নাহিদাকে উদ্ধারের জন্য পাঁচজন কমান্ডো নির্বাচিত করা হলো। তন্মধ্যে জেবীন ছিলো পঞ্চম।
* * *
পাঁচ কমান্ডো অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে জুরজানিয়া পৌঁছে গেল। তারা জুরজানিয়া গিয়ে একটি সরাইখানায় রাত যাপন করলো। পাঁচজনের পাঁচটি ঘোড়া ছাড়াও তারা একটি অতিরিক্ত ঘোড়াও সাথে নিল।
রাজধানী জুরজানিয়া ও আবুল আব্বাসের রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত জেবীন এই কমান্ডো অভিযানে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করল। সে এক কমান্ডোকে সাথে নিয়ে শহরের ভেতরে ঢুকে রাজপ্রাসাদের আঙিনায় চলে এলো। তারা আসার সময় শহরময় সকল রাস্তায় বিদ্রোহী দখলদার সেনাদের টহলরত অবস্থায় দেখতে পেল। তারা সারাদিন ছদ্মবেশে শহর ও রাজপ্রাসাদের বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে আবার সরাইখানায় ফিরে গেল।
পরদিন গযনীর পাঁচ কমান্ডো যখন সরাইখানা থেকে বের হলো, তখন তাদের পরনে ছিলো খাওয়ারিজম বাহিনীর উর্দি। তাদের হাতের বল্লমে খাওয়ারিজম সেনাদের পতাকা। এই পতাকা ছিলো খাওয়ারিজম বাহিনীর বিশেষ ইউনিটের প্রতীক। তারা বিশেষ বাহিনীর বিশেষ সৈন্য হিসেবে মাথা
উঁচু করে গর্বিত ভঙ্গিতে পথ অতিক্রম করছিলো। প্রত্যেকেই ছিল অশ্বারোহী এবং পাঁচজনের সাথে একটি অতিরিক্ত ঘোড়াও জিনবাঁধা ছিলো। তাদের ঘোড়াগুলোর চাল-চলনেই বোঝা যাচ্ছিল এগুলো সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিটের দীর্ঘ প্রশিক্ষিত ঘোড়া। শহরের পথ অতিক্রম করার সময় টহলরত অশ্বারোহী সৈন্যদের সাথেও তাদের সাক্ষাত হলো। তারা একই বাহিনীর সমগোত্রীয় ভাইয়ের মতো স্মিত হাসি দিয়ে তাদেরই পরিচিত নিয়মে সম্ভাষণ জানালো।
শহরের বাসিন্দারা এমনিতেই সেনাশাসনে ভীত-বিহ্বল ছিল। তদুপরি বিশেষ বাহিনীর বিশেষ ঘোড়ায় আরোহী সৈন্যদের দেখে পথ ছেড়ে পাশে দাঁড়িয়ে তাদের যাবার পথ করে দিচ্ছিল এবং সম্মানসূচক সালাম দিচ্ছিলো। বস্তুত এই পাঁচ কমান্ডো ছিলো গযনী বাহিনীর বিশেষ দলের সদস্য। তাদের বহনকারী ঘোড়াগুলোও ছিল প্রশিক্ষিত। এ ছাড়া তারা খাওয়ারিজম বাহিনীর পোশক ও পতাকাধারী বল্লম ধারণ করেছিলো বলে বিশেষ বাহিনীর মতো করে এগিয়ে যেতে তাদের কোন বেগ পেতে হয়নি। কারণ, তারা প্রত্যেকেই ছিলো উপযুক্ত ও প্রশিক্ষিত। তাছাড়া তারা আগেই জেনে নিয়েছিলো খাওয়ারিজমের বিশেষ বাহিনীর রীতিনীতি।
জেবীনের দেখানো পথে অনায়াসেই গযনীর পাঁচ কমান্ডো আবুল আব্বাসের রাজপ্রাসাদের সদর দরজায় চলে গেল। এই পাঁচ কমান্ডো ভয়ানক অভিযানে নেমেছিলো। তারা জানতো, ধরা পড়লে তাদের কী ভয়ঙ্কর শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু সকল ভয়-শঙ্কাকে দু’পায়ে দলে তারা সদর দরজায় গিয়ে রাজমহলের ভেতরে প্রবেশ করলো।
