তখন রাত্রিকাল বলে শিবিরের ধারে আগুন জ্বলছিল।
বন্দী দু’জনকে মাটিতে চিৎ করে ফেলে দেয়া হলো। দু’জন যোদ্ধা তাদের প্রতিটি হাত পা ধরে ছিল।
অদূরে একটা গাছের উপরে ঘন পাতার আড়াল থেকে সবকিছু লক্ষ্য করছিল এক নগ্নপ্রায় শ্বেতাঙ্গ। বন্দীদের উদ্ধার করার একটা সুযোগ খুঁজছিল সে সুযোগ না পেলে সে কিছুই করতে পারবে না। সে ওদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন দিতে পারবে না।
এদিকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের কাছ থেকে দুটো সিংহ এক নিমেষহারা চোখে তাকিয়ে ছিল ঘটনাস্থলের দিকে। তাদের লেজদুটো নড়ছিল।
এমন সময় নদী থেকে একটা আর্তনাদের শব্দ পেয়ে সিংহীটা সেইদিকে চলে গেল। কিন্তু সিংহটা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবাঙ্গোদের দিকে।
যাদুকর ডাক্তার বন্দী দু’জনের দিকে এগিয়ে এল। তার এক হাতে ছিল একটা জেব্রার লেজ। সে লেজের উপর পালক লাগানো ছিল। আর এক হাতে ছিল একটা লাঠি।
প্রার্থনার কথাগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করল মুলারগান। তাদের দু’জনের উপর জেব্রার লেজটা বুলিয়ে তাদের দিকে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল। সে আর কি সব বিড় বিড় করে বলতে লাগল।
এরপর হঠাৎ এক সময় সে একটা লাফ দিয়ে মুলারগানের শায়িত দেহটার উপর তার লাঠিটা ঘোরাতে লাগল। দু’জন যোদ্ধা তাকে আলগা করে ধরে ছিল।
যোদ্ধাদের হাতগুলো এক ঝটকায় সরিয়ে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল মুলারগান। তারপর যাদুকর ডাক্তারের মুখের উপর এমন জোরে একটা ঘুষি মারল যার ফলে তার চোয়াল ভেঙ্গে গেল আর সে মাটিতে পড়ে গেল।
সমবেত যোদ্ধারা চীৎকার করে ঘিরে ধরল মুরালগানকে।
এদিকে সিংহীটা নদীর ধার থেকে তার ধারাল নখওয়ালা একটা থাবা বাড়িয়ে বাবাঙ্গোদের বলি একজন নারীর ভেসে থাকা মাথাটাকে ধরে ফেলল। মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠতেই বাবাঙ্গোরা সেদিকে মনোযোগের সঙ্গে তাকাতেই সিংহটা তাদের আক্রমণ করল। তার ভয়ঙ্কর গর্জনে মাটি কাঁপতে লাগল।
বাবাঙ্গোরা তখন বন্দী দু’জন আর আহত যাদুকর ডাক্তারকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেল যেদিকে পারল।
মুলারগান উঠে দাঁড়াবার আগে সিংহটা তার কাছে গিয়ে পড়ল। শায়িত লোকটির ভীত সন্ত্রস্ত চোখপানে তাকিয়ে রইল সিংহটা। মুলারগান তার নিঃশ্বাসের গন্ধ পাচ্ছিল। তার হলুদ চোয়াল আর দাঁত দেখতে পাচ্ছিল।
এমন সময় একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল মুলারগান। এ দৃশ্য সত্যিই অভূতপূর্ব।
দেখল টারজান গাছ থেকে নেমে লাফিয়ে পড়ল সিংহটার উপর।
দেখল টারজনের পাদুটো সিংহের ছোট ছোট পা দুটোকে জড়িয়ে ধরেছে। তার পেশীবহুল লৌহ কঠিন হাতদুটো সিংহের গলাটা জড়িয়ে ধরে আছে। টারজান তার দেহের সমস্ত ভার দিয়ে চেপে আছে সিংহটার পিঠে।
