টারজান গম্ভীর গলায় বলল, তুমি বলছ আমি বুঝতে পারছি না। আমি হচ্ছি বদরদলের রাজা টারজান। আমি গতকাল কেন জীবনে কখনো তোমাকে দেখিনি।
সান্দ্রা আশ্চর্য হয়ে বলল, তুমি তাহলে আমাকে শিবির থেকে চুরি করনি?
টারজান বলল, আমার নামে একটা ভণ্ড প্রতারক এই কাজ করেছে। আমি তাকে খুঁজছি। সে কোথায় তা জান?
সান্দ্রা বলল, ওয়ারুতুরিরা তাকেও ধরেছিল। কিন্তু সে পালিয়ে যায়।
টারজান বলল, তার সম্বন্ধে যা জান বলত।
সে বলছিল, আলেমতেজোদের রাজা দা গামা তাকে বলেছিল একজন দেবী চাই। একজন শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে দেবী হিসেবে দেখাতে হবে। তবে সে বলেছিল সে-ই টারজান। কিন্তু তুমি টারজান এটা ঠিক ত?
আমিই হচ্ছি টারজান।
তুমি জান আমার বাবার সফরি কোথায় আছে?
টারজান হেসে বলল, চারজন শ্বেতাঙ্গের একটা সফরি আমাকে হত্যা করার জন্য খুঁজছে। এটাই যে তোমার বাবার সফরি সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু আমার বাবার দলে মোট তিনজন লোক ছিল-আমার বাবা, পেলহ্যাম ডাটন, আর শিকারী গান্ট্র।
ক্রাম্প নামে একটা লোক ঐ দলে ছিল। সে আমাকে দেখেই গুলি করে। কিন্তু গুলিটা আমার লাগেনি।
ক্রাম্প বোধহয় পরে যোগদান করে।
সে রাতে সান্দ্রার শোবার জন্য একটা গাছের ডালের উপর জায়গা করে দিল টারজান। সকালে উঠে টারজান কিছু ফল নিয়ে এসে তাকে খেতে দিল। বলল, তোমার খাওয়া হয়ে গেলে আমি তোমাকে তোমার দলের লোকদের কাছে নিয়ে যাব।
সেদিন সকালে ডাটনদের শিবিরে খাবার না থাকায় ক্রাম্প এক শিবির থেকে মাইলখানেক দূরে শিকার করতে গিয়েছিল। জলের ধারে একটা ঝোপের আড়ালে পশু শিকারের জন্য লুকিয়ে ছিল ক্রাম্প। হঠাৎ সে টারজান আর সান্দ্রাকে সেই পথে আসতে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। ক্রাম্প নীরবে টারজানকে লক্ষ্য করে গুলি করল। গুলিটা টারজনের মাথায় লাগতে সে পড়ে গেল।
সান্দ্রা ক্রাম্পের কাছে এসে বলল, তুমি কে?
ক্রাম্প বলল, আমার নাম টম ক্রাম্প। আমি তোমাকেই খুঁজছি।
সান্দ্রা বলল, কেন তুমি ওকে গুলি করলে?
সে তোমাকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল।
সে আমাকে চুরি করেনি। সে আমাকে নর-খাদকদের হাত থেকে উদ্ধার করে ডাটনের শিবিরে নিয়ে আসছিল।
যাই হোক, চলে এস। আমি তোমাকে ডাটনের শিবিরে নিয়ে যাব। এখান থেকে মাইল খানেক দূরে শিবিরটা।
সান্দ্রা বলল, ওর জন্য কিছু করবে না? দেখ একবার লোকটাকে।
ক্রাম্প হেসে বলল, যা হবার হয়ে গেছে। তুমি এখন এস আমার সঙ্গে।
সান্দ্রা আর ক্রাম্প যখন শিবিরে গিয়ে পৌঁছল তখন বিকেল হয়ে গেছে। ডাটন সান্দ্রাকে দেখতে পেয়েই সে ছুটে এসে তার হাত ধরল।
আবেগের চাপে কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, আমি ত তোমার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।
তার চোখে জল এসেছিল। সে বলল, কে তোমায় খুঁজে পায়?