রাজমহলের প্রহরীরা এই কমান্ডোদেরকে তাদের বাহিনীর বিশেষ ইউনিটের সদস্য মনে করে কোন ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ না করে পথ ছেড়ে দিল। জেবীন তার সঙ্গীদেরকে একটি ঘোর অন্ধকার পথে নাহিদার কক্ষে নিয়ে গেল। মহলের ভেতরেও দখলদার সেনাদেরকে কয়েক জায়গায় সতর্ক প্রহরা দিতে তাদের নজরে পড়ল। কিন্তু গযনীর এই অকুতোভয় কমান্ডোরা আল্লাহর নাম নিয়ে সামনে অগ্রসর হলো।
রাজপ্রাসাদের একটি জায়গায় গিয়ে জেবীন সঙ্গীদের দাঁড় করিয়ে অতিরিক্ত ঘোড়াটি ও একজন সঙ্গীকে নিয়ে আরো এগিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জেবীন ও তার সঙ্গী ঘোড়া থেকে নেমে নাহিদার কক্ষের সঙ্গে লাগোয়া সেবিকার কক্ষে প্রবেশ করল। কক্ষের সামনে প্রহরী দাঁড়ানো। এর পরেই নাহিদার কক্ষ। কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে জেবীন স্থানীয় ভাষায় প্রহরীদেরকে বললো, “দরজা খোল, বন্দী মহিলাকে শাহে খাওয়ারিজম আলাফতোগীনের একটি পয়গাম শোনাতে হবে।”
প্রহরী দরজা খুলে দিতেই চকিতে তারা দু’জন প্রহরীকে টেনে কক্ষের ভিতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল এবং তরবারীর আগা প্রহরীদের বুকে ধরে তার গায়ের উর্দি খুলতে বাধ্য করলো। এরপর কাপড় দিয়ে প্রহরীদের হাত-পা বেঁধে তাদের মুখে কাপড় খুঁজে পিঠমোড়া করে বেধে মেঝেতে উপুড় করে ফেলে রাখল। সেই সাথে বললো, আমরা গযনীর কমান্ডো, একটু শব্দ করবে অবশ্য তো এক আঘাতেই মেরে ফেলবো।
প্রহরীর গা থেকে খুলে নেয়া একটি উর্দি নাহিদাকে দিয়ে সেটি দ্রুত পরে নেয়ার জন্য অনুরোধ করল দুই কমান্ডো।
মুহূর্তের মধ্যে নাহিদা প্রহরীর উর্দি পরে সৈনিকের বেশে তাদের সাথে বাইরে বেরিয়ে এলো। কমান্ডো দু’জন সেই কক্ষ থেকে বের হয়ে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে দ্রুত এসে অশ্বারোহণ করল এবং নাহিদাকে সাথে থাকা অতিরিক্ত ঘোড়াটিতে সওয়ার হওয়ার জন্য ইশারা করল।
নাহিদা ছিলেন অশ্বারোহণে অভ্যস্ত এবং প্রশিক্ষিত। কমান্ডোদের ইশারা পেতেই তিনি এক লাফে দক্ষ সৈনিকের মতোই ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। এরা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এসে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের সঙ্গীদের সাথে মিলিত হয়ে বিনা বাধায় সদর দরজা পেরিয়ে আসতে সক্ষম হলো।
ফেরার পথে শহরের পথ অতিক্রম করার সময় আগের মতোই তাদের চাল ছিলো বিশেষ বাহিনীর মতো। খুব দৃঢ়তার সাথেই তারা মূল শহর থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলো। তারা যখন শহরের সীমানায় দাঁড়িয়ে গাছগাছালীর আড়ালে এসে পড়ল, তখন সবাই এক সাথে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোড়া হাঁকালো।
