নিগ্রো যোদ্ধাটি বলল, লোকটা একটা শয়তান।
টারজান বলল, শয়তান হোক বা দানব হোক টারজান তাকে খুঁজে বার করবেই। তোমার যাওয়ার পথে যদি শ্বেতাঙ্গরা আসে তাহলে তাদেরও এই কথা বলবে।
যেতে যেতে ওরা পথের উপরে বসে পড়তেই বনভূমির অন্ধকার অস্বস্তিকরভাবে ঘন হয়ে উঠল সান্দ্রার মনে।
যে লোকটা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল সে তাকে নিয়ে বিশ্রামের জন্য বসল। সে কে এবং কোথায় কি জন্য নিয়ে যাচ্ছে তাকে তা সে বলেনি এখনো পর্যন্ত। এর আগে জিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর পায়নি। তবু আজ আবার সেই একই প্রশ্ন করল সান্দ্রা পিকারেল।
লোকটা বলল, আমি হচ্ছি টারজান। আমি নিজেকে টারজান বলেই জানি। কিন্তু ওরা আমায় দেবতা বলে। কিন্তু আমি দেবতা নই। তবে তুমি যেন একথা বলো না তাদের।
সান্দ্রা বলল, ওরা কারা?
লোকটা বলল, আলেমতেজোরো। ওদের রাজা দা গামা আমাকে দেবতা বলে। কিন্তু ওদের প্রধান পুরোহিত বলে আমি দেবতা নই, একজন শয়তান এবং আলেমতেজোদের ধ্বংসের জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে ওদের দেশে। কাছে থাকলে প্রধান পুরোহিতের অসুবিধা হবে, তার ক্ষমতা খর্ব হবে এ জন্য সে আমাকে তাড়াতে চায়। এই নিয়ে রাজার সঙ্গে প্রধান পুরোহিত রুইজের ঝগড়া হয়। অবশেষে রুইজ আমার সম্বন্ধে রাজাকে বলে, ও যদি দেবতা হবে তাহলে ওর দেবী কোথায়? সব দেবতারই দেবী থাকে। আমি তাই তোমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছি। তুমিই হবে আমার দেবী। তা না হলে তারা আমায় খুন করবে। কিন্তু তোমাকে নিয়ে গেলে তারা আর খুন করবে না আমাকে।
সান্দ্রা বলল, ওখানে যেও না, আমাকে নিয়ে গেলেও কোন না কোন অজুহাতে রুইজ তোমাকে খুন করবে। তার থেকে যেখান থেকে তুমি এসেছ সেখানেই ফিরে যাও।
লোকটা বলল, আলেমতেজো ছাড়া আর কোথায় যাব আমি? যাবার মত কোন জায়গা নেই আমার। দা গামা বলে আমি স্বর্গ থেকে ভেসে এসেছি। তারা সবাই একথা বলে। কিন্তু আমি জানি না কেমন করে আবার স্বর্গে ভেসে যাব। আমি অবশ্য নিজেকে দেবতা মনে করি না। আমি শুধু জানি আমি টারজান।
আবার পথ চলা শুরু করল লোকটা। এবার সে নিজেই কথা বলে যেতে লাগল। সে বলল, তুমি খুব সুন্দরী, তোমাকে দেবী বলে ঠিক মানাবে।
সহসা কোথা থেকে একদল মুখে রং মাখা নিগ্রো যোদ্ধা এসে পড়ায় ওদের কথাবার্তা থেমে গেল। লোকটা সান্দ্রাকে বলল, ওরা ওয়ারুভুরি।
নিগ্রোদের সর্দার মুতিম্বোয়া বলল, এই হলো টারজান।
কথাটা বলতেই দু’জন যোদ্ধা লাফ দিয়ে ধরে ফেলল টারজান নামধারী শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে। মুতিঘোয়া বলল, ওকে এখন মেরো না। আমরা ওদের গায়ে নিয়ে গিয়ে উৎসবে সাবইকে ডাকব।
একজন যোদ্ধা বলল, ও আমাদের গায়ের অনেক মেয়ে ও শিশুদের চুরি করে নিয়ে গেছে।
মুতিম্বোয়া বলল, সেই জন্যই ওকে তিলে তিলে পীড়ন করে মারা হবে।
সান্দ্রা শ্বেতাঙ্গটাকে বলল, ওরা কি বলেছে বুঝতে পেরেছ?
