অন্য একজন বলল, সে আমাদের গায়ে এলে প্রথমে তার সঙ্গে বন্ধুভাবে ব্যবহার করব। পরে অসতর্ক মুহূর্তে তাকে ধরে তার হাত-পা বেঁধে ফেলব।
আর একজন বলল, আমার কিন্তু ভয় করছে। টারজানকে আমি সত্যিই ভয় করি।
অন্য একজন বলল, কিন্তু ওরা বলেছে তার জন্য মোটা পুরস্কার দেবে। পুরস্কারটা এত বেশি যে তাতে আমরা প্রত্যেকে একশোজন করে মেয়ে কিনতে পারব এবং তার সঙ্গে অনেক গরু, ছাগল আর মুরগিও কিনতে পারব।
কথাগুলো শুনে হতবুদ্ধি হয়ে গেল টারজান। সে ভাবল এই সমস্যার সমাধান তাকে করতেই হবে অন্য কোথাও যাবার আগে।
এই সব আদিবাসীদের গাঁটা কোথায় তা সে জানত। তাই সন্ধ্যার পর সে তাদের গাঁয়ের পাশে একটা গাছের উপর উঠে অপেক্ষা করতে লাগল।
ক্রমে রাত্রি হতে গাঁয়ের সবাই আপন আপন ঘরে শুয়ে পড়লে এবং গাঁটা একেবারে নীরব হয়ে গেলে গাঁয়ের গেট পার হয়ে গাঁয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল টারজান। সে দেখল গেটের কাছে একটা গাছ রয়েছে যার ডালগুলো ঝুঁকে আছে গাঁয়ের ভিতর দিকে। সেই দিক দিয়ে সে সহজে পালাতে পারবে।
টারজান দেখল সে রাতে খুব ঠাণ্ডা থাকার জন্য প্রহরী তার সামনে আগুন জ্বেলে তার পাশে বসে ঝিমোচ্ছে। আশপাশের কুঁড়েগুলোতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
টারজান নিঃশব্দে সর্দারের কুঁড়ের কাছে গিয়ে তন্দ্রাহত প্রহরীটার পিছন দিক থেকে তার গলাটা টিপে ধরল। তারপর চাপা গলায় তাকে বলল, চুপ করে থাক, আমি তোমায় মারব না।
কিন্তু তার গলার উপর হাতটা একটু আলগা করে দিতেই প্রহরীটা ভয়ে চীৎকার করে উঠল। টারজান তখন তাকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে গেটের দিকে ছুটে পালাতে লাগল। কিন্তু তার চীৎকারে গাঁয়ের অনেকেই তখন জেগে উঠেছে। একজন যোদ্ধা গেটের কাছে তার সামনে পথরোধ করে দাঁড়াতে টারজান তাকে ঘুষি মেরে ফেলে দিয়ে তার বুকের উপর পা দিয়ে সেই গাছটায় উঠে পড়ল। অন্য সব যোদ্ধারা তাকে আক্রমণ করার আগেই সে গাছের ডালে ডালে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বেশকিছুটা দূরে গিয়ে লোকটার গলাটাকে ছেড়ে দিল টারজান। সে উঠে দাঁড়ালে টারজান তাকে বলল, তুমি আমার সঙ্গে চুপচাপ এস। আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না।
লোকটা অন্ধকারে টারজানকে চিনতে না পেরে বলল, কে তুমি?
টারজান বলল, আমি টারজান।
লোকটা তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমাকে মেরো না বাওয়ানা। তুমি যা বলবে আমি তাই করব।
কোন কথা না বলে তাকে বনের আরো গভীরে নিয়ে গেল টারজান। একটা গাছের উপরে উঠে লোকটাকে তার সামনে বসিয়ে বলল, যদি বাঁচতে চাও ত আমার কথার ঠিক ঠিক উত্তর দেবে। সত্যি কথা বলবে।
লোকটা বলল, হ্যাঁ বাওয়ানা। আমি সত্যি কথা বলব।
টারজান বলল, আজ তোমার গায়ের লোকেরা কেন আমাকে আক্রমণ করেছিল?
