সেই শব্দ লক্ষ্য করে সে গাছের উপর উঠে ডালে ডালে এগিয়ে যেতে বাতাসে কিছু নিগ্রো আর অল্প দু-একজন শ্বেতাঙ্গের গন্ধ পেল। টারজান যখন আরো অনেকটা এগিয়ে গেল তখন সে দেখতে পেল অদূরে একজন নিগ্রো আর দু’জন শ্বেতাঙ্গ একটা ফাঁকা জায়গায় একটি নদীর ধারে শিবির স্থাপন করছে। তাদের দেখে এক নির্দোষ শিকারীর দল মনে হলেও টারজান ঠিক করল অন্ধকার হলে সে তাদের কাছ থেকে তাদের কথাবার্তা শুনবে।
হঠাৎ নদীর উপর থেকে আর একটা শব্দ এল। টারজান গাছের উপর থেকে দেখল নদীর উপর দিয়ে কয়েকটা ডিঙ্গি নৌকা দাঁড় বেয়ে ঘাটের কাছে সেই শিবিরটার দিকে আসছে।
শিবিরের দু’জন শ্বেতাঙ্গ এগিয়ে গিয়ে আগন্তুকদের অভ্যর্থনা জানাল। পরে নৌকারোহীরা কূলে নেমে আগের শিবিরটার পাশে একটা শিবির স্থাপন করল। প্রথমে যারা নদীর ধারে শিবির স্থাপন করেছিল তাদের নেতা পেলহ্যাম ডাটন আগন্তুকদের চিনত না এবং তাদের দেখে খুব একটা ভাল মনে হলো না। কিন্তু তার শিকারী এবং প্রথম প্রদর্শক বিল গা এগিয়ে গিয়ে আগন্তুক শ্বেতাঙ্গ দু’জনের একজনকে দেখিয়ে ডাটনকে বলল, ইনি হচ্ছেন টম ক্রাম্প। অনেকদিন আফ্রিকার জঙ্গলে আছেন।
ক্রাম্প তার সঙ্গীকে দেখিয়ে ডাটনকে বলল, ইনি হচ্ছেন মিনস্কি।
ফাঁকা জায়গাটার ধারে যে একটা গাছ ছিল তার উপর থেকে টারজান ক্রাম্পকে চিনতে পারল। সে জানত ক্রাম্প একজন কুখ্যাত হাতির দাঁতের কারবারি এবং বছর কতক আগে সে ক্রাম্পকে তার দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সে একজন দুষ্ট প্রকৃতির লোক এবং দুটো দেশের কর্তৃপক্ষ তার নানা কুকীর্তির জন্য তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। বাকি তিনজন শ্বেতাঙ্গকে সে চিনত না। তবে ডাটনকে তার ভাল লোক বলেই মনে হলো।
ক্রাম্প তার শিবিরে এসে গাকে বলল, তুমি এখানে কি করছ বিল? তোমার সঙ্গের লোকটি কে?
গান্ট্র বলল, উনি একজন আমেরিকান। উনি এডিনবরা থেকে আগত টিমথি পিকারৈল নামে এক ধনী বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে শিকারে বেরিয়েছিলেন। আমি ওদের শিকারে সাহায্য করছিলাম। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সান্দ্রা নামে একটি যুবতী মেয়ে ছিল সঙ্গে। একদিন টারজান অফ দি এপস্ নামে এক নগ্নপ্রায় দৈত্যাকার লোক আসে আমাদের শিবিরে। তুমি লোকটাকে চেন?
