মুলারগান বলল, আমি ভাল শিকার না পাওয়া পর্যন্ত যাব না।
নিগ্রোরা ট্রাক থেকে মালপত্র নামাতে লাগল। একজন রাতের রান্নার জন্য আগুন জ্বালাল। অনেকে হাসিঠাট্টা ও গান করতে লাগল। একজন নিগ্রো মাথায় করে ভারী একটা বোঝা ট্রাক থেকে নামিয়ে শিবিরে ঢুকতে গিয়ে মুলারগানের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। মুলারগান পড়ে যায়। সে উঠে একটা চড় মারে। নিগ্রোটাকে।
মেলটন এগিয়ে এসে মুলারগানকে বলল, আর তুমি কখনো ওদের গায়ে হাত দেবে না, আমি অনেক সহ্য করেছি এতদিন। আর কারো গায়ে হাত দেবে না।
মুলারগান তখন রেগে গিয়ে বলল, তাহলে তোমারও একটা চড় খাবার মন হয়েছে।
কিন্তু সে মেলটনকে চড় মারতে উদ্যত হতেই পিস্তল উঁচিয়ে ধরল মেলটন। বলল, বাঁচতে চাও ত দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাও।
মুলারগান মুখ ঘুরিয়ে চলে গিয়ে মার্কসকে বলল, ইংরেজরা রসিকতা বোঝে না।
ওদের সকলের রাতের খাওয়া হয়ে গেলে একটা সিংহের গর্জন শুনতে পেল ওরা। মনে হলো। সিংহটা ওদের শিবিরের খুব কাছেই আছে।
মুলারগান বলল, সেই শুয়োরটা।
মেলটন বলল, কোথায় শুয়োর?
শব্দ শুনতে পাচ্ছ না?
মুলারগান ট্রাকের পাশে গিয়ে স্পটলাইট ঘোরাতেই দেখল একটা বড় সিংহ দাঁড়িয়ে রয়েছে। সিংহের চোখে জোর আলো পড়তে সে আস্তে আস্তে চলে গেল।
আফ্রিকায় বাবাঙ্গো নামে এক ধরনের আদিবাসী আছে। তাদের দেহগুলো খুবই বলিষ্ঠ। মাথাগুলো কামানো। দাঁতগুলো খুব সাদা ঝকঝকে না হলেও তারা নরখাদক। অন্যান্য জীবজন্তুর থেকে মানুষের মাংস খেতে তাদের ভাল লাগে বলেই তারা মানুষ খায়। তারা জীবজন্তু শিকারের মতই খাবার জন্য মানুষ। শিকার করে। অন্য সব অঞ্চলের লোকেরা তাদের ভয় করে।
সম্প্রতি টারজনের কাছে একটা খবর যায়, বাবাঙ্গোরা দখলিভুক্ত এক অঞ্চলের অধিবাসীদের আক্রমণ করেছে। টারজান তাই বহুদূর থেকে বহু পথ হেঁটে এ বিষয়ে তদন্ত করতে এসেছে। তার পিছনে। সর্দার মুভিরোর অধীনে একদল ওয়াজিরি যোদ্ধা আসছে।
মেলটনের সঙ্গে টারজনের যেদিন দেখা হয় তার পরদিন সকালে টারজান সেই প্রান্তরের কাছাকাছি বনের ভিতর দিয়ে পথ হাঁটছিল সচকিতভাবে। পথের ঘাসের ভিতর বিষাক্ত পোকা, গাছের উপর ওৎ পেতে থাকা চিতা, কালো পিঁপড়ে প্রভৃতি সব কিছুর সামনে কড়া নজর রেখে চলেছিল সে।
সহসা একটা মোটর গাড়ির শব্দ শুনতে পেল টারজান। তারপরই দেখল একদল জেব্রা ছুটে পালাচ্ছে আর একটা চলন্ত মোটরগাড়ি থেকে একটা লোক একটা সাব-মেশিনগান থেকে গুলি করছে। গুলি করতে করতে চলে গেল গাড়িটা। সেই গুলিতে অনেকগুলো জেব্রা মারা গেল, অনেকগুলো আহত হলো। কিন্তু অকারণে নিরীহ জন্তুগুলোকে মেরে চলে গেল গাড়িটার আরোহীরা। গাড়িটাতে ছিল মাত্র দু’জন লোক।
গাড়িটা যেদিকে গেল সেইদিকেই এগিয়ে যেতে লাগল টারজান। সে ভাবল, ঘটনাক্রমে লোকদুটোর সঙ্গে দেখা তার হবেই। তখন দেখা যাবে।
এদিকে মুলারগান তার মোটরগাড়িটা আরো কিছুদূর নিয়ে গিয়ে একটা খাদের কাছে থামল। তারপর মাকর্সকে বলল, যদি এমনি করে একদল সিংহের দেখা পেতাম জো, তাহলে কেমন মজা হত?
