“আপনি কি নাহিদার ভালোবাসার টানে তাকে বিয়ে করতে চান, নাকি সুলতানের সাথে বন্ধুত্ব ও মিত্রতা মজবুত করার জন্য?
“উভয়টিই আমার লক্ষ্য।” উজিরের জিজ্ঞাসার জবাবে বললেন আবুল আব্বাস। তবে নাহিদার প্রতি আমার ভালোবাস হয়তো প্রাধান্য পাবে। আসল কথা হলো, নাহিদাও আমাকে ভালবাসতো। কিন্তু তার ও আমার এই ভালোবাসার মধ্যে কোন কদর্যতা ছিলো না। আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিলো অনেকটা ভাই-বোনর মতো অথবা গুণবতী ভাবী আর স্নেহশীল দেবরের মধ্যে যেমনটি হয়ে থাকে।
অবশ্য এখন অবস্থা অনেকটাই বদলে গেছে। তখন নাহিদার সাথে আমার এতোটাই গভীর হৃদ্যতা ছিলো যে, আমার দ্বিতীয় স্ত্রী আলনূরী এ ব্যাপারে আমার প্রতি খুবই অসন্তুষ্ট ছিল। আল নূরীর পিতা আবু ইসহাককে আপনি জানেন। তিনি আমাদের সেনাবাহিনীর একজন শীর্ষ কমান্ডার এবং সেনাপতি। তিনি আমাকে বলেছিলেন, আল নূরী নাকি তার কাছে আমার ব্যাপারে নালিশ করেছে। আমি শ্বশুর সাহেবকে বলেছি, আলনূরী আমাকে ও আমার ভাইয়ের বিধবা স্ত্রীকে নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে যেন সে আর এমন দুঃসাহস না করে। আমার এই কথা বলার পর তার চেহারার যে অবস্থা আমি দেখলাম, তা মোটেও ভালো মনে হলো না।”
“সুলতান মাহমূদকে হিন্দুস্তান থেকে ফিরে আসতে দাও। তোমার এই প্রস্তাবে যেমন তোমার প্রেম-ভালোবাসা রয়েছে, তদ্রূপ এতে কৌশলী রাজনীতিও রয়েছে। এ ব্যাপারে তুমি আরো চিন্তা করো, আমিও ব্যাপারটি নিয়ে আরো ভাবি। বললেন উজির।
আবুল আব্বাস আর তার প্রধান উজির আবুল হারেস যখন সুলতান মাহমূদের সাথে মৈত্রী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে মতবিনিময় করছিলেন, সুলতান মাহমূদ তখন কাশ্মীরের বৈরী পরিবেশে ব্যর্থতার গ্লানিতে বিপর্যস্ত হচ্ছিলেন। তার অজেয় বাহিনীর সৈন্যরা ঝিলম নদীর শীতল পানিতে ভেসে যাচ্ছিল আর তুষারপাতে বরফের নিচে তলিয়ে যাচ্ছিল।
এ ঘটনার প্রায় ছয় মাস পর উজির আবুল হারেস একদিন বাদশা আবুল আব্বাসকে একান্তে বললেন, গযনী থেকে বিস্ময়কর খবর এসেছে! সুলতান মাহমূদ কাশ্মীর থেকে এমন শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে এসেছেন যে, তার সাথে এক-দশমাংশ সৈন্যও ফিরে আসেনি। যারা ফিরে এসেছে এদের অধিকাংশই মারাত্মকভাবে আহত। এবারের ফিরে আসায় মাহমূদের সাথে হিন্দুস্তানের সোনা দানা বোঝাই জঙ্গী হাতি যেমন ছিলো না, কোন হিন্দু বন্দীও ছিলো না। তার গোটা সামরিক শক্তিই সেখানে ধ্বংস হয়ে গেছে।”
“এরপরও আমি তার বোনকে বিয়ে করতে চাই।” বললেন আবুল আব্বাস। আপনি অভিজ্ঞ ব্যক্তি। আপনার মতো অভিজ্ঞতা আমার নেই। কিন্তু আপনি মনে হয় আমার কথা সমর্থন করবেন। আমি যদি দুঃসময়ে সুলতান মাহমূদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াই, সে নিশ্চয়ই আমার প্রতি কৃতজ্ঞ ও হিতাকাতক্ষী থাকবে। কখনো যদি আমাদের উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তখন সে নিশ্চয়ই আমাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে।
আপনি বলুন তার কাছে আমার প্রস্তাব পাঠানোর উপযুক্ত সময় কোনটি হতে পারে? আমাকে কি নিজে যেতে হবে?”
“এখনই উপযুক্ত সময়।” বললেন, আবুল হারেস। তার এই শোচনীয় পরাজয়ে সহমর্মিতা জানানো দরকার। তা ছাড়া কূটনৈতিক রীতি রক্ষায় এটাও বলা যেতে পারে যে, আমরা তার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে তোমার যাওয়া জরুরী নয়। আমিই যাবো এবং বিয়ের প্রস্তাবও তাকে দিয়ে আসবো।
কয়েক দিন পর খাওয়ারিজমের প্রবীণ উজীর আবুল হারেস দু’জন দূত এবং কয়েকজন নিরাপত্তারক্ষীসহ কয়েকটি উপঢৌকন বোঝাই উট নিয়ে গযনী পৌঁছলেন। সুলতান মাহমুদের কাছে খবর গেলো, খাওয়ারিজমের বাদশা আবুল আব্বাসের উজির সুলতানের সাথে দেখা করতে এসেছেন। খবর শুনে তাৎক্ষণিকভাবেই উজিরকে সুলতানের কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হলো।
খাওয়ারিজমের বাদশা শাহ্ আবুল আব্বাস মামুন সুলতানে আলী মাকাম এর খেদমতে কিছু উপঢৌকন পাঠিয়েছেন। সেই সাথে কাশ্মীর অভিযানে আপনার অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি ও পরাজয়ের জন্যে আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। শাহে খাওয়ারিজম আরো বলেছেন, আল্লাহ তাআলা সুলতানকে এতোগুলো বিস্ময়কর বিজরে পর একটি মাত্র ব্যর্থতা দিয়েছেন, এটিও ধারাবাহিক সাফল্যেরই অংশ। আল্লাহ তাআলা গযনী সুলতানকে যে মনোবল ও সাহস দিয়েছেন, আশা করি পরাজয় তাকে কাবু করতে পারবে না। শাহ বলেছেন, আমি প্রয়োজনে যে কোন ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। কেননা, বিপদেই তো ভাই ভাইয়ের কাজে লাগে।”
আমাদের এখানকার রীতি ও শিষ্টাচার এটাকে সমর্থন করে না যে, একজন মুসলমান বাদশাহর সম্মানিত উজির সুলতানের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবে। আপনি আমার পাশের আসনে বসুন।” আবুল আব্বাসকে সম্মানের সাথে কথাগুলো বললেন সুলতান।
সুলতানের আবদারে প্রবীণ কূটনীতিক ও মন্ত্রী আবুল হারেস আসনে বসলেন। অতঃপর সুলতান মাহমূদ বললেন, “আমি খাওয়ারিজম বাদশাকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি। আমি যখন আমার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে আমার এই দুঃসময়ের সুযোগে স্বার্থসিদ্ধির আশঙ্কা করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর হাত বাড়িয়েছেন। তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন, নিঃসন্দেহে নির্ভরযোগ্য বন্ধুর আমার খুব প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে আমি সাহায্য-সহযোগিতা চাই না।”
