তোগা খানের সাথে সাক্ষাতের পর বাগদাদের খলীফা সম্পর্কে অনাকাঙ্খিত খবরাখবর শুনে তিনি এতোটাই কষ্ট পেলেন যে, তার চিন্তাশক্তি স্থবির হয়ে গেলো। কারণ, খলীফাকে তিনি বিশ্বের ইসলামী চেতনার কেন্দ্রবিন্দু মনে করতেন। তিনি ভাবতেন, বাগদাদই ইসলাম ও মুসলমানদের ইজ্জত, মর্যাদা ও উজ্জীবনের প্রাণশক্তি। কিন্তু খলীফা কাদের বিল্লাহ আব্বাসী ছিলো ইসলামী সালতানাতের কলঙ্ক। তিনি মনে মনে কখনো তোগা খানের প্রতি ক্ষুব্ধ হচ্ছিলেন, আবার কখনো খলীফার প্রতি তার ক্ষোভ-ঘৃণা সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছিলো। তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিলো যে, তোগা খান তাকে বিভ্রান্ত করতে অসত্য কোনো তথ্য দেয়নি। এ খবর তার চিত্তকে অস্থির করে তুলেছিলো। এমতাবস্থায় বারবার তার আধ্যাত্মিক গুরু আবুল হাসান খিরকানীর কথা মনে পড়ছিলো।
সেই দিনই তিনি আবুল হাসান খিরকানীর সাথে সাক্ষাতের জন্য রওনা হলেন। ভোরে রওনা হয়ে পরদিন সন্ধ্যায় তিনি গন্তব্যে পৌঁছে গেলেন। গুরুর সকাশে পৌঁছে তাঁর হাতে চুমু দিয়ে সুলতান মাহমূদ বললেন, “আমার বিশ্বাসের পরিপন্থী একটা সংবাদ আমাকে মানসিকভাবে চরম হতাশাগ্রস্ত করে ফেলেছে। দারুণ যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছি আমি। আমাকে স্বস্তির কোনো পথ বাতলে দিন গুরু।”
“কী হয়েছে? হিন্দুস্তান থেকে কি পরাজিত হয়ে এসেছো?” জিজ্ঞেস করলেন খিরকানী।
“আপনাদের দুআয় হিন্দুস্তানের মুশরিকদের কাছে আমি কখনো পরাজিত হবো না। বিজয়ী কোনো সুলতান তখনই পরাজিত হয় যখন স্বজাতীয় কোন ভাই তার পিঠে আঘাত হানে।” সুলতান বললেন।
“আমি সেইসব আত্মঘাতী ভাইদের ব্যাপারে মোটেও বেখবর নই সুলতান। কিন্তু ভুলে যেও না আল্লাহ সত্যের পক্ষে আছেন। আল্লাহ তোমাকে মদদ করবেন, তোমার হতাশ হওয়ার কোনোই কারণ নেই।” বললেন খিরকানী।
“আপনি হয়তো জানেন। কিন্তু এ কথাও কি আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে যে, খলীফা আল-কাদের বিল্লাহ আমার বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে প্ররোচনা a দিচ্ছে। আমাকে একথা বলেছে এলিখ খানের ভাই তোগা খান।” সুলতান বললেন।
খিরকানী স্মিত হেসে বললেন, “আমি এটাও জানি। খলীফার অসৎ ধারণা সম্পর্কে আমি যখন প্রথম জানতে পারি, তখন তুমি হিন্দুস্তানে। তুমি আজ না ও আসলে আমিই তোমাকে এ ব্যাপারে অবহিত করতে খবর পাঠাতাম।”
“তাহলে কি আমি তোগা খানের সংবাদকে সত্য বলেই বিশ্বাস করবো? আমি কি এতোদিন আত্মপ্রবঞ্চনায় ছিলাম যে খলীফাতুল মুসলিমীন আল্লাহর রসূলের প্রতিনিধি?” সুলতান বললেন।
“যারা সত্যিকার অর্থে রাসূলের প্রতিনিধি ছিলেন, তারা গত হয়ে গেছেন।” বললেন খিরকানী। “তাদের পর যারা এসেছে এবং ভবিষ্যতে যারা আসবে, তারা প্রবৃত্তির পূজারী খলীফা হবে। বর্তমান খলীফা একটি রাজ্য শাসন করে। সমরকন্দের শাসকও তিনি। তিনি যে কোনো মূল্যে তার মসনদ আঁকড়ে থাকতে তৎপর। রাজত্বই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। খেলাফতের সকল রীতি পদদলিত করে বর্তমান খলীফা তার প্রত্যক্ষ রাজত্বের পরিধিকে সম্প্রসারিত করতে শক্তিশালী ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। তুমি কি জানো না, তোমার পিতার শাসনামলে কারামাতীদের সাথে বর্তমান খলীফা কাদের বিল্লাহ আব্বাসী গোপনে মৈত্রী গড়ে তুলেছিলেন? আর তখন কারামাতীরা অজেয় শক্তিতে পরিণত হয়েছিলো। এরপর তুমি যখন আপসহীনভাবে নিজের দৃঢ়তা ও সাহসিকতার উপর ভর করে সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে হিন্দুদের দুটি গজনী আক্রমণ প্রতিহত করে ওদের দেশের ভেতরে গিয়ে হিন্দুদের পরাজিত করে হিন্দু অঞ্চল নিজের কজায় আনতে শুরু করলে এবং কারামাতীদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে ওদের ভণ্ডামী ও ভ্ৰষ্টামী নির্মূল করতে সক্ষম হলে, তখনই খলীফা তোমাকে আমীমুল মিল্লাত ও আমীনুদ্দৌলা’ খেতাবে ভূষিত করেন। তোমাকে তার বিশ্বস্ত ও অনুগত করে নেন। হিন্দুস্তানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌত্তলিকতা দূর করে সেখানে ইসলামের সত্যের বাণী প্রচার করা আর বিন কাসিমের বিজিত রাজ্যগুলোর নিগৃহীত মুসলমানদেরকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নাগপাশ থেকে মুক্তির ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই। বরং তোমার ক্রমবর্ধমান শক্তিতে সে শংকিত। এ আশংকা থেকেই তিনি প্রকাশ্যে তোমাকে বাহবা দিচ্ছেন আর নেপথ্যে তোমার শত্রুদেরকে উস্কানি দিয়ে তোমার শক্তি খর্ব করতে তৎপর রয়েছেন।”
“একজন কেন্দ্রীয় খলীফার এ ধরনের তৎপরতায় লিপ্ত হওয়া কি সমীচীন?” বললেন সুলতান।
“তুমি তাকে খলীফাতুল মুসলিমীন বলছো? আমি তাকে কখনো মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক মনে করি না। শরীয়তের দৃষ্টিতে তার খলীফার মসনদে আসীন হওয়ার কোনোই যোগ্যতা নেই। খলীফা হওয়ার জন্য তাকওয়া ও ইসলামী আদর্শের অনুসারী হওয়া অপরিহার্য। সেই সাথে মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ ও বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে ঐক্য ও সংহতি স্থাপন তার একান্ত কর্তব্য। তার মধ্যে কোনো ধরনের বৈষয়িক লালসা থাকা মোটেই উচিত নয়। এসব বিচারে সে মোটেও খলীফা হওয়ার উপযুক্ত নয়। যে খলীফা প্রত্যক্ষ রাজ্য শাসন করে, সে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে পারে না।” খিরকানী বললেন।
“আমরা কি এমন খলীফাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারি না?” বললেন সুলতান মাহমূদ।
