এরপর ওরা পাহাড় পার হয়ে ওদিকে একটা নদীর ধার দিয়ে সামনের একটা বনকে লক্ষ্য করে এগিয়ে চলল। ক্রমে বনের মধ্যে ঢুকে মাইলখানেক এগিয়ে যাবার পর ফাঁকা জায়গার উপর এক বিরাট প্রাসাদ দেখতে পেল সাল্লা।
সান্দ্রা বলল, এ প্রাসাদ হয়ত পর্তুগীজদের দ্বারাই নির্মিত। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল রাজা দা গামার নামটাও পর্তুগীজ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রুইজ আর দেবতার অন্যতম সেবক মৃত ফার্ণান্দো নামটাও পর্তুগজী। একটা রহস্য দানা বেঁধে উঠল তার মনে।
সকালে উঠে ডাটন সান্দ্রকে খোঁজে যাবার জন্য প্রথম নিগ্রোভৃত্যদের সর্দারকে ডাকল। বলল, তোমাদের সকলকে যাবার জন্য তৈরি হতে বল।
এরপর সে দু’জন শ্বেতাঙ্গকে ডাকল। ক্রাম্প আগেই উঠেছিল।
কিন্তু সর্দার নিগ্রোভৃত্যদের পেল না। সে এসে ডাটনকে বলল, ওরা ভয় পেয়ে গত রাতে শিবির ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
ডাটন আশ্চর্য হয়ে বলল, ভয়! কিসের ভয়?
সর্দার বলল, ওরা টারজান আর বাঁদর-গোরিলাদের ভয় করছে। আমার মনে হয় খোঁজ করতে না যাওয়াই ভাল।
ক্রাম্প বলল, ভয়ের কিছু নেই। টারজানকে আমি মেরে ফেলেছি। আর ওয়ারুহুরিদের গা দিয়ে আমরা যাব না। তাছাড়া আমি পুরস্কারটা ছাড়তে পারব না।
মিনস্কি বলল, আমিও ছাড়ব না।
ডাটন বলল, আমিও সান্দ্রাকে খুঁজে বার না করে ছাড়ব না।
অবশেষে টারজান শ্বেতাঙ্গ আর কিছু বিক্ষুব্ধ নিগ্রোভৃত্য মিলে সান্দ্রার খোঁজে বার হলো। সর্দার নিগ্রোদের কোন রকমে রাজী করালেও তারা বিক্ষুব্ধ ছিল মনে মনে। সর্দার নিজেও ক্ষুব্ধ ছিল। সে নীরবে পথ চলছিল।
বিকালের দিকে একজন নিগ্রোযোদ্ধাকে দেখতে পেয়ে ক্রাম্প গুলি করল তার রাইফেল থেকে।
ক্রাম্প আর গান্ট্র মৃতদেহটা পরীক্ষা করে বলল, ওর দাঁতগুলো দেখ, ওরা নরখাদক। ওর গায়ে কত সোনার গয়না।
সর্দারও বলল, হ্যাঁ, ওয়ারুতুরি নরখাদক।
রাতের মত ওরা এক জায়গায় শিবির স্থাপন করল। কিন্তু পরদিন সকালে শিবিরে একটা নিগ্রোভৃত্যকেও পাওয়া গেল না।
গান্ট্র বলল, তুমি নরখাদক ওয়ারুভুরিকে মারার পরই তারা ভয় পেয়ে যায়। ওদের ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।
ক্রাম্প বলল, তার মানে পুরস্কারটা আমাকে ছেড়ে দিতে হবে?
ডাটন বলল, তার মানে মিস পিকারেলের খোঁজ না করেই ফিরে যাব?
