এই বলে টারজনের মুখে একটা ঘুষি মারতে গেলে সরে গেল টারজান। তারপর মুরালগানের মাথার। পাশে এমন একটা চড় মারল যাতে সে পড়ে গেল মাটিতে।
মার্কস ভয়ে লাফাতে লাফাতে চীৎকার করে মুলারগানকে বলতে লাগল, উঠে পড়। ওকে মেরে ফেল।
মুলারগান আবার উঠে দাঁড়িয়ে টারজানকে ঘুষি মারতে লাগল। কিন্তু তাতে কিছুই হলো না তার। টারজান এবার মুলারগানকে ধরে উপরে উঠিয়ে মাটিতে জোরে ফেলে দিল। তারপর তার বুকের উপর বসে তার গলাটা দু’হাত দিয়ে টিপে ধরল।
মুলারগান অস্পষ্টভাবে মার্কসকে বলতে লাগল, আমাকে বাঁচাও। আমাকে মেরে ফেলছে।
এমন সময় কিমা চীৎকার করে উঠল অন্য কারণে। কিমা চীৎকার করে টারজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু টারজান তখন একমনে লড়াই করাতে শুনতে পায়নি তা সময়ে।
মার্কসও দেখতে পায়। কিন্তু তখন বড় দেরী হয়ে গেছে। খাদের ওপার থেকে প্রায় একশো জন। বাবাঙ্গো এসে কখন ওদের ঘিরে ফেলেছে তা বুঝতে পারেনি ওরা। বাবাঙ্গোরা ওদের জীবন্ত ধরে নিয়ে যেতে চাইল। তাই ওরা ওদের কোনরকম আঘাত না করেই বেঁধে ফেলল পিছন থেকে।
টারজান কিছুটা লড়াই করল প্রথমে। কিন্তু সংখ্যায় ওরা অনেক বেশি ছিল বলে পেরে উঠল না। সেও বন্দী হলো।
বন্দীদের পিছনে বর্শা দিয়ে খোঁচা দিতে দিতে বাবাঙ্গোরা তাদের গায়ে নিয়ে গেল তাদের। কিমা তখন হতাশ হয়ে বনের শেষে সেই প্রান্তরটার দিকে ছুটে গেল।
বনের মধ্য দিয়ে একটা পায়ে চলা পথের উপর দিয়ে তিনজন শ্বেতাঙ্গ বন্দীকে তাদের গায়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল বাবাঙ্গোরা।
মার্কস এক সময় ভয়ে ভয়ে মুলারগানকে জিজ্ঞাসা করল, ওরা আমাদের নিয়ে কি করবে?
মুলারগান বলল, ঐ লম্বা চওড়া টারজান নামের লোকটাকে জিজ্ঞাসা করো।
মার্কস বলল, লোকটা মানুষ নয়, পশু। ওর গর্জন শুনেছিলে? ও তোমাকে ফ্লাইওয়েটের মত তুলেছিল আর হেভিওয়েটের মত মাটিতে ফেলেছিল। খুব ভাগ্য ভাল যে বেঁচে গেছ।
অবশেষে একটা ছোট নদী যেখানে একটা বড় নদীতে গিয়ে পড়েছে সেখানে এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা একটা অস্থায়ী শিবিরে গিয়ে থামল বাবাঙ্গোরা।
শিবিরের সামনে গিয়ে ওরা দাঁড়াতেই অনেক নারী ও শিশু ছুটে এল চীৎকার করতে করতে। নারীরা থুথু ফেলতে লাগল বন্দীদের উপর আর ছেলেরা ছড়ি দিয়ে মারতে লাগল। তখন যোদ্ধারা তাদের সরিয়ে দিল।
এরপর বন্দীদের গলায় দড়ি দিয়ে নিয়ে গিয়ে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হলো।
মার্কস অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পড়ায় মাটিতে শুয়ে পড়ল। মুলারগান ঠেস দিয়ে বসে রইল। টারজান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারদিকের পরিবেশ খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সে এক মনে শুধু মুক্তির কথা চিন্তা করতে লাগল।
সহসা কি একটা আর্তনাদ শুনে মার্কস তার সঙ্গীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বলল, ওটা কিসের শব্দ? শুনতে পাচ্ছ?
