একদিন ভীমপালের কাছে খবর এলো, থানেশ্বর দুর্গ শাসকের পক্ষ থেকে এক দূত মহারাজার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। ভীমপাল তাদেরকে রাজ দরবারে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলো। থানেশ্বর দুর্গশাসকের দূতের সাথে ছিলো ভীমপালের পাঠানো সাদা দাড়িওয়ালা সেই সন্ন্যাসী ও তার সহযোগী দুই তরুণী। থানেশ্বর দুর্গের ডেপুটি সেনাপতি দূত হিসেবে বারজন নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে ভীমপালের রাজদরবারে এসেছিলো।
দূত রাজা ভীমপালের মুখোমুখি হয়ে বললো, “মহারাজ! আমরা আপনার আমানতকে ফেরত দিতে এসেছি। আপনার পাঠানো অন্যান্য সন্ন্যাসী ও তরুণীরা হিন্দু ডাকাতদের আক্রমণে নিহত হয়েছে বিধায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। এদেরকেও গুরুতর আহত অবস্থায় আমাদের সৈন্যরা উদ্ধার করে এনেছিলো। আমরা তাদেরকে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করেছি। আমরা তাদেরকে আরো আগেই ফেরত পাঠাতে পারতাম; কিন্তু এই বয়স্ক সন্ন্যাসীর আঘাত ছিলো মারাত্মক; তার সুস্থ হতে সময় লেগেছে। আপনি এই তরুণীদের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমরা আপনার আমানতের কোনো খেয়ানত করেছি কিনা। তাদের কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন, তাদের দলের কোনো সদস্য আমাদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে কিনা।”
সমকালীন ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, ভীমপালের মতো দুঃসাহসী ও অত্যাচারী রাজাও সন্ন্যাসীর ব্যর্থতার কোনো প্রতিশোধ নিতে পারেনি। বরং ব্যর্থ সন্ন্যাসী ও দূতকে সসম্মানেই বিদায় করেছে। এর ফলে ডেপুটি সেনাপতি সাহসিকতার সাথেই রাজদরবারে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি রাজার উদ্দেশে বলেন, “মাননীয় মহারাজ! আপনি আমাদের করদাতা। চুক্তি অনুযায়ী আপনি ও আমাদের মধ্যে কেউ কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতি নেবে না। কিন্তু আপনি ইতিমধ্যেই বেশকিছু তৎপরতা চালিয়েছেন, যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটাও প্রমাণিত হয়েছে, হিন্দু রাজপুতরা সাপের চেয়েও ভয়ংকর।”
রাজা ভীমপাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দূতের দিকে তাকিয়ে বললো, “করদাতা অর্থ এই নয় যে, তোমরা আমাদের রাজদরবারে এসে যাচ্ছে তাই কথা বলবে।”
রাজার মনোভাব দেখে দরবারীদের কেউ কেউ তরবারীর বাঁটে হাত রেখে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে দূতের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। দূতরূপী ডেপুটি সেনাপতি চকিতে একবার রাজদরবারের চতুর্দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মুচকি হাসলেন এবং বললেন, “দুর্ভেদ্য রাজদরবারের ভেতরে নিরস্ত্র এক দূতের বিরুদ্ধে এতোজন লোক রণপ্রস্তুতি নিলেন, ভাবতেও অবাক লাগে। আমাদের সুলতানের দরবারে কোনো নিরস্ত্র দূতের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে যদি কোনো শাহজাদাও তরবারীর বাটে হাত রাখতো, তাহলে সুলতান তার হাত কেটে ফেলতেন। তরবারীর পরাকাষ্ঠা যুদ্ধ ময়দানে দেখাতে হয়। তোমরা যদি তরবারী চালনায় এতোটাই সিদ্ধহস্ত হতে, তাহলে এই বৃদ্ধ ও তরুণীদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না। এরা তো তোমাদেরই বোন-কন্যা। এদের সম্ভ্রমকে তোমরা যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে?”
কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেছেন, সেদিন ভীমপালের রাজদরবারে যে ব্যক্তি দোভাষীর কাজ করছিলো, সে থানেশ্বর দুর্গশাসকের বিশেষ দূত গজনী বাহিনীর একজন তুখোড় যোদ্ধা ডেপুটি সেনাপতির তিরষ্কারমূলক বক্তব্য হুবহু এর বেশী আমার কোনো চাভাষান্তরিত করে রাজাকে শোনাচ্ছিলো না। দূতের কঠোর ও কড়া তিরষ্কার ও অবমাননামূলক শব্দগুলোকে অনেকটাই সাদামাটা ও সহজ ভাষায় রাজার কাছে পেশ করছিলো। অবস্থা দেখে দূত রাজার দোভাষীর উদ্দেশে বললেন, “আমি জানি না, তুমি আমার কথাগুলো হুবহু ভাষান্তরিত করে রাজার কাছে উপস্থাপন করছে কিনা। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি, আমার আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে হুবহু তুমি রাজার কাছে পেশ করছে না। আমি যেভাবে বলছি, হুবহু সেভাবে আমার কথাগুলো তোমাদের রাজার কাছে উপস্থাপন করো।”
এ পর্যায়ে এ কথাটিও দোভাষী রাজাকে শোনালো।
“সম্মানিত দূত, শুনুন! আমার বাবা ছিলেন আপনাদের করদাতা। তিনি মারা গেছেন। এখন আমাকে এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, আমি কর দেবো কিনা। অবশ্য এ অবস্থায়ও আমাদের মৈত্রী বহাল আছে এবং থাকবে।” বললো রাজা।
“আমি আপনার কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করা এ মুহূর্তে কর্তব্য মনে করছি।” বললো দূতরূপী ডেপুটি সেনাপতি। “আপনার দাদা আমাদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। আপনার বাবাও কোননা ক্ষেত্রেই জয়লাভ করতে পারেননি। এখন আপনার পালা। আপনি ইতিমধ্যে কয়েক তরুণীকে বলি দিয়ে দিয়েছেন। আপনি পাথরের মূর্তির সামনে বসে আরাধনা করে কী পাচ্ছেন? পরাজয় ছাড়া এতে কি কোনো উপকার হয়েছে। আপনার কি এখনো বুঝে আসেনি, আপনাদের ধর্ম একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস? সেই অদ্বিতীয় নিরাকার প্রভুই আপনাদেরকে একের পর এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি করছেন। কারণ, তিনিই একমাত্র প্রভু। শাস্তি ও পুরস্কার দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই আছে। আপনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করুন মহারাজ।”
“কারো রাজদরবারে এসে কোনো দূত কারো ধর্মকে অবমাননা করুক এমন দুঃসাহস আমরা কোনো দূতকে দিই না।” বললো রাজা। “আমার রাজ দরবারে এসে আমার সামনে আমার ধর্মকে অবমাননা করে আপনি আমাদের সাথে মৈত্রীচুক্তির ব্যাপারে ভাবতে বাধ্য করছেন। ঠিক আছে, আপনি এখন আসতে পারেন।”