ক্রাম্প বলল, আমি। আমি টারজানকেও দেখতে পাই। সে আর চুরি করতে আসবে না কখনো।
সান্দ্রা বলল, সে আমাকে চুরি করেনি। আমি কতবার এই লোকটাকে তা বলেছি। সে-ই বরং আমাকে ওয়ারুভুরিদের গাঁ থেকে উদ্ধার করে গত রাতে। সে আমাকে এখানে নিয়ে আসছিল। অথচ এই লোকটা ঠাণ্ডা মাথায় শুধু শুধু গুলি করে তাকে। ডাটন, তুমি কিছু লোক নিয়ে একবার দেখবে চল। যদি মরে গিয়ে থাকে তাহলে তাকে কবর দেবার অন্তত একটা ব্যবস্থা করবে। জায়গাটা বেশি দূরে নয়।
ডাটন বলল, আমি এখনি যাব।
ডাটন ছয়জন নিগ্রোভৃত্য সঙ্গে নিল। শিবিরের সব শ্বেতাঙ্গুরাই সঙ্গে গেল। ক্রাম্প আর সান্দ্রা দু’জনে জায়গাটা দেখিয়ে দিল। কিন্তু টারজনের কোন সন্ধান পাওয়া গেল না।
ডাটন সান্দ্রাকে বলল, ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যময়। একজন টারজান তোমায় চুরি করে নিয়ে গেল, আর একজন টারজান তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে এল।
সান্দ্রা বলল, চল, শিবিরে ফিরে চল আগামীকালই আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যাবে পেলহ্যাম।
ক্রাম্প বলল, আমি আর মিনস্কিও যাব তোমাদের সঙ্গে।
ডাটন বলল, তার দরকার হবে না।
ক্রাম্প বলল, তোমাদের দরকার না থাকলেও আমার দারকার আছে। আমার পুরস্কারের টাকাটা ত নিতে হবে।
সান্দ্রা বলল, পুরস্কার মানে?
ডাটন বলল, তোমার বাবা তোমার ও টারজনের খোঁজ পাওয়ার জন্য দেড় হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন।
সান্দ্রা ক্রাম্পকে বলল, তাহলে সে পুরস্কার এখন কেউ পাবে না। যে লোকটি পুরস্কার পাবার যোগ্য তাকে তুমি গুলি করে মেরেছ আর যে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল সে এখনো নিরুদ্দেশ।
ক্রাম্প বলল, ঠিক আছে, দেখা যাবে।
যাই হোক, ওরা সবাই শিবিরে ফিরে গেল। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
এদিকে টারজান নামধারী লোকটা সান্দ্রার উপর নজর রেখে নীরবে অপেক্ষা করে যাচ্ছিল শিবিরের বাইরে থেকে। সে দেখল গান্ট্র ও শুতে চলে গেল ক্রাম্প আর মিনস্কি নিগ্রোভৃত্যদের তাঁবুতে চলে গিয়ে তাদের কি সব বোঝাল আর সঙ্গে সঙ্গে তারা মালপত্র গুছিয়ে পশ্চিম দিকে রওনা হয়ে পড়ল তৎক্ষণাৎ।
টারজান নামধারী লোকটা ভেবেছিল মালবাহক নিগ্রোদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গরাও শিবির ছেড়ে চলে যাবে আর সেই অবকাশে সে মেয়েটাকে নিয়ে পালাবে। কিন্তু সে যখন দেখল শ্বেতাঙ্গরা গেল না তখন সে অধৈর্য হয়ে পড়ল কিছুটা।
সান্দ্রার কিন্তু ঘুম এল না চোখে। সে শুধু টারজনের মৃত্যুর কথাটা ভাবতে লাগল বারবার।
