মুলারগান পশুহত্যার ব্যাপারে তার দোষ স্বীকার করায় টারজান তাদের একটা সুযোগ দিতে চায় তাদের মুক্ত করে।
টারজান বুকে হেঁটে বনের দিকে ফাঁকা জায়গায়টার দিকে এগিয়ে গেল। সে একা ওদের সামনে দিয়ে ছুটে পালাতে পারত বনে। কারণ ওর গতিবেগ অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত। ওরা ধরতে পারত না ওকে। কিন্তু সঙ্গে আরও দু’জন লোক আছে। তাদের নিয়ে কোনরকমে ওদের অলক্ষ্যে অগোচরে বনের মধ্যে চলে যাওয়াই হলো ওর একমাত্র লক্ষ্য।
ওরা এইভাবে প্রায় একশো ফুট যাওয়ার পর কয়েকবার হাঁটতে থাকে মার্কস। সেই শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে বাবাঙ্গোরা।
টারজান তখন ওদের বলে, এবার উঠে পড়ে বনের দিকে ছুটতে থাক।
ওরা সবাই বনের দিকে ছুটতে থাকলে বাবাঙ্গোরাও ওদের ধরার জন্য ছুটতে থাকে। প্রথমে মার্কসকে ওরা সহজেই ধরে ফেলল। তারপর মুলারগানকে। টারজানকে ওরা ধরতে পারল না মুলারগানও হয়ত পালাতে পারত। কিন্তু সে মার্কসকে ফেলে রেখে উদারতার বশবর্তী হয়ে পালাতে চায়নি।
মুলারগানকে ওরা ধরে ফেললেও সহজে কিন্তু ধরা দিতে চায়নি সে। সে পর পর ঘুষি চালিয়ে কয়েকজনকে মাটিতে ফেলে দেয়। কিন্তু পিছন থেকে একজন বাবাঙ্গো এসে বর্শার লম্বা বাটটা দিয়ে তার মাথায় এমনভাবে মারল যে সে পড়ে গেল মাটিতে।
ফাঁকা জায়গাটার শেষ প্রান্ত থেকে বনটা শুরু হয়েছে। একটা গাছের উপরে উঠে টারজান দেখতে লাগল। মুলারগানের বীরত্ব ও সাহসের জন্য মনে মনে প্রশংসা না করে পারল না সে। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে সে তার আত্মত্যাগ ভিত্তিক যে বীরত্বের পরিচয় দিল সে আজ সে বীরত্ব বনের পশুদের মধ্যে দেখাই যায় না।
কিমা আবার প্রান্তর পার হচ্ছে। কিন্তু এবার একা একা নয় বা টারজনের কাঁধে চড়ে নয়, এবার সে ওয়াজিরি সর্দার মুভিয়োর কাঁধে চড়ে সেই প্রান্তরটার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। টারজনের মত মুভিরোর কাঁধের উপর থাকলেও কিমার সাহস দারুণ বেড়ে যায়। তার হৃদয়টা হয়ে ওঠে সিংহের মত।
মেলটন তার লরী নিয়ে মুলারগানদের দেখতে না পেয়ে বন থেকে ফিরে আসার পথে মুভিয়োর নেতৃত্বে ওয়াজিরিদলটাকে দেখতে পেল।
সে তার বাইনোকুলার দিয়ে ভাল করে দেখল দলটাকে। তারা আদিবাসী যোদ্ধা হলেও তাদের হাবভাব মোটামুটি বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হলো। তবু সে লরীর উপর বসে থাকা, নিগ্রোদের সব বাড়তি রাইফেলগুলোকে ঠিক করে রাখতে বলল।
কিন্তু একজন নিগ্রো বলল, ওরা কিছু করবে না। ওদের গুলি করবেন না। তাহলে আমাদের সকলকে মেরে ফেলবে। ওরা হলো বিরাট যোদ্ধা, ওদের বলে ওয়াজিরি। এই অঞ্চলের কোন একটা জায়গা বাবাঙ্গোর আক্রমণ করছে তাই ওরা বাবাঙ্গোদের তাড়িয়ে দিতে যাচ্ছে। তবে ওরা আমাদের কোন ক্ষতি করবে না।
মুভিরো ট্রাকের সামনে এসে হাত তুলে ট্রাক থামাল।
মলটন গাড়ি থামাল। মুভিরো তাকে জিজ্ঞাসা করল, কোথা হতে আসছ?
