সন্ন্যাসীরূপী লোকের কথায় কুতুব গোজাকের চেহারায় লজ্জার আভাস ভেসে উঠলো।
“আপনি পেরেশান হবেন না।” বললো সন্ন্যাসী। “আপনার জায়গায় অন্য কোনো ব্যক্তি হলেও আমাদের ফাঁদে পা দিতো। আমি তরুণীদেরকে নিয়ে এসেছিলাম আপনার মধ্যে যৌবনের ভাটার টান অনুভূত করানো জন্য। দুনিয়াটাকে আমি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। বহু মানুষকে আমি ঘেঁটেছি। আমি মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা নিয়ে গভীর নিরীক্ষা করেছি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে আমি আপনার মধ্যে প্রয়োগ করেছি। মনের বাসনা পূরণের জন্য এবং জীবন ও জগতকে উপভোগ করার লোভে মানুষ বিবেককে চাপা দিয়ে আবেগের দাসত্ব করতে শুরু করে। তখন কর্তব্যপরায়ণ মানুষও আপন কর্তব্য ও দায়িত্ব ভুলে যায়। অধঃপতনের দিকে ধাবমান লোকটিও তখন নিজের অধঃগতি অনুধাবন করতে পারে না। তখন অনেকেই বুঝতে পারে না হৃতযৌবন ফিরে আসে না এবং সোনাদানা ধন-সম্পদের দ্বারা এবং দৈহিক ভোগবাদিতার দ্বারা আত্মার প্রকৃত প্রশান্তি পাওয়া যায় না। জাগতিক ধোকা ও প্রবৃত্তির প্ররোচনাকে যারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তারাই হয় সাধু-সন্ন্যাসী বা পীর-বুযুর্গ। যে মানুষের মধ্যে আত্মার নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায়, সে শত শক্ত দুর্গেও পরাজয়বরণ করে। শত্রুরা তার পিঠে চড়ে বসে। আপনি আপনার মিশন থেকে বিচ্যুৎ হয়ে গিয়েছিলেন আর আমাদের কর্তব্য ছিলো আমাদের মিশনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ।… কিন্তু এই পড়ন্ত জীবনে আমি কায়মনোবাক্যে আপনাকে একটি রূঢ় বাস্তব উপদেশ দিতে চাই। যে দুই তরুণী ডাকাতদের হাত থেকে বেঁচে গেছে এদেরকে আপনারা আটকে রাখবেন না। এদেরকে আটকে রাখলে এরা আপনার সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ফেলবে, আপনাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা জন্ম দেবে। অবশ্যম্ভাবী নৈতিক ও বাহ্যিক উভয় ধরনের পরাজয় থেকে রক্ষা পেতে হলে নিজের প্রবৃত্তিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।”
সাদা দাড়িওয়ালা সন্ন্যাসীর ক্ষত শুকাতে প্রায় মাসখানিক সময় লেগে গেলো। এই সময়ের মধ্যে সেনাপতি বাহরাম জেনে গেলো সাপ ও মানুষ একই সাথে বসবাস করে পৃথিবীতে এমন কোনো রাজ্য নেই। সেই সাথে দুর্গে নিয়ে আসা তরুণীদ্বয়ও তাকে জানিয়ে দিলো আসলে সর্পরাজ্য সর্পমণি বলতে বাস্তবে কিছুই নেই।
এসব রূঢ় বাস্তবতা প্রকাশ করার পরও কুতুব গোজাক যথারীতি পরম যত্নে সন্ন্যাসীর চিকিৎসা তদারকি অব্যাহত রাখলেন। তরুণী দুজনকে সসম্মানে দুর্গেই রাখা হলো। এক পর্যায়ে তাদের বিদায়ের সময় হলো।
“আপনি শত্রুতার বিষাক্ত মনোভাব নিয়ে এখানে এসেছিলেন আর এখন আপনাকে আমরা বন্ধুর মতোই বিদায় জানাচ্ছি। আমাদের আচার-ব্যবহার যদি আপনার ভালোই লেগে থাকে, তাহলে যাওয়ার সময় অন্তত এতোটুকু বলুন, আসলে আপনাদের রাজা-মহারাজাদের উদ্দেশ্য কী?” সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বললেন দুর্গশাসক। “সে কি আমাদের সুলতানের প্রতি আনুগত্য বহাল রাখবে, তার বাবার পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে?”