তুমি ফিরে যাও। আমি একা যাব।
ক্রাম্প বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
গান্ট্র বলল, কতকগুলো পাউন্ডের জন্য তোমরা সবকিছু করতে পার।
ক্রাম্প বলল, শুধু কতকগুলো পাউন্ডের কথা নয়। ওয়ারুতুরিটার গায়ে কত সোনার গয়না দেখেছ? আমার মনে হয় রুকুরি পাহাড়ের কোন এক জায়গায় তাল তাল সোনা আছে।
গান্ট্র বলল, সোনা পাওয়া গেলে তার ভাগ দিতে হবে।
ক্রাম্প বলল, এই সোনা সম্বন্ধে অনেক গল্প শোনা যায়। শোনা যায় হাজার সিংহ সোনার জায়গাটা পাহারা দিয়ে রেখেছে। আর আছে দুটো উপজাতি।
মিনস্কি বলল, তাহলে ওয়ারুতুরিরা কি করে সে সোনা পায়?
ক্রাম্প বলল, সেই উপজাতিদের দেশে লবণ আর লোহার বড় অভাব। ওরা তাই ওয়ারুভুরিদের কাছ থেকে সোনার বিনিময়ে লবণ আর লোহা নেয় ওয়ারুতুরিরা আবার হাতির দাঁতের বিনিময়ে লবণ আর লোহা যোগাড় করে।
গান্ট্র বলল, কিন্তু কি করে সোনা পাবে তুমি?
ক্রাম্প বলল, আমার মনে হয় রুভুরি পাহাড়ের উপর কোন এক জায়গায় সোনা আছে।
গান্ট্র এবার ডাটনকে বলল, তোমার মতলব কি? তুমি কি করবে?
ডাটন বলল, আমি মিস পিকারেলের খোঁজে যাব ওখানে। আমার মতে ওখানেই ওকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পরদিন সকালে শিকারের খোঁজে শিবির থেকে চারজন চারদিকে বেরিয়ে গেল। ডাটন গেল পশ্চিম দিকে।
বনের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে চারদিকে শিকারের আশায় তাকাচ্ছিল ডাটন। কিন্তু কোথাও কোন শিকারের সন্ধান পেল না। সে বুঝতে পারেনি তার পিছন দিকে একটা ঝোপের আড়ালে একটা ক্ষুধার্ত সিংহ ওৎ পেতে বসে আছে।
এবার সিংহটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে ফাঁকা জায়গায় এসে ডাটনের পিছনে বসে রইল।
পিছন ফিরে সিংহটাকে দেখতে পেয়েই একটা গাছের কাছে ছুটে চলে গেল ডাটন। কিন্তু সে দেখল গাছের সবচেয়ে নিচু ডালটা দশ ফুট উপরে। সে তাই উঠতে পারল না। সে তার রাইফেল থেকে গুলি করল। গুলিটা সিংহের গায়ে লেগে সে উল্টে পড়ে গেলেও ডাটনকে ধরার জন্য লাফ দিল। ডাটন আবার গুলি করল কিন্তু গুলিটা এবার লাগল। সিংহটা এবার ডাটনের উপর ঝাঁপ দেবার জন্য উদ্যোগ করতেই ডাটন দেখল নগ্নপ্রায় এক শ্বেতাঙ্গ সেই গাছটা থেকে লাফিয়ে পড়ল সিংহটার ঘাড়ের উপর। তার পিঠের উপর উঠে তার পাগুলো সিংহটার পায়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে তার ছুরিটা বারবার বসিয়ে দিতে লাগল তার গায়ে।
ডাটনের রাইফেলের গুলিতে আগেই জখম হয়েছিল সিংহটা। এবার টারজনের ছুরির আঘাতে সে লুটিয়ে পড়ল। এবার তার মৃতদেহটার উপর একটা পা রেখে আকাশের দিকে মুখ তুলে বাঁদর গোরিলাদের মত বিজয়-সূচক চীৎকার করল। ডাটন তা দেখে ভয় পেয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে টারজনের মুখ থেকে সেই ভয়ঙ্কর পাশবিক ভাবটা চলে গেল। সে মৃদু হেসে ডাটনকে বলল, তোমার নাম পেলহ্যাম ডাটন?
ডাটন বলল, হ্যাঁ, কিন্তু তুমি আমার নাম জানলে কি করে? তুমি কে?
টারজান বলল, আমিই বাঁদর-দলের টারজান। তোমার কথা মেয়েটি আমাকে বলেছিল।