সিংহটা তার পিছনের পায়ের উপর ভর দিয়ে খাড়া টারজনের দেহটাকে ফেলে দিতে চাইছে আর ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করছে। কিন্তু কিছুতেই মুক্ত করতে পারছে না নিজেকে।
মুলারগান দেখল সিংহটা এবার নিজে থেকে মাটিতে পড়ে টারজানকে ফেলে দেবার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাও পারছে না।
জীবনে বহু লড়াই, বহু কুন্তীর প্যাঁচ দেখেছে মুলারগান। কিন্তু সিংহ ও মানুষে এমন প্রাণপণে লড়াই জীবনে কখনো কোথাও দেখেনি বা তার কথা শোনেওনি।
সিংহদের শক্তির অনুপাতে সহ্যশক্তি নেই। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল সিংহটা। সে এবার চারপায়ের উপর ভর দিয়ে কোনরকমে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।
টারজান তখন একটা হাত সিংহটার ঘাড় থেকে ছাড়িয়ে খাপ থেকে তার শিকারের ছুরিটাকে বার করল। এই সুযোগে সিংহটা ঘুরে টারজনের হাতটাকে কামড়াতে গেল। কিন্তু টারজান তার ছুরিটা সিংহের ঘাড়ের উপর আমূল বসিয়ে দিল।
সিংহটা বিকট গর্জন করতে করতে যতবার শূন্যে লাফ দিতে লাগল ততবারই তার ঘাড়ে ও পাঁজরে ছুরিটা সজোরে আমূল বসিয়ে দিতে লাগল টারজান।
সিংহটা পড়ে গেল তার মৃতদেহের উপর একটা পা রেখে আকাশের পানে মুখ তুলে বিজীয় বাঁদর গোরিলাদের মত ভয়ঙ্করভাবে চীৎকার করে উঠল টারজান। তা শুনে মাটিতে বসে পড়ল মার্কস। মুলারগানের মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল। বাবাঙ্গোরা সিংহগর্জনের থেকে আরো ভয়ঙ্কর সেই অচেনা চীৎকার শুনে ছুটে আরো দূরে পালাতে লাগল।
টারজান বন্দী দু’জনকে মুক্ত করে সেই নৈশ অন্ধকার বনের মধ্য দিয়ে সেই প্রান্তরের কাছটায় নিয়ে এল।
পরদিন আপন আপন লোকদের সঙ্গে মিলন হলো সকলের। মুলারগান আর মার্কস মেলটনের সঙ্গে এক শিবিরে রইল। টারজান ওয়াজিরিদের সঙ্গে আলোচনা করতে লাগল। বাবাঙ্গোদের ঐ অঞ্চল হতে তাড়াবার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠতে লাগল তারা।
যাবার আগে টারজান মুলারগান ও মার্কসকে বলল, আফ্রিকা থেকে সোজা আমেরিকায় চলে যাবে। আর কখনো আসবে না।
মুলারগান বলল, কখনো না এ কথাটা কতদিন মনে রাখতে পারব তা জানি না।
মার্কস টারজানকে বলল, শোন মিস্টার, তুমি যদি আমার হয়ে একবার কুস্তি লড়ো তাহলে তোমাকে একশো স্বর্ণমুদ্রা দেব।
টারজান মুখ ঘুরিয়ে ওয়াজিরিদের সঙ্গে চলে গেল সেখান থেকে।
মার্কস মুলারগানকে বলল, দেখলে, লোকটা একশো স্বর্ণমুদ্রা প্রত্যাখ্যান করে চলে গেল। তবে তোমার পক্ষে ভালই হয়েছে। কারণ ও একবার লড়াইয়ে নামলে এক রাউন্ডেই তোমার চ্যাম্পিয়নপদ কেড়ে নিত।
টারজান ও জনৈক উন্মাদ (টারজান এ্যাণ্ড দি ম্যাডম্যান)
সেদিন টারজান বনের মাঝে একা পথ চলতে চলতে হঠাৎ বুঝতে পারল কারা যেন দূরে আসছে।
