সহসা তার ঘরে তাঁবুর পিছনের দিকটা কে তুলল, চমকে উঠে বসল সান্দ্রা। দেখল ক্রাম্প আর মিনস্কি চোরের মত চুপিসারে ঘরে ঢুকল দু’জনে।
সান্দ্রা বলে উঠল, কে তুমি? কি চাও?
ক্রাম্প চাপা গলায় গর্জন করে উঠল, তুমি যদি চীৎকার না করো তাহলে তোমাকে আঘাত করব না। আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি এবং তুমিও আমাদের সঙ্গে যাবে।
সান্দ্রা বলল, ডাটন কোথায়?
ক্রাম্প বলল, তার ভাগ্য যদি ভাল হয় ত সে ঘুমোবে। যদি তুমি তাকে চেঁচামেচি করে ডাক তাহলে তাকে খুন করা হবে।
সান্দ্রা বলল, তোমরা কি চাও আমার কাছে? কোথায় নিয়ে যাবে আমায়?
মিনস্কি বলল, শোন মেয়ে, তোমাকে আমরা এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি যেখানে তোমার বাবা তিন হাজার পাউন্ড নিয়ে না গেলে কেউ খুঁজে পাবে না তোমাকে।
এদিকে সেই নকল টারজান শিবিরের বাইরে বাদর-গোরিলাদের নিয়ে অপেক্ষা করছিল। ক্রাম্প, মিনস্কি আর সান্দ্রা শিবির হতে বার হবার সঙ্গে সঙ্গে নকল টারজান তার বাঁদর-গোরিলাদের নিয়ে শিবির আক্রমণ করল। গোরিলাগুলো যখন ক্রাম্প আর মিনস্কিকে ধরে কামড় দিচ্ছিল টারজান নামধারী লোকটা সান্দ্রাকে ধরে তুলে নিয়ে গেল। ক্রাম্প বা মিনস্কি গুলি করার কোন অবকাশই পেল না।
গোলমাল শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল ডাটনের। সে রাইফেল হাতে ছুটে এসে দেখে ক্রাম্প আর মিনস্কি রক্তাক্তদেহে শুয়ে আছে। তাদের দেহের কয়েক জায়গায় ক্ষত ছিল। ডাটনকে দেখে তারা উঠল।
ডাটন তাদের জিজ্ঞাসা কলল, কি ব্যাপার?
মিনস্কি বলল, মিস পিকারেলের ঘরে একজনকে ঢুকতে দেখে আমি ক্রাম্পকে ডাকি। এমন সময় দশ-বারোটা বাঁদর-গোরিলা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের উপর আর সেই অবসরে সেই টারজান সান্দ্রাকে তুলে নিয়ে যায়।
এদিকে টারজান নামধারী লোকটা সকালে রওনা হয়ে দুপুরবেলায় রুভুরি পাহাড়ের তলায় সেই কাঁটাবনের ধারে গিয়ে পৌঁছল। কাঁটাগাছগুলোকে এড়াবার জন্য ওরা হাতে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের একটা চড়াই পার হয়ে একটা পথ পেল।
পথটা পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল টারজান। সান্দ্রাকে বলল, এতক্ষণে আমরা নিরাপদ। এবার আমি রাজা দা গামার কাছে নিয়ে গিয়ে তোমাকে দেবী বানাতে পারব।’
সান্দ্রা বলল, আমি একজন ইংরেজ মেয়ে, আমি দেবী হতে চাই না।
লোকটা বলল, আমি তোমার এত উপকার করছি। অথচ তোমার কোন কৃতজ্ঞতাবোধ নেই।
আবার ওরা এগিয়ে চলতে লাগল। পথের সামনে সান্দ্রা একটা খাড়াই পাহাড় দেখতে পেল।
খাদটার পাশ দিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ওরা এগোতে লাগল। একটা বাঁদর-গোরিলা সান্দ্রার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু সে পাহাড়ের ভয়াবহ উচ্চতার কথা ভেবে আর উঠতে মন চাইছিল না সান্দ্রার। সে ভাবছিল যে সে পড়ে যাবে ইচ্ছে করে। সে উপর থেকে লাফিয়ে পড়বে।
কিন্তু তার আর দরকার হলো না। এক সময় একটা বাঁদর-গোরিলা সান্দ্রাকে হাত ধরে টেনে তুলতে গিয়ে তার ভার সামলাতে না পেরে পড়ে গেল। সান্দ্রাও পড়ে গেল তার সঙ্গে।
বনের মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গায় সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। তার উপর টারজনের অচেতন দেহটা পড়েছিল। তাকে ঘিরে দশ-বারোটা বাঁদর-গোরিলা বসে কথা বলছিল।
গয়ান বলল, মারা গেছে।
উঙ্গো বলল, না মরেনি।
একটা মেয়ে বাঁদর-গোরিলা মুখে করে কিছুটা জল নিয়ে সে টারজনের কপালে ও চোখে মুখে দিয়ে দিল। টারজান ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলল। সে কোথায় আছে তা একবার দেখে নিয়ে বলল, উঙ্গো কি ঘটেছিল?
