেম যখন জয়পাল বাহিনীর কাছে গ্রেপ্তার হয়েছিল, এ পথ দিয়েই জয়পালের সৈনিকেরা তাদের নিয়ে গিয়েছিল । এই একটাই ছিল মাত্র রাস্তা। যা থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল না। বেলা বেড়ে উঠার সাথে সাথে কাসেম অনুভব করল, “আমি অধী, আমি পলাতক, ফেরারী। আমার পেছনে ধাওয়া করছে ইমরান ও নিজাম।” ধরা পড়ার আশঙ্কা ও অপরাধের তাড়না কাসেমকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। সে অভিজ্ঞ সৈনিক ও দীর্ঘ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। যে কোন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি সহ্য করা তার পক্ষে মোটেও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু অপরাধবোধ কাসেমের সহন শক্তিকে ভেঙ্গে খান খান করে দিল। সে অনুভবই করল না যে, ঘোড়াগুলো এক নাগাড়ে দীর্ঘ সময় দৌড়াতে পারবে না। তার সফর ছিল দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে। বারবার বাক নিচ্ছিল পথ। কখনও চড়তে হতে পাহাড়ের উপরে, কখনও নামতে হতো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে। বারবার হোঁচট খেতে হতে পাথরের সাথে। বহু চড়াই উৎড়াই অতিক্রম করে চলতে হচ্ছিল তাকে।
বিরামহীন পথ চলায় ক্লান্ত হয়ে পড়ল ঘোড়া। যে ঘোড়াটায় কাসেম ও জামিলা উভয়ে আরোহণ করেছিল সেটি ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল। হাঁ করে নিঃশ্বাস ছাড়ছিল। হঠাৎ পাথরে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঘোড়া। জামিলা ও কাসেম দুজন দুদিকে ছিটকে পড়লো। পেছনের ঘোড়াটি তাল সামলাতে না। পেরে কাসেমের গায়ে এসে আছড়ে পড়ল। ঘটনার আকস্মিকতায় চিৎকার দিয়ে উঠল জামিলা। কিন্তু কাসেমের অবস্থা শোচনীয়। কোন মতে নিজেকে টেনে তুলে জামিলার দিকে অগ্রসর হলো এবং জামিলাকে টেনে বসাল কাসেম। সওয়ার ঘোড়াটি কয়েকবার পা ঝাঁপটা দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। অপর ঘোড়াটির উপর কোন সওয়ারী না থাকায় সেটি অত দুর্বল ছিল না। কাসেম, বলখী সেই ঘোড়াটির লাগাম হাতে নিয়ে এদিক ওদিক দেখল, কোথাও ঘাস আছে কি-না। না, যে পর্যন্ত দৃষ্টি যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আর এ পাহাড়ি এলাকাটি এমন যে শুধুই পাথর। সামান্য দূর্বা ঘাসও কোথাও নেই। পানির তো প্রশ্নই ওঠে না। তখনো ধরা পরার আশঙ্কা কাসেমকে তাড়া করছে। সে মূল রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ভিতরের দিকে চলে গেল। জামিলাকে বগলদাবা করে কোনমতে নিয়ে বসাল একটা পাথরের উপর। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল উভয়ে।
খুব বেশি সময় বিশ্রাম করতে পারেনি কাসেম। অপরাধ তাকে তাড়া করে নিয়ে চলল সামনের দিকে। জামিলাকে নিয়ে আবার সওয়ার হলো ঘোড়ায় । টাকার থলেটা জামিলা আঁকড়ে থাকল। এক হাতে জামিলা আর অন্য হাতে । ঘোড়ার লাগাম টেনে খুব জোরে তাড়া করল কাসেম।
ইমরান ও নিজাম তাড়া করতে পারে এ আশংকায় কাসেম দীর্ঘ শ্রান্তির পরও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেনি। ধরা পড়ার ভয়ে সে মূল পথ ছেড়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দুর্গম এলাকা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য আবার ঘোড়া দৌড়াতে শুরু করল। জামিলা অশ্বারোহণে অভ্যস্ত নয়। এ ধরনের দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতাও তার নেই। জামিলা ইঙ্গিতে কাসেমকে বোঝাল, ক্লান্তিকর বিরামহীন ভ্রমণে তার পশ্চাদদেশ ফুলে গেছে, উরুসন্ধি ছিলে গেছে। সারা শরীর ব্যথায় বিষ হয়ে গেছে। পেট ধরে ইঙ্গিত করল, তার পক্ষে আর এক মুহূর্ত ঘোড়ায় বসে থাকা সম্ভব নয়।