নদীর দিক থেকে একটা আর্তনাদ আসছিল। কিন্তু নদীর ধারে গাছপালা থাকার জন্য ওরা কিছু দেখতে পাচ্ছিল না।
টারজান বলল, ওটা খাওয়ার থেকে আরও খারাপ। ওরা খাবার মাংসগুলোকে নরম করছে। যারা আর্তনাদ করছে তারা হলো কিছু নরনারী আর শিশু। তিন-চারদিন আগে ওদের হাত পা ভেঙ্গে দিয়েছে। ওদের মাথাগুলোকে বাঁশের লাঠির সঙ্গে বেঁধে এমনভাবে নদীর জলে ঝুলিয়ে রেখেছে যাতে ওরা ডুবে। না যায় বা আত্মহত্যা করতে না পারে। ওরা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। এইভাবে তিন চারদিন ওদের মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে তারপর ওদের কেটে সেই মাংস খাবে।
একথা শুনে মুলারগানের মুখ সাদা হয়ে গেল। ভয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়ল মার্কস।
টারজান বলল, তোমরা ভয় পেয়ে গেছ। কষ্টভোগ করতে চাও না। কিন্তু জেব্রা আর হাতিগুলো তোমাদের আঘাতে অনেক কষ্ট অনেক যন্ত্রণা ভোগ করেছে।
মুলারগান বলল, ওরা পশু। কিন্তু আমরা মানুষ।
টারজান বলল, তোমরাও একদিক দিয়ে জন্তু। আহত হলে জন্তুদের মতই তোমাদেরও কষ্ট হয়। বাবাঙ্গোরা তোমাদের খাবার জন্য তোমাদেরও কষ্ট দেবে-এতে আমি খুশি। তোমরা বাবাঙ্গোদের থেকেও খারাপ। হাতি ও জেব্রাগুলোকে মারার কোন কারণ ছিল না তোমাদের।
এরপর তিনজনই চুপ করে রইল। সবাই ভাবতে লাগল। মার্কস ভয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। মুলারগানও ভেঙ্গে পড়ল। সব সাহস হারিয়ে ফেলল।
মুলারগান অবশেষে বলল, আমি তোমার কথাটি ভাবছি। সত্যিই আমরা জীবহত্যা করে আনন্দ পাই। এ কথাটা কোনদিন ভেবে দেখিনি। এখন বুঝেছি এ সব কাজ না করলেই ভাল হত।
সে রাত্রিতে বন্দী তিনজনকে এক জায়গায় শুতে দেওয়া হলো। সে রাত্রিতে উৎসবে মেতে রইল বাবাঙ্গোরা। তাদের কথাবার্তা থেকে টারজান বুঝতে পারল পরদিন রাত্রিতে বন্দী শ্বেতাঙ্গাদের হাত পা ভেঙ্গে জলে ভাসিয়ে দেবে।
টারজান মুলারগানকে বলল, আমি তোমার হাতের বাঁধন খুলে দেব প্রথমে। তার পর তুমি আমার বাঁধন খুলে দেবে।
মুলারগান বলল, ঠিক আছে।
বন্দীদের কাছে কোন প্রহরী ছিল না। টারজান জানত ওদের উন্মত্ত নাচগান বন্ধ হলেই ওরা পাহারার ব্যবস্থা করবে। সে প্রথমে মুলারগানের বাঁধনটা খুলে দিল। মুলারগান তারপর টারজনের হাতের বাঁধন খুলে দিল। মার্কস-এর বাঁধন আরো সহজে ভোলা হয়ে গেল।
তিনজনই এইভাবে মুক্ত হলে টারজান চুপি চুপি তাদের বলল, আমার পিছু পিছু তোমরা বুকে হেঁটে এস। কোন গোলমাল করবে না।
