সাদা দাড়িওয়ালা লোকটি এমনই জাদুময় ভঙ্গিতে স্বপ্নপুরী নাগের কথা বলছিলো যে, দুর্গপতি কুতুব গোজাক, সেনাধ্যক্ষ বাহরাম ও তার ডেপুটি রুদ্ধশ্বাসে তা শুনতে লাগলো এবং বিস্ময়ে তাদের গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেলো। তাদের সামনেই উপবিষ্ট ছিলো চার তরুণী। তাদের ঠোঁটে ছিলো স্মিত হাসির আভা। গজনীর এই শাসকরা তরুণীদের রূপ-সৌন্দর্য দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলো। তারা ভেবেই পাচ্ছিলো না, এদের চেয়েও আরো সুন্দরী কোনো মানুষ হতে পারে! তারা মেহমানদের খুবই খাতির-যত্ন করলো এবং তাদের জন্য রাজকীয় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলো।
এক পর্যায়ে সবাই ঘুমোনোর জন্য চলে গেলো। কিন্তু সাদা দাড়িওয়ালাকে দুর্গশাসক কুতুব গোজাক তার কাছে বসিয়ে রাখলো। সে বৃদ্ধ থেকে সেই নাগের রাজ্যের গোপন রহস্য জানতে চেষ্টা করতে লাগলো। সাদা দাড়িওয়ালা কুতুব গোজাককে বললো, “সারা হিন্দুস্তানের রাজত্বের ভেদ লুকিয়ে রয়েছে নাগের দেশে। যেখানে অপরিচিত কারো পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় এবং কেউ যাওয়ার দুঃসাহসও দেখাতে পারে না।”
“আচ্ছা, কারো পক্ষে কি সেখানে পৌঁছা সম্ভব নয়?” খুব মনোযোগ দিয়ে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করলো কুতুব। “আমার ধন-দৌলতের কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, আমি বুড়ো হয়ে গেছি। আমি শুনেছি, হিন্দুস্তানের পাহাড়ী অঞ্চলে এমন গাছ-গাছড়া রয়েছে, যা সেবন করলে…।”
“হ্যাঁ, যা বার্ধক্যকে প্রতিরোধ করে…।” কুতুব গোজাকের অসমাপ্ত কথা বলে দিলো সন্নাসীরূপী সাদা দাড়িওয়ালা। “আমাকে দেখুন, আমার দাড়ি সাদা হয়ে গেছে, বয়সও একশ’ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আমার শরীরে হাত দিয়ে দেখুন, এখনো কেমন শক্তি-সামর্থ রয়েছে। আপনি ঠিকই শুনেছেন। আমাদের এলাকায় এমন গাছ-গাছড়া রয়েছে, যেগুলোতে সাপের বিষ মিশ্রিত রয়েছে, যেগুলো বার্ধক্যকে প্রতিরোধ করে। সেইসব গাছ আমরা চিনি। সেগুলোতে এমন সব গুণ রয়েছে, যে শুধু বার্ধক্যকেই রোধ করে না, জীবনকেও দীর্ঘস্থায়ী করে।”
কুতুব গোজাক ভাবছিলো, এ লোকের কাছ থেকে সে একাই রহস্য উদঘাটন করছে। কিন্তু এদিকে যুবক সামর্থবান সেনাধ্যক্ষ বাহরাম সেই দলের একজন পুরুষ ও একজন তরুণীকে তার কক্ষে নিয়ে জানতে চাচ্ছিলো, তারা কি তাদের সেই বিস্ময়কর এলাকায় তাকে নিয়ে যেতে পারে? কিন্তু দলের পুরুষ লোকটি তাকে বলছিলো, তারা তাদের দলের সাথে এবং এলাকার গোপন রহস্য ফাঁস করে দেয়ার মতো গাদ্দারী করতে পারে না। পুরুষ লোকটি কথা বলতে বলতে একটা অজুহাত খাড়া করে সেনাধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো। তরুণী একাকী সেনাপতির কক্ষে রয়ে গেলো। তরুণী মনোহরী ভঙ্গিতে হাসছিলো। সেনাপতি তার সাথেও আলাপ জুড়ে দিলো। তরুণী সেনাপতিকে বললো, “জীবনে আপনার মতো এমন সুদর্শন সুপুরুষ আমি কখনো দেখিনি।”
“তুমি তো বেহেশতে থাকো।” তরুণীকে বললো সেনাপতি বাহরাম।