লোকটা বলল, হ্যাঁ পেরেছি।
লোকটা বলল, আমি ঠিক পালিয়ে যাব। পরে এসে তোমাকে মুক্ত করে নিয়ে যাব। কিছু ভেবো না।
কিছুক্ষণ পর জোর গলায় সে চীৎকার করে উঠলে দূর থেকে অদ্ভুত গলায় কে তার উত্তর দিল সেই রকম শব্দ করে। কিন্তু সে গলার স্বর কোন মানুষের নয়।
ওয়ারুতুরিরা ভয় পেয়ে গেল। তাদের চলার গতি মন্থর হয়ে উঠল। এইভাবে কিছুটা যেতেই গাঁয়ে বড় বড় লোমওয়ালা একদল বাঁদর-গোরিলা কোথা থেকে ছুটে এসে আক্রমণ করল নিগ্রোদের। নিগ্রো যোদ্ধারা তখন সান্দ্রাকে তুলে নিয়ে ওদের গায়ের দিকে ছুটে পালাতে লাগল। বাঁদর-গোরিল ওদের তাড়া করে কিছুটা ছুটে এসে পরে ফিরে চলে গেল।
সান্দ্রাকে গাঁয়ের মধ্যে ওয়ারুতুরিরা নিয়ে গেলে সান্দ্রা মুতিম্বোয়াকে বলল, তুমি সর্দার, তুমি আমাকে আমার সঙ্গীদের কাছে পাঠিয়ে দাও। মুক্তিপণ হিসেব যা চাইবে তোমাকে আমার বাবা তাই দেবে।
মুতিম্বোয়া কোন কথা না বলে রান্নার একটা বড় পাত্রের দিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে তার পেটটা ঘষতে লাগল।
রুতুরি পাহাড়ের এদিকটায় এর আগে কখনো আসেনি টারজান। সে শুধু এখানকার নাম শুনেছে। সে জানে এখানকার ওয়ারুতুরি নামে উপজাতিরা মানুষ খায়। সে তাই সাবধানে পথ চলতে লাগল।
রাত্রি হতেই একটা গাছের উপর উঠে শুয়ে পড়ল টারজান। এমন সময় ঢাকের বাজনা শুনে চমকে উঠল সে। সে বুঝল আগামীকাল রাতে ওয়ারুবুরি গায়ে কোন বন্দী হত্যাকে কেন্দ্র করে নর-মাংসভোজী এক উৎসব হবে।
সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ে ঢাকের শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল গাঁটার দিকে। তারপর একটা গাছের উপর উঠে শুয়ে পড়ল। আগামীকাল সে গাঁটায় যাবে।
পরদিন সকালে আশপাশের গাঁ থেকে বহু নারী পুরুষ ওয়ারুতুরি গাঁয়ে এসে ভিড় করতে লাগল। সান্দ্রা বুঝল সেই হচ্ছে এই উৎসবের কেন্দ্র। সন্ধ্যে হতেই গাঁয়ের মাঝখানে এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল তাকে। জায়গাটা ছিল সর্দারের কুঁড়ের সামনে। সেখানে একটা গাছ ছিল। সেই গাছের তলায় পাঁচটা ছাগল এনে রাখা হলো।
পাঁচটা ছাগল বলি হবার পর যাদুকর পুরোহিত যেমনি একটা লাফ দিয়ে ছুরি হাতে সান্দ্রার গলা কাটতে গেল মুখ দিয়ে মন্ত্র বলতে বলতে অমনি একটা বিষাক্ত তীর এসে তার বুকটা বিদ্ধ করতেই সে পড়ে গেল।
এমন সময় ঘরের পাশেই সেই গাছ থেকে দৈত্যের মত একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ লাফিয়ে পড়ল। কিন্তু গাঁয়ের সবাই তখন যাদুকর পুরোহিতের মৃত্যু নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সেদিকে খেয়াল করেনি। টারজান এক মুহূর্তে সাম্রাকে তুলে নিয়ে আবার লাফ দিয়ে গাছে উঠে পড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। তীরবেগে রুকুরি পাহাড়ের দিকে ছুটে যেতে লাগল সে। অবশেষে পাহাড়ের ধারে একটা বনের মধ্যে নির্জন জায়গার মধ্যে এসে একটা গাছের উপর উঠে বসল। সান্দ্রা তখন তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে? দা গামা ঠিকই বলেছিল, তুমি দেবতা। তুমি গতকাল যা বলেছিলে তাই ঠিক।
