হাসলেন তোগা খান। সেই হাসিতে কিছুটা রহস্যময়তা এনে বললেন, “মানুষের মধ্যে যখন শক্তির অহংকার দেখা দেয়, তখন নিজের ভুলগুলোকেও দূরদর্শিতা মনে করে এবং নিজের উপলব্ধির ব্যতিক্রম কোন কথা শুনতে পছন্দ করে না। সুলতান নিজেকে সামরিক শক্তির গর্ব থেকে মুক্ত করুন। আমি খলিফার বিরুদ্ধাচরণ করে আপনার কাছ থেকে কী সার্থ অর্জন করতে পারবোর বাস্তবতা অনুধাবন করতে চেষ্টা করুন। দেখুন, আপনার বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের এমন কোন শাসক নেই, যে চক্রান্তে শরীক হয়নি। শুধু আমি আর কাদের খান ছাড়া আর সবাই আপনার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও করেছে। আপনার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযানে শরীক না হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আমরা সামরিক দিক থেকে দুর্বল ছিলাম। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আপনার বিরুদ্ধে মহাশক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারতাম। কিন্তু আমি ও কাদের খান সবসময় গৃহযুদ্ধের বিপক্ষে ছিলাম এবং আপনার ভারত অভিযান সাফল্য লাভের প্রত্যাশী ছিলাম। আপনার হয়তো জানা নেই, এলিখ খান আমাকে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য শুধু উস্কানিই দেয়নি, তার কথায় সাড়া না দেয়ার অপরাধে আমার বিরুদ্ধে…।”
“আপনার বিরুদ্ধে সেনাভিযানও করেছে। তোগা খানের মুখের অনুচ্চারিত কথা পূর্ণ করে দিলেন সুলতান। “কুদরতি তুফান ও তুষারপাত তার সেই অভিযান ব্যর্থ করে দেয়। এ ছাড়াও আপনার নিজের ব্যাপারেও কোন কথা জানতে চাইলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন তোগা খান।
“আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে যদি আপনার কাছে খবর থেকে থাকে, তাহলে আমার ইচ্ছা ও বলার মধ্যে আপনার কোন ধরনের সংশয় থাকা উচিত নয়। তারপরও যদি আমার ব্যাপারে আপনার সংশয় দূর না হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমার এখানে নিয়োজিত আপনার গোয়েন্দা কোন কাজই করছে না। শুধু শুধুই বেতন-ভাতা নিচ্ছে।” বললেন তোগা খান।
“বলুন, কী বলতে চান আপনি?” তোগা খানের উদ্দেশে বললেন সুলতান।
“বর্তমান খলীফা কাদের বিল্লাহ আব্বাসী ক্ষমতালিন্দু এবং সাম্রাজ্য বিস্তারে প্রয়াসী।” বললেন তোগা খান। “আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, খোরাসানের অর্ধেকটা শাসন করছেন খলীফা আর অর্ধেকটা আপনার নিয়ন্ত্রণে।… খলীফা আপনার শাসনাধীন অংশও কজা করতে উদগ্রীব। এ লক্ষ্যে তিনি ক্ষমতালি এলিখ খানকে ব্যবহার করছেন। খলীফা এলিখ খানকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সে যদি আপনার বিরুদ্ধে সেনাভিযান চালায়, তাহলে তিনি সৈন্যবল দিয়ে প্রকাশ্য সহযোগিতা না করলেও গোপনে পরিবহন, অস্ত্রশস্ত্র ও আর্থিক সুবিধা দিয়ে সহযোগিতা করবেন। খলীফা যদি মুসলমানদের ঐক্য, সংহতি ও এককেন্দ্রিকতার প্রত্যাশী হতেন তাহলে তো তার উচিত ছিলো, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এলিখ খানের বিরুদ্ধে তিনি সেনাভিযান করতেন। তিনি দৃশ্যত হিন্দুস্তান অভিযানে আপনাকে বাহবা দিচ্ছেন আর পর্দার অন্তরালে চাচ্ছেন আপনি যেনো হিন্দুস্তানে ব্যস্ত থাকেন। আর ওখানে আপনার সামরিক শক্তি ক্ষয় হতে থাকুক, যাতে আপনি সামরিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েন। খলীফা সেই দিনের প্রত্যাশায় প্রহর গুণছেন, যেদিন তিনি খবর পাবেন আপনি হিন্দুস্তানে পরাজিত হয়েছেন, নয়তো সম্মুখসমরে মারা গেছেন। আমীর আবুল মুলক, দারা বিন কাবুস, আবুল কাসেমকে আপনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করেছেন খলীফা কাদের বিল্লাহ আব্বাসী। এই অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের পেছনে খলীফার চক্রান্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।”
তোগা খানের কথা শুনে ক্ষোভে-দুঃখে সুলতানের চোখ লাল হয়ে যায়। তিনি যে খলীফাকে মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পবিত্র আসনে সমাসীন ভাবতেন, আজ তাকেই তার শত্রুতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা শুনে তিনি হতবাক হয়ে পড়েন।
“আপনি এসব কথার প্রমাণ চাইলে আমি আপনাকে প্রমাণ দেখাবো।” বললেন তোগা খান। “সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, আমি আপনার সহযোগী, প্রয়োজনে আমার সৈন্যরা আপনার সহযোগিতা করবে, আমার দূত যাবে আপনার কাছে। আমার সামরিক শক্তি কম হতে পারে, তবে ঈমানের দিক থেকে আমি দুর্বল নই। এলিখ খান যখন আমার বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে এসেছিলো, তখন খোদায়ী তুষারপাত ও ঝড় তাকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পিছু হটতে বাধ্য করেছিলো। সে একজন ঈমান বিক্রেতা।”
“যে জাতির কেন্দ্রীয় নেতা ঈমান বিক্রেতা হয়ে যায়, সেই জাতি সর্বাংশেই লুটেরা আর ডাকাতদের আখড়ায় পরিণত হয়।” দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন সুলতান।
খ্যাতিমান ঐতিহাসিক কাসিম ফারিশতা ও আলবিরুনী লিখেছেন, সুলতান মাহমূদকে কখনো এমন বিমর্ষ হতে দেখা যায়নি। তোগা খানের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি যখন গজনীতে ফিরে এলেন, তখন তার চেহারা ছিলো বিধ্বস্ত। তিনি কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। অস্থিরতায় তার দু’হাত নিসপিশ করছিলো। উজির তাকে জিজ্ঞেস করলেও তোগা খানের সাথে কী কথা হয়েছিলো, তা বলেননি।
সুলতান মাহমূদ ছিলেন সমকালীন বিখ্যাত বুযুর্গ আবুল হাসান খিরকানীর ভাবশিষ্য। খিরকানী গজনী থেকে প্রায় দু’দিনের দূরত্বে বসবাস করতেন। সুলতান মাহমূদ মাঝে-মধ্যে আধ্যাত্মিক গুরু আবুল হাসান খিরকানীর সান্নিধ্যে যেতেন। গুরুর কাছে গেলে তিনি মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতেন। তার মনের বোঝা খিরকানীর সাথে যে কোনো সমস্যা নিয়ে আলাপের দ্বারা হাল্কা হয়ে যেতো।