“সেটি জান্নাত নয়, জাহান্নাম। সেখানে নারীর আবেগের কোনো মূল্য নেই। যৌবনকে যেখানে গলা টিপে হত্যা করতে হয়, তা জাহান্নাম বৈ আর কি। আমাদের জীবন তো ওইসব সন্ন্যাসীদের সাথেই কাটাতে হয়, যাদের কোনো প্রাণ-মন বলতে কিছু নেই। আমাদের তো নারীত্ব নিয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে।” তরুণী বললো।
তাদের কথাবার্তা এমন এক পর্যায়ে গিয়ে শেষ হলো, যেখানে দুটি ভিন্ন সত্তা থাকলেও মনোদৈহিক দিক থেকে একাত্ম হয়ে যায়। তরুণী যখন সেনাপতির প্রতি আবেগপূর্ণ প্রেম-ভালোবাসা প্রদর্শন করলো, তখন সেনাপতি বাহরাম তাকে বললো, “আচ্ছা বলো তো, সাপের মণির কাহিনী কতটুকু সত্য?” তরুণী তাকে বললো, “আমার পক্ষে আপনাকে সঙ্গ দিয়ে ওখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু আমি আপনাকে পথের অবস্থা বলে দিতে পারি।” বস্তুত তরুণী সেনাপতিকে পথের দিক-নির্দেশনা দিচ্ছিলো আর সেনাপতি বাহরাম খান একটি কাগজে সাপের দেশের নকশা এঁকে নিচ্ছিলো।
“আপনার কাছে বিপুল পরিমাণ তীর থাকতে হবে। কারণ, এই পথে সাপের খুব উৎপাত। বিপদ দেখলেই যাতে তীর দিয়ে আপনি সাপ মেরে ফেলতে পারেন। আমি আপনাকে যে সুড়ং পথের কথা বলছি, সেটির উপরে একটি বিশাল অজগর কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকে। সেটির মাথায় তীর ঐ লাগলেই মরে যাবে। কিন্তু শরীরে তীর লাগলে আপনার পক্ষে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ৪ আসা মুশকিল হবে। সুড়ং পথটি খুবই দীর্ঘ। আপনি সেটি অতিক্রম করলে # একটি সুন্দর ঝর্না দেখতে পাবেন। সেই ঝর্নার তীরেই আপনি ওই সাপের দেখা পাবেন। সেখানে সর্পরাজ মণি নিয়ে খেলা করতে থাকে। সেটি আপনি তীর দিয়ে মেরে ফেললেই মণি আপনার হাতের মুঠোয় এসে যাবে।”
“তখন তোমাকে আমি কোথায় পাবো?”
“আমাকে পেয়ে যাবেন।” চোখে চোখ রেখে ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে বললো তরুণী।
পরদিন প্রত্যূষেই নাগেশ্বরের কাহিনী রচনাকারী সন্ন্যাসীদল থানেশ্বর দুর্গ থেকে চলে গেলো। তারা রেখে গেলো নাগরাজ্যের বিস্ময়কর আখ্যান।
সকালে কুতুব গোজাক তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষীদের থেকে দু’জনকে ডেকে পাঠালেন। এই দু’জন ছিলো তার দৃষ্টিতে সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং দুঃসাহসী বীরযোদ্ধা। তাদের ডেকে তিনি বললেন, “শোনো! শাসক হিসেবে আমি তোমাদের ডেকে পাঠাইনি, একান্ত বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে তোমাদের ডেকেছি আমি। তোমরা যদি আমাকে একটি কাজ করে দিতে পারো, তাহলে তোমাদেরকে আমি পদোন্নতি দিয়ে গজনী পাঠিয়ে দেবো। আর তোমরা যদি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিতে চাও, তাহলে অবসর দিয়ে দেবো। তবে তোমাদেরকে এখান থেকে বিদায় করার সময় এমন সোনাদানা-কড়ি দিয়ে দেবো যে, তোমাদের সাত পুরুষ সুখে-শান্তিতে আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে পারবে। তবে শর্ত হলো, তোমাদেরকে আমি এমন এক জায়গায় পাঠাচ্ছি, যেখানকার রহস্যের কথা পৃথিবীর কাউকে জানাতে পারবে না। আমি তোমাদেরকে বিশেষ এক পোশাকে একটি বিশেষ জায়গায় পাঠাবো।”
