নাহিদাও প্রশিক্ষিত কমান্ডোদের সাথে সমানতালে অশ্ব হকিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি অভিজ্ঞ কমান্ডোদের মোটেও অনুভব করতে দেননি, তিনি নিতান্তই একজন অবলা নারী। তিনি কমান্ডোদের মতোই সমানতালে এই দুঃসাহসী অভিযানে নারীত্বের সকল দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে অশ্ব ছোটালেন। এই অভিযানে তিনিও কমান্ডোদেরই একজন সঙ্গী।
* * *
ইত্যবসরে সুলতান মাহমূদ সৈন্য ঘাটতি অনেকাংশেই দূর করে ফেলেছিলেন। কয়েক মাস যাবত মসজিদের ইমাম সাহেবদের মাধ্যমে জুমআর দিনে ঘোষণা করা হচ্ছিলো, রাষ্ট্রের প্রয়োজন ও দীনের সার্থে সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবকের তীব্র প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
ইমামদের এই ঘোষণার ফলে হাজার হাজার তরুণ যুবক স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়। স্বেচ্ছাসেবকরা প্রত্যেকেই নিজের ব্যবহার্য ঘোড়া কিংবা উট সাথে নিয়ে এসেছিল। যারা সশরীরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদান করতে পারেনি, তারা তাদের উট কিংবা ঘোড়া সেনাবাহিনীর প্রয়োজন মিটানোর জন্য দিয়ে দিয়েছিল।
প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সুলতান মাহমূদ যখন খাওয়ারিজমের বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দিলেন, তখন তার সেনাসদস্যের সংখ্যা অশ্বারোহী ও পদাতিক মিলিয়ে এক লাখের উপরে এবং প্রশিক্ষিত জঙ্গী হাতির সংখ্যা পাঁচশতেরও বেশী।
সুলতান তার সৈন্যদের বলখ পর্যন্ত নিয়ে থামতে বললেন। বলখে পৌঁছার পর তার সামনে ছিলো বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকাব্যাপী মরুময় অঞ্চল। মরুময় বিজন এলাকার যাত্রাপথের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য সুলতান পূর্ব থেকেই বিজন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত তুরমুজ নামক স্থানে নদীর তীরে বিশ হাজার বড় নৌকা তৈরী করিয়ে রেখেছিলেন। অকসাস নামক এই নদীর প্রবাহ ছিলো খাওয়ারিজমের দিকে।
সুলতানের গোটা বাহিনী তাদের হাতি, ঘোড়া, উট, সৈন্য তথা আসবাবপত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জামসহ বিশ হাজার জাহাজবাহী নৌকায় বোঝাই করা হলো।
নদীর ভাটির প্রবাহের সাথে বিশাল এই নৌকা বহর এগিয়ে চলল। এই নদীর ইতিহাসে এটিই ছিল কোন রাজশক্তির সবচেয়ে বড় সেনাভিযান ও নৌমহড়া।
সুলতানের এই নৌবহর হাজারাশীপ উপকূল অতিক্রম করে খাওয়ারিজমের রাজধানী জুরজানিয়ার অদূরে গিয়ে যাত্রাবিরতি করলো। সৈন্যরা নৌবহর থেকে নেমে ডাঙায় শিবির স্থাপন করলো।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, দখলদার আলাফতোগীনের কাছে সুলতান মাহমূদের বিশাল নৌবহর ও সেনাসমাবেশের খবর গেলো। তখন অনাক্রমণ চুক্তি করার জন্য একজন দূতকে দিয়ে সুলতান মাহমূদের কাছে পয়গাম পাঠালো।
কিন্তু ক্ষুব্ধ সুলতান আলাফতোগীনের সন্ধিপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। সেই সাথে তিনি এমন কিছু কঠিন শর্তের উল্লেখ করে সন্ধিপ্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন, যার ফলে আলাফতোগীন ঘাবড়ে গেলো। অগত্যায় মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য আলাফতোগীন গোটা খাওয়ারিজমের সৈন্যদের এক জায়গায় জড়ো করে দেখে তাদের সংখ্যা মাত্র পঞ্চাশ হাজার।
দখলদার আলাফতোগীন সেনাবাহিনীর সবচেয় যোগ্য ও অভিজ্ঞ পাঁচ-ছয়জন সেনাপতিকে হত্যা করিয়েছিলো শুধু আবুল হারেস ও আবুল আব্বাসের প্রতি আনুগত্যের অপরাধে। তাছাড়া সেনাবাহিনীর বহু তেজস্বী কমান্ডারকেও বিদ্রোহের আশঙ্কায় আলাফতোগীন হয় অন্তরীণ, নয়তো হত্যা করিয়ে ফেলেছিলো। ফলে খাওয়ারিজম বাহিনীতে সুলতানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো যোগ্য সেনাপতি ও কমান্ডারের অভাব দেখা দেয়। সার্বিক অবস্থা আন্দাজ করতে পেরে আলাফতোগীন প্রমাদ গুণতে শুরু করে।
কিন্তু পরাজয়ের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে- এটা বোঝার পর আলাফতোগীনের অনুসারীরা মরিয়া হয়ে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হয়। যুদ্ধের প্রথম দিকের মোকাবেলা সুলতানের চড়া মূল্য দিতে হয়।
সুলতানের অগ্রবর্তী বাহিনী সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ আলতাঈর নেতৃত্বে মূলশিবির থেকে অনেকটাই সামনে অবস্থান নিয়েছিলো।
আলতাঈর সৈন্যরা যখন ফজরের নামাযের জামাতে শরীক হলো এবং সকল সৈন্য একসাথে জামাতে নামায আদায় করছিলো, তখন আলাফতোগীনের সহযোগী সেনাপতি খমতাশ তার গোটা বাহিনী নিয়ে আলতাঈ সহযোদ্ধাদের উপর হামলে পড়ে।
আলতাঈ ছিলেন ইতিহাসখ্যাত সেনাপতি। জীবনে অসংখ্যবার চরম দূরাবস্থার মধ্যেও তিনি পরাজয়কে জয়ে পরিণত করেছিলেন। কৌশলী ও অভিজ্ঞ সমরনায়ক হিসেবে ইতিহাস তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। যার নাম সুলতান মাহমূদের সমপর্যায়ে উচ্চারিত হয়। সেদিন তিনি তার শিবিরে সকল যোদ্ধাদের নিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্তেই ফজরের নামায আদায় করছিলেন।
শত্রুবাহিনী হয়তো জানতো, সুলতানের সৈন্যরা রণাঙ্গনেও জামাতে নামায আদায় করে থাকে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য মদখোর খরতাশ তার দলবল নিয়ে পূর্ব থেকে অদূরে অবস্থান নিয়েছিলো।
যেই দেখলো, আলতাঈর তামাম সৈন্য নামায পড়ছে, ঠিক তখন এক সাথে হাজার হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে খমরতাশ নামাযরত সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সুলতানের এই সৈন্যরা ছিলো একেবারেই অপ্রস্তুত। তাদের কারো পক্ষেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হলো না। ফলে সুলতানের নির্বাচিত চৌকস সৈন্যদের বিরাট অংশ নিহত হলো। সেনাপতি আলতাঈ মুষ্টিমেয় কয়েকজন কমান্ডার ও সহযোদ্ধা নিয়ে কোনমতে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেন।