ক্রাম্প তার মুখটা গম্ভীর এবং বিকৃত করে বলল, চিনি না মানে? বছর দুই আগে ও আমাকে এমন একটা অঞ্চল থেকে তাড়িয়ে দেয় যেখানে অনেক ভাল ভাল হাতি ছিল।
গান্ট্র আবার বলতে লাগল, শিবিরে এলে টারজানকে পিকারেল এমনভাবে খাতির করতে লাগল যেন মনে হবে টারজান ওর নিজের ভাই। একদিন পিকারেল যখন ডাটন আর আমাকে নিয়ে শিকারে বেরিয়েছিল তখন তার মেয়ে সান্দ্রা টারজনের সঙ্গে বেড়াতে চলে যায়। তারপর থেকে আর ফিরে আসেনি সান্দ্রা। আমরা ভাবছিলাম তাদের মৃত্যু ঘটেছে। এক সপ্তাহ হলো আমরা তাদের নানা জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছি। খুঁজতে গিয়ে আমরা একজন আদিবাসীর দেখা পাই। সে আমাদের বলল, সে দেখেছে। টারজান মেয়েটাকে বেঁধে তার গলায় দড়ি দিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। এই কথা শুনে বুড়ো পিকারেল মৃতপ্রায় অবস্থায় আগের শিবিরেই রয়ে গেছে। সে তার মেয়ের জন্য এক হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করে। কেউ তার মেয়েকে এনে দিতে পারলে সে এই টাকাটা আর টারজানকে কেউ জীবিত বা মৃত এনে দিতে পারলে তাকে পাঁচশো পাউন্ড দেবে। আমরা তাই ওদের খোঁজে এখানে এসে পড়েছি।
গোধূলি চয়ে যেতে সন্ধ্যার ছায়া নেমে এল শিবিরে নিগ্রোভৃত্যরা শিবিরের সামনে আগুন জ্বেলে তার চারপাশে বসল।
জ্বলন্ত আগুনের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল শিবিরের সামনেটা। হঠাৎ আগুনের ধারে বসে থাকতে থাকতে একজন নিগ্রোভৃত্য চীৎকার করে উঠল ভয়ে। তার চীৎকার শুনে শ্বেতাঙ্গরা মুখ তুলে দেখল দৈত্যাকার এক নগ্নপ্রায় শ্বেতাঙ্গ তাদের শিবিরের দিকে আসছে।
ক্রাম্প লাফ দিয়ে উঠে পড়ল। সে টারজানকে চিনতে পারল। চিনতে পারার সঙ্গে সঙ্গে সে তার পিস্তলটা বার করে টারজানকে লক্ষ্য করে গুলি করল।
ক্রাম্পের গুলিটা লাগল না। টারজনের গায়ে কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে টারজনের একটা তীর ক্রাম্পের ডানদিকের কাঁধটাকে বিদ্ধ করল?
ডাটন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ক্রাম্পকে বলল, তুমি একটা বোকা। ও শিবিরে আসছিল, তুমি গুলি করতে গেল কেন।
ডাটন জোর গলায় টারজান ডাকতে লাগল। বলল, ফিরে এসো। টারজান, তোমার কোন ক্ষতি করা হবে না। আমি কথা দিচ্ছি। মিস পিকারেল কোথায়? ফিরে এসে সব কথা বল আমাদের।
কথাগুলো কানে শুনতে পেলেও সে আর ফিরে এল না।
সেদিন রাতে একটা গাছের উপর রাত কাটাল টারজান। কিন্তু সে বারবার ভেবেও একটা কথা বুঝতে পারল না মিস পিকারেল নামে মেয়েটি কে এবং কেনই বা তারা তাকে তার অপহরণকারী বলে ভাবছে।
হঠাৎ একটা বর্শা ঝোপের ভিতর থেকে ছুটে এসে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। সে বুঝল এটা তার প্রতি আক্রমণ। বর্শাটা তার গায়ে লাগল কি না আক্রমণকারী তা বোঝার আগেই একটা গাছের উপর উঠে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল টারজান।
তার আক্রমণকারী কে এবং কোথায় তারা আছে তা জানার জন্য গাছের উপর থেকে অদৃশ্য অবস্থায় লক্ষ্য করতে লাগল টারজান। সে দেখল কুড়িজন আদিবাসী একজায়গায় জটলা পাকিয়ে বসে আছে। তাদের চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়ের চিহ্ন ফুটে রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বলছিল, বর্শাটা তার গায়ে লাগেনি এবং সে ঠিক এর প্রতিশোধ নেবার জন্য আসবে।
