এ খবর শুনে আমি খুব একটা পেরেশান হইনি। কারণ, আমাদের শত্রুদের আমি জানি। কিন্তু আলাফতোগীন আমাকে বললেন, “ভাইকে এমন এক ধরনের বিষ খাওয়ানো হয়েছিল, যার প্রতিক্রিয়া ছিলো পেটের পীড়ার মতো। ধীরে ধীরে তার শরীরে এই বিষক্রিয়া চলতে থাকে; কিন্তু ডাক্তারের পক্ষে পেটের পীড়া ছাড়া ওই বিষক্রিয়াকে সনাক্ত করা সম্ভব ছিলো না।”
“এমনটি অসম্ভব কিছু নয়। শত্রুরা অনেক কিছুই তো করতে পারে।” বললেন উজীর আবুল হারেস। আপনাদের শত্রুরা আপনাদের সামরিক শক্তিমত্তার ভয়ে ভীত। তাই তারা এ ধরনের চক্রান্তের আশ্রয় নিতেই পারে।”
কিন্তু ব্যাপারটি শুধু এতেই শেষ নয় সম্মানিত উজীর। বললেন নতুন শাসক আবুল আব্বাস। আলাফতোগীন আমাকে সংশয়হীনভাবে বলেছেন, ভাইকে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন সুলতান মাহমূদ। আর সেই বিষ খাইয়েছে সুলতানের বোন এবং আমার ভাবী স্বয়ং। এই বিষ প্রয়োগের কারণ হিসেবে এ বলেছেন, সুলতান মাহমূদ ভাইকে তার অধীনতা মেনে নিতে বলেছিলেন; কিন্তু সু ভাই সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এখন আমি কি আলাফতোগীনের কথা ও বিশ্বাস করবো?”
“না, তুমি বিশ্বাস করবে না।” বললেন বয়স্ক আলহারেস। আলাফতোগীনের কথা বলেই আমি এটিকে ঠিক মনে করি না। এ ছাড়াও আমি এটিকে সত্য মনে করি না এজন্য যে, সুলতান মাহমূদ রক্তে-মাংসে একজন মর্দে মুজাহিদ। তাকে বিষ প্রয়োগ করার কথা বিশ্বাস করা যায়; কিন্তু তিনি কাউকে বিষ প্রয়োেগ করাবেন এটা বিশ্বাস করা যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে চিনি। তিনি যদি রাজত্ব এবং রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধিতে আগ্রহী হতেন, তাহলে বেঁচে থাকার সময় চেষ্টা থাকতো তার সব কাজে। কিন্তু তার কাজকর্ম দেখলে তুমিও বলবে, দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে রাজত্ব করা তার শখ নয়। তুমি তো জানো, কতোবার তিনি গযনী থেকে কতো দূরে হিন্দুস্তানে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন। এখনও তিনি গযনী থেকে শত শত মাইল দূরে হিন্দুস্তানের সবচেয়ে দুর্গম এলাকায় যুদ্ধ করতে গেছেন। তিনি ইসলামের সৈনিক, ইসলামের প্রচার-প্রসারে লিপ্ত একজন ধর্মপ্রচারক। তিনি একজন সফল মূর্তি ধ্বংসকারী।”
“নতুন বাদশা আবুল আব্বাস আর বয়োজ্যেষ্ঠ উজির যখন পরস্পর এসব কথাবার্তা বলছিলেন, সুলতান মাহমূদ তখন দক্ষিণ কাশ্মীরের লোহাকোট দুর্গ অবরোধ করে বৈরী মওসুম ও দুর্ভেদ্য দুর্গপ্রাচীরের ফাঁদে আটকে গেছেন। তীব্র তুষারপাতে চাপা পড়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে তার সহযোদ্ধারা।
তুমি তো দেখতে পাচ্ছো, কতোবার স্বেচ্ছায় মৃত্যুফাঁদে পা দিয়েছেন সুলতান। বললেন হারেস। হিন্দুস্তানের রাজা-মহারাজাদের সামরিকশক্তি কোন মামুলী ব্যাপার নয়। হিন্দুস্তানের রাজশক্তির বিরুদ্ধে বর্তমান মুসলিম জগতের মধ্যে শুধু সুলতান মাহমূদই টক্কর দিতে পারেন এবং তিনি তা দিচ্ছেনও। এ ধরনের লড়াকু যোদ্ধারা কখনো কাউকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন না।”
“আমি নিহত হতে চাই না।” বললেন আবুল আব্বাস। যে আমাকে জীবিত রাখতে চাইবে এবং নিজেও জীবিত থাকতে চায়, আমি তাকে মিত্র বানাতে চাই। আপনি আমাকে পরামর্শ দিন, আমি কি তুর্কিস্তানের খানদেরকে মিত্র বানাবো, না সুলতান মাহমূদকে মিত্র বানাবো?
.
সুলতান মাহমূদকেই আমার সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী মনে হয়। সুলতান মাহমূদ সম্পর্কে আপনার বিশ্বাস যা-ই থাকুক না কেন, যেভাবে তিনি শক্তির জোরে শত্রুদের পদানত করে তাদের এলাকা গযনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেছে, একদিন হয়তো আমাকেও বলে বসতে পারে আমার আনুগত্য স্বীকার করে নাও। তাছাড়া আমার চতুর্পার্শ্বের শত্রুদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য আমার দরকার একজন শক্তিশালী মিত্র।”
“সেই শক্তি ও মিত্রের দাবী পূরণ করার ক্ষমতা একমাত্র সুলতান মাহমূদেরই রয়েছে।” বললেন উজীর আল হারেস।
“আমার মনের কথাগুলো আজ আপনার কাছে বলতে চাই সম্মানিত উজীর।” বললেন আবুল আব্বাস। শুধু কথা আর অঙ্গীকারের দ্বারা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ততোটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমার মনে মিত্রতা দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করার একটা চমৎকার কৌশল এসেছে। আমি সুলতান মাহমূদের বিধবা বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেবো। সে আমার বড় ভাইয়ের বিধবা। তাকে তখনই আমার খুব ভালো লাগতো। বয়সে সে হয়তো আমার চেয়ে এক অর্ধ বছরের বড় হবে; কিন্তু সুলতান মাহমূদ কি আমার সাথে তার বোনের বিয়ের ব্যাপারে রাজী হবেন?”
“স্মিত হেসে আবুল হারেস বললেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারবো না। তবে আপনি কি এই ঝুঁকির ব্যাপারটি ভাবেন না? আপনার ভাইকে যদি সে বিষ দিতে পারে, তবে আপনাকেও সে বিষপ্রয়োগে হত্যা করতে পারে।”
“না, নাহিদা আমাকে বিষ দিতে পারে না।” আকাশের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে স্বগতোক্তির মতো করে বললেন আবুল আব্বাস। না, লাবণী আমাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে পারবে না। কিছুটা উচ্চৈঃস্বরেই উচ্চারণ করলেন আব্বাস। আবুল হারেসের দিকে তাকিয়ে বললেন, লাবণী জানতো আমি তাকে কতোটা ভালোবাসি। আমি ছিলাম তার স্বামীর ছোট ভাই, দেবর ।
সে আমাকে খুবই ভালোবাসতো। আদর করে আমাকে শাহজাদা ডাকতো।… সত্য কথা বলতে কি, ভাইয়ের মৃত্যুর পর আমার মনে হয়েছে, আমি ভাইয়ের শূন্যতাকে সহ্য করতে পেরেছি; কিন্তু লাবণীর চলে যাওয়াকে সহ্য করতে পারছি না।”
