উভয়েই প্রতিশ্রুতি দিলো, তারা তাদের মিশনের খবর কাউকে জানাবে । কুতুব গোজাক তাদের সামনে একটি চিত্র রেখে তাদের গতিপথ বোঝাতে লাগলো। সৈন্য দু’জন যতোই রাস্তার ভয়াবহতার কথা শুনতে লাগলো, বিস্ময় ও আশ্চর্যে তাদের চেহারা ফ্যাকাশে হতে লাগলো।
“গত রাতে সাদা চাদর পরিহিত সন্ন্যাসীরূপী একদল মুসাফিরকে আমার দফতরে হয়তো আসতে দেখেছো। ওই পথ দিয়ে পাহাড়ী নদী অতিক্রম করলেই সেই দলের সাদা দাড়িওয়ালা লোকটির দেখা পাবে তোমরা। তাকে পেয়ে গেলে তোমাদের কাজ সহজ হয়ে যাবে। সে তোমাদেরকে একটি গাছের শিকড় এবং প্রচুর সোনাদানা দেবে। সেগুলো নিয়ে তোমরা সোজা আমার কাছে চলে আসবে। গাছের শিকড়টা আমাকে দিয়ে দিবে আর সোনাদানা তোমরা নিয়ে নিবে।”
“সেই গাছের শিকড়টি কেমন?” জানতে চাইলো এক সৈনিক।
“সেটি এমন এক গাছের শিকড়, তা খেতে পারলে তুমি শত বছরেরও বেশি বাঁচতে পারবে এবং মৃত্যু পর্যন্ত শরীর থাকবে শক্ত-সামর্থ, টগবগে যুবকের মতো।”
সৈনিক দু’জন এ কথা শুনে পরস্পর চোখাচোখি করলো। ভাবখানা এমন যে, সোনাদানার চেয়ে এই শিকড়ের প্রতিই তাদের বেশি আগ্রহ।
“আমার নিজেরই যাওয়ার কথা ছিলো। সেই সন্ন্যাসী আমাকেই যেতে বলেছিলো। কিন্তু তোমরা তো জানো, দুর্গশাসকের পক্ষে এতো দীর্ঘ সময় দুর্গের বাইরে থাকা উচিত নয়। কিন্তু আমার এই ক্ষমতা আছে, তোমাদের দু’জনকে যতো সময়ের জন্য ইচ্ছা বাইরে পাঠাতে পারি।”
গত রাতে সেনাপতির কক্ষে তরুণী যখন নাগের দেশে যাওয়ার পথের কথা বলছিলো, তখন সাদা দাড়িওয়ালা সন্ন্যাসীরূপী লোকটি দুর্গশাসককে পথনির্দেশ দিচ্ছিলো এবং তাকে সশরীরে যাওয়ার প্রস্তাব করছিলো। সাদা দাড়িওয়ালা কুতুব গোজাককে এ কথাও বলেছিলো, আপনি আমাকে যে ইজ্জত ও সম্মান করেছেন, এর পরিবর্তে আপনাকেও চির যুবক থাকার ওষুধ ও সোনাদানা উপঢৌকন দেবো।
* * *
সৰ্পনাগের পূজারীরা চলে যাওয়ার পর সেনাপতি বাহরাম তার ডেপুটিকে বললো, “তুমি যদি না যাও, তবে আমি নিজেই যাবো। আমরা দু’জনের মধ্যে যে কোনো একজন বাইরে থাকলেও এ কথা বলা যাবে যে, বাইরে সেনাচৌকিগুলো দেখার জন্য গেছে। মেয়েটি আমাকে পথ বলে দিয়েছে। তুমি ভাবতে পারো, আমরা যদি সেখানে যেতে পারি, তাহলে আমাদের অবস্থান কোথা থেকে কোথায় চলে যাবে। এ কাজে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা দরকার। হয় তুমি যাও, নয়তো আমি যাবো। চার-পাঁচজন চৌকস সৈন্য সাথে নিতে হবে।”
“মাননীয় সেনাপতি! আপনি কি দৃঢ় বিশ্বাস করে ফেলেছেন যে, ওই লোকটি যা বলেছে তা সর্বৈব সত্য?” সন্দেহ প্রকাশ করলো ডেপুটি সেনাপতি। “আপনি কি ভেবেছেন, মেয়েটি এমন কঠিন রহস্যের কথা কেননা আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবে?”