“আমরা আপনাদের ঈমান ও কর্তব্য বিনষ্টের জন্য যে কঠিন আক্রমণ পরিচালনা করেছিলাম, এটাই প্রমাণ করে আমাদের নতুন মহারাজা ভীমপাল আপনাদের সুলতানের আনুগত্য করবে না বরং তাকে চ্যালেঞ্জ করবে।” বললো সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসী আরো বললো, “রাজা ভীমপাল নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে করদরাজা থাকবে না। আপনাদের অধীনস্ত দুর্গশাসক ও সেনাপতিদেরকে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করার মিশন হিসেবেই আমরা আপনার কাছে এসেছিলাম। তাকে নিশ্চিত করা হয়েছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে গজনী বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়বে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, গজনীর সুলতানকে তাড়িয়ে একটি দুর্গম ও কঠিন জায়গায় নিয়ে গিয়ে তার উপর সমৰিত আক্রমণ করা হবে। সেই সাথে তাকে কর দিতে অস্বীকার করবে নতুন রাজা ভীমপাল।”
রাজা ভীমপালের কাছে খবর পৌঁছে গেলো সন্ন্যাসীর বেশে থানেশ্বর দুর্গে যে গোয়েন্দাদেরকে মিশনে পাঠানো হয়েছিলো, তা অকার্যকর হয়ে গেছে। কিন্তু তাকে এ কথা জানানো হয়নি যে, শুধু মিশনই ব্যর্থ হয়নি, বরং তারা যে পরিকল্পনা করেছিলো, তাও ফাঁস হয়ে গেছে। অবশ্য ভীমপাল এসব চক্রান্তে বিশ্বাসীও ছিলো না। নিজের সাহসিকতা ও সামরিক কার্যক্রমের প্রতি ভীমপালের বেশি আস্থা ছিলো। সে পুরো উদ্যমে যুদ্ধপ্রস্তুতি করতে লাগলো এবং কোন্ দুর্গম ও কঠিন জায়গায় সুলতানকে পরাজিত করা যায়, তা জায়গা নির্বাচনের প্রতি বেশি মনোযোগী হলো।
ঝিলম থেকে রাওয়ালপিণ্ডি পর্যন্ত একের পর এক পাহাড় অবস্থিত। বর্তমানে পাহাড়ের ভেতর ও পাদদেশ দিয়ে চলে গেছে মহাসড়ক ও রেলপথ। পূর্বে এসব জায়গার পথ ছিলো গুহার মতো। ঝিলম পাহাড়ী এলাকায় বুগীরটিলা নামে একটি জায়গা ছিলো। সেখানকার অধিবাসীদের জাদু-টোনা ছিলো সারা ভারতবর্ষে বিখ্যাত। সুলতান মাহমুদের সময়ে এই এলাকাটি ছিলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপরূপ এবং খুবই দুর্গম। ভীমপাল সুলতান মাহমূদের সাথে মোকাবেলার জন্য ঝিলম ও রাওয়ালপিন্ডির মাঝামাঝি দুর্গম এই স্থানটিকে বেছে নিলো। সে তার সেনাবাহিনী সেই দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় স্থানান্তরের নির্দেশ দিলো। সেই সাথে সেনাপতিদের বললো, তারা যেনো পাহাড়ী এলাকায় যুদ্ধ করার জন্য সেনাদেরকে বিশেষভাবে তৈরি করে। গজনী বাহিনীকে লাহোরে যাওয়ার জন্য এই দুর্গম ও সংকীর্ণ পথ অবলম্বন করতে হতো। এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য ভীমপাল জায়গায় জায়গায় ফাঁদ তৈরি করলো এবং পাহাড়ের উপরে তীরন্দাজ ইউনিট নিযুক্ত করলো। তীরন্দাজের উপরই বেশি গুরুত্ব দিলো ভীমপাল। আক্রমণের পর পাহাড়ী এলাকায় গজনী বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলে তাদের পরাস্ত করার জন্য বিশেষ অশ্বারোহী ও হস্তি বাহিনীকেও প্রস্তুত করলো। হস্তি বাহিনীকে অতি সংকীর্ণ পথে আক্রমণ এবং বিস্তৃত ময়দানে মোকাবেলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দিলো।