কারণ ঢেঁড়া পিটিয়ে আমাদের গায়ে জানিয়ে দেয়া হয় টারজান আমাদের গায়ের মেয়ে ও ছেলেদের ধরতে আসছে।
কিন্তু তোমাদের গাঁয়ের লোকেরা জানে ত আমাকে। তারা জানে টারজান তাদের মেয়ে ও শিশুদের চুরি করে নিয়ে যায় না।
কাঁটাবনের ধারে রুহুরি পাহাড়ের তলায় যে গা আছে তার সর্দার ওয়ারুভুরি আমাদের বলল, টারজান এখন খারাপ হয়ে গেছে। সে তাদের গাঁ থেকে মেয়ে চুরি করে নিয়ে গেছে।
টারজান বলল, তোমরা ওয়াতুরির কথা বিশ্বাস করো? তারা নরখাদক এবং মিথ্যাবাদী।
হ্যাঁ বাওয়ানা, আমরা তা জানি। কিন্তু আমাদের গাঁয়ের তিনটে লোক দেখেছে তুমি নাকি একটা শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে গলায় দড়ি দিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলে।
টারজান বলল, এ কথা সত্যি নয়। আমি অনেকদিন তোমাদের গায়ে যাইনি। আমি তোমায় ছেড়ে দিচ্ছি, তুমি তোমার গায়ে চলে যাও। গাঁয়ের লোকদের বল গে, যে লোকটাকে তারা শ্বৈতাঙ্গ মেয়েটাকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছে সে টারজান নয়। বলবে, টারজান তাদের কোন দিন কোন ক্ষতি করবে না। যে লোকটা টারজনের নাম করে চুরি করে বেড়াচ্ছে টারজান তাকে খুঁজে বার করে খুন করবে। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই।
পরদিন সকালে রুহুরি পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান। এ রহস্যের সন্ধান তাকে করতেই হবে।
দুপুরের পর সে তার পথের সামনের দিক থেকে একটা আদিবাসীকে আসতে দেখল। তাকে দেখে টারজান লুকোবার কোন চেষ্টা করল না। কিন্তু আদিবাসী নিগ্রোটা টারজানকে দেখে চিনতে পেরেই ভয় পেয়ে তার দিকে তার হাতের বর্শাটা ছুঁড়ে দিল। ব্যাপারটা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল টারজান। সে বুঝতে পারল কোন একটা লোক নিজেকে টারজান বলে চালাবার চেষ্টা করছে এবং লোকে যাকে টারজান ভাবছে তাকে খুঁজে বার করতেই হবে।
আরো কিছু জানার জন্য পলাতক নিগ্রোটাকে ধরে ফেলল টারজান। গাছে গাছে সে এগিয়ে গিয়ে তার পথের সামনে হঠাৎ নেমে পড়ে তাকে ধরে ফেলল। লোকটা নিজেকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা করতে টারজান তাকে শক্ত করে ধরে রেখে বলল, কেন তুমি আমাকে মারতে গিয়েছিলে? তোমরা ত জান আমি তোমাদের বন্ধু।
আদিবাসী যোদ্ধাটা বলল, ঢেঁড়া পিটিয়ে আমাদের বলে দেয়া হয়েছে।
এরপর সে সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করল গতকাল সেই প্রহরীটা যে কথা বলেছিল টারজানকে।
টারজান এবার বুঝতে পারল ঐ হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিই মিস পিকারেল এবং এই জন্যই ক্রাম্প তাকে গুলি করেছিল।
টারজান নিগ্রো লোকটাকে বলল, তোমাদের গায়ে গিয়ে বল গে টারজান কখনো কোন গায়ে গিয়ে কোন মেয়ে চুরি করেনি। কোন এক দুষ্ট প্রকৃতির লোকই এ কাজ করে তার নামে চালাবার চেষ্টা করছে।