“হ্যাঁ, ভেবেছি। ভেদ বলে দেয়ার কারণ হলো, আমাকে দেখে তার এতোটাই ভালো লেগেছে যে, নিজের উপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। সে আমাকে পাওয়ার জন্য আত্মভোলা হয়ে গেছে। সে একান্তভাবে চায় আমি তাদের রহস্য ভেদ করে সোনাদানা কজা করে নিই এবং তাকে নিয়ে ঘর-সংসার করি।”
“কিন্তু আমার সন্দেহ হয় লোকগুলো তাদের তরুণী মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য রাত কাটানোর জন্য এসব উদ্ভট গল্প ফেঁদেছিলো।” বললো ডেপুটি সেনাপতি। “এরা আপনাদের ধোঁকা দিয়ে নির্বিবাদে রাত কাটিয়ে চলে গেছে।”
“তুমি আমায় সঙ্গ দেবে কিনা তাই বলো?” বললো সেনাপতি। “তোমাকে আমি অধীনস্ত মনে করে নয়, বন্ধু মনে করে আমার একান্ত বিষয়ে তোমাকে অংশীদার করেছিলাম। ওখান থেকে আমি যদি কিছু নিয়ে আসতে পারি, তাতে তোমারও অর্ধেক থাকবে। আচ্ছা বলো তো, ঘরবাড়ি আপনজন থেকে দূরদেশে হত্যা আর খুনাখুনিতেই জীবনটা শেষ করে দেয়াই কি আমাদের বিধিলিপি? এসব হচ্ছে রাজা-মহারাজা ও সুলতানদের ঝগড়া। যুদ্ধ করে যেসব ধন-রত্ন পাওয়া যায়, তাতে তাদের আরাম-আয়েশ বাড়ে। তারা যুদ্ধে আমাদের জীবন বিপন্ন করে আমাদের রক্তের বিনিময়ে রাজা-বাদশাহ হচ্ছে। মৃত্যু-বিভীষিকা থেকে নিজের জীবনটাকে উদ্ধার করে কিছুটা আরাম-আয়েশ করার অধিকার কি আমাদের থাকতে পারে না?”
সেনাপতি বাহরাম যখন তরুণীদের রূপ-সৌন্দর্যের কথা শুরু করলো, তখন ডেপুটি সেনাপতিরও চোখ চমকে উঠলো। সেনাপতি ডেপুটিকে বললো, “তুমি চিন্তা করো না। তুমি না গেলে আমিই যাবো। আমি হয়তো আমার জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছি। আমার অনুপস্থিতিতে তোমার প্রধান কাজ হবে আমার অনুপস্থিতির কারণ গোপন রাখা। তুমি আমার অনুপস্থিতির ব্যাপারে বলবে, দূরে অবস্থিত আমাদের বিভিন্ন সেনাচৌকিগুলো পরিদর্শন করে সেগুলোকে আরো কার্যকর করার জন্য আমি পরিদর্শনে বেরিয়েছি। প্রশাসক আমার এ কাজে কোনো বাধা দেবে না। তোমার দ্বিতীয় কাজ হবে, দৃশ্যত আমাদের উপর আক্রমণ হওয়ার আশংকা নেই, তবুও নিশ্চিন্তে থাকা উচিত নয়। কারণ, আমরা শক্ৰবেষ্টিত অবস্থায় রয়েছি। শক্র থেকে কখনো নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। যদি কোন কারণে শত্রুরা দুর্গ আক্রমণ করে, তাহলে দুর্গ রক্ষার জন্য তুমি জীবন বাজি রাখবে। তাহলে সৈন্যরা আর আমার অনুপস্থিতির ঘাটতি অনুভব করবে না।”
ডেপুটি সেনাপতি সেনাপতি বাহরামের প্ররোচনায় সায় দিয়ে দিলো। সে এই গোপন রহস্য গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলো। তার সামনে এখন সমস্যা হয়ে দেখা দিলো সেনাপতির ক’জন সহচর নির্বাচন। কারণ, সোনা-রুপার লোভে যে কোনো সিপাহী এ অভিযানে যেতে এবং বিষয়টি গোপন রাখতে রাজি হবে; কিন্তু বিপুল ধন-রত্ন হাতিয়ে নিতে এরাই আবার স্বয়ং সেনাপতিকেই হত্যা করে বসতে পারে। এমনও হতে পারে, তারা নিজেরাও খুনাখুনিতে জড়িয়ে পড়বে। নানা কারণে সেনাপতির জন্য চারজন সফরসঙ্গী নির্বাচনে ডেপুটিকে খুবই চিন্তায় ফেলে দিলো। অনেক ভেবে-চিন্তে তার বিশেষ ঝটিকা বাহিনী থেকে চার সিপাহীকে নির্বাচন করলো ডেপুটি সেনাপতি।