মেলটন খাদের কাছে আসার পথে জেব্রাদের মৃতদেহ দেখে বুঝতে পারল মুলারগানরা কোন্ পথে গেছে। আরো এগিয়ে গিয়ে একটা খাদের ধারে মুলারগানের মোটরটা উল্টোন অবস্থায় দেখে।
মেলটন কাছে গিয়ে যা যা দেখেছিল এবং যাদের খোঁজে সে গিয়েছিল তা বলল সব।
মুভিরো বলল, তোমাদের বন্ধু দু’জন ছাড়া আর কোন শ্বেতাঙ্গকে দেখেছিলে?
গতকাল টারজান নামে এক শ্বেতাঙ্গকে দেখেছিলাম।
তোমাদের লোকের সঙ্গে তিনিও কি ধরা পড়েছেন?
মেলটন বলল, তা ত জানি না।
মুভিরো বলল, আমাদের সঙ্গে এসে বনের প্রান্তে শিবির স্থাপন করো। তোমার বন্ধুরা যদি বেঁচে থাকে তাহলে তাদের আমরা ফিরিয়ে আনবই।
যাই হোক, ওয়াজিরি যোদ্ধারা বেশ জোর কদমে চলতে লাগল। মেলটন তার ট্রাকটা ধীরে গতিতে চালিয়ে তাদের পিছু পিছু যেতে লাগল।
এদিকে বাবাঙ্গোরা সারারাত উৎসবে মেতে থাকার পর গভীরভাবে সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারা দুপুরের আগে উঠবে না। তাদের একজন বন্দী পালিয়ে গেছে। তার উপর মুলারগানের আঘাতে তাদের কয়েকজনের চোয়াল আর নাক ভেঙ্গে গেছে।
বাবাঙ্গোদের সঙ্গে লড়াইয়ে মুলারগানের মাথাটা ব্যথা করছিল। মার্কস-এর সর্বাঙ্গ ব্যথা করছিল। সে বলল, নোংরা লোকগুলো আমাদের দেহের তিন চার জায়গার হাড়গোড় ভেঙ্গে জলে তিন চার দিন। ডুবিয়ে রাখবে। তারপর খাবে।
মুলারগান তাকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ করো। আমি এসব কথা ভুলে যেতে চাইছি।
টারজান ওয়াজিরিদের সন্ধানে বন পার হয়ে সেই প্রান্তরের কাছে গেল। কিন্তু তাদের দেখা না পেয়ে আবার সে বনের মধ্য দিয়ে গাছে গাছে বাবাঙ্গোদের বস্তির সামনে এসে হাজির হলো। সে বুঝতে পারল সে একা কখনো তাদের কবল থেকে বন্দী দু’জনকে মুক্ত করতে পারবে না।
অন্য পথ দিয়ে সে শিবিরে পৌঁছল। সেই নদীটার ধারে এসে দেখল নদীর জলে ভিজিয়ে রাখা বন্দীরা তখনো তেমনিভাবে আছে। শিবিরের কাছে সে সিংহের গন্ধ পেল। গন্ধ শুঁকে সে বুঝল একটা সিংহ আর সিংহী ক্ষুধার্ত অবস্থায় শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
প্রায় এক ডজন বাবাঙ্গো যোদ্ধা মুলারগান আর মার্কস-এর কাছে এসে তাদের বাঁধন কেটে দিল। তারপর তাদের দেহদুটোকে জোরে নাড়া দিয়ে তাদের দাঁড় করিয়ে দিল।
এরপর তারা তাদের বস্তির মধ্যভাগে নিয়ে গেল। সেখানে একটা গাছের তলায় তাদের সর্দার আর যাদুকর ডাক্তার বসেছিল। যোদ্ধারা অর্ধবৃত্তাকারে তাদের সর্দারকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তাদের পিছনে ছিল নারী আর শিশুরা।