উঙ্গে বলল, একটা শ্বেতাঙ্গ তোমাকে বন্দুক থেকে গুলি করেছিল।
টারজান এবার ভাবতে লাগল কে তাকে গুলি করেছিল। তার এবার মনে পড়ল ক্রাম্পকে সে দেখতে পেয়েছিল। এবার তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে ক্রাম্পই তাকে আবার গুলি করেছে। সে বলল, সেই মেয়েটি কোথায়?
উঙ্গো বলল, সে টার্মাঙ্গানীর সঙ্গে চলে গেছে।
টারজান আশ্বস্ত হলো। মেয়েটি তাহলে তার দলের লোকদের কাছে তাদের শিবিরেই ফিরে গেছে। তবে সে একবার সেই ভণ্ড প্রতারক লোকটাকে ধরার সংকল্প করল মনে মনে যে লোকটা এই সবকিছুর জন্য দায়ী।
দিনকতকের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠায় টারজান একদিন উঙ্গোকে বলল, আচ্ছা টারজনের মত নগ্ন হয়ে টারজনের নাম ধারণ করে একটা শ্বেতাঙ্গ ঘুরে বেড়ায়। তুমি তাকে দেখেছ?
উঙ্গো বলল, দুবার দেখেছি লোকটাকে। সে একদল বাঁদর-গোরিলার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়।
টারজান বলল, সে কোন্দিকে গেছে?
উঙ্গো দূরে রুহুরি পাহাড়ের ধারে কাঁটাবনের দিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে দেখাল।
পরদিনই টারজান বাঁদর-গোরিলাদের সঙ্গে নিয়ে রুকুরি পাহাড়ের দিকে রওনা হয়ে পড়ল।
সান্দ্রা দেখল সে পড়তে পড়তে পাহাড়ের গায়েই এক জায়গায় আটকে যায়।
পাহাড়ের গায়ে একটা জায়গায় টারজনের নামধারী লোকটা একটা বাঁদর-গোরিলার সঙ্গে দাঁড়িয়ে তাকে দেখাচ্ছে। লোকটা তার দড়িটা সান্দ্রার উপর ফেলে দিয়ে বলল, এই দড়িটা তোমার কোমরে বেঁধে দাও। আমি আর সঁচো নামে এই গোরিলাটা দু’জনে মিলে তোমাকে টেনে তুলব।
সান্দ্রা সঙ্গে সঙ্গে কোমরে দড়িটা বেঁদে নিল। ওরা দু’জনে দড়িটা ধরে সান্দ্রাকে টেনে তাদের কাছে তুলে নিল।
লোকটা সান্দ্রাকে বলল, তুমি খুব সাহসের পরিচয় দিয়েছ।
আরো কিছুটা উপরে উঠে ওরা একটা ঘাসে ঢাকা জায়গা পেল। টারজান নামধারী লোকটা সান্দ্রাকে বলল, এইখানে শুয়ে কিছুটা বিশ্রাম করে নাও।