মার্কস বলল, চমৎকার হয়েছে। তোমার লক্ষ্য ভাল। সব তাড়িয়ে দিয়েছ ঝাঁকের মধ্যে গুলি করে।
খাদের কাছে এসে বনুটা থেমে গেছে। ওরা বসে কথা বলছিল। মুলারগান বলল, আমাদের এখন থামলে চলবে না। এমন সব জিনিস শিকার করে নিয়ে গিয়ে তার নমুনা দেখাতে হবে যা দেখে তাক লেগে যাবে সাংবাদিকদের।
সহসা একটা হাতি দেখতে পেয়ে তার সাব-মেশিনগানটা তুলে নিল মুলারগান। সে গুলি করল। কিন্তু একটা নয়, পর পর অনেকগুলো হাতি এগিয়ে আসছে এই দিকে। গুলিটা কোন হাতির গায়ে লাগেনি।
হাতিদের চোখ ছোট বলে তারা ওদের গাড়িটার কাছে এসে চারদিকে তাকাতে লাগল। বিপদটা কোনদিকে তা দেখতে কিছুটা সময় লেগে গেল হাতিগুলোর। এই অবসরে আবার গুলি ভরে গুলি করল মুলারগান। একটা হাতি পড়ে গেল। অন্যগুলো পালিয়ে গেল। কিন্তু একটা পুরুষ হাতি পাগলা হয়ে ছুটে এল। মুলারগান আর মার্কস গাড়িটার উল্টো দিকে চলে গেল। হাতিটা উল্টে দিল গাড়িটাকে। চাকাগুলো উল্টে গেল উপর দিকে।
হাতিটা আগেই গুলি খেয়েছিল। এবার উল্টে পড়ে গেল।
মুলারগান বলল, আমাদের হাতের পিস্তল ছাড়া আর সব অস্ত্র গাড়িটার মধ্যে চাপা পড়ে গেল।
এদিকে টারজান বন্দুকের গুলির আওয়াজের সঙ্গে হাতিদের আর্তনাদ শুনতে পায়। সে বুঝতে পারল যে দু’জন শ্বেতাঙ্গ জেব্রাদের ঝাঁকে গুলি করেছে তারাই হাতিদেরও মারছে।
এক প্রচণ্ড রাগে অভিভূত হয়ে সেই শব্দ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল টারজান। খাদের কাছে গিয়ে সে থামতেই দেখতে পেল মুলারগান আর মার্কস।
কিমা মারপিটের আশংকায় টারজনের কাঁধ থেকে একটা গাছের উপর বসে দেখতে লাগল কি হয়।
টারজান তাদের কাছে গেলে মুলারগান তাকে বলল, কি চাও তুমি?
মরা হাতিটাকে দেখিয়ে টারজান বলল, তোমরা এটাকে মেরেছ?
মেরেছি ত কি হয়েছে?
পিস্তলটা হাতে ধরে বলল মুলারগান।
টারজানও তোমাদের মারবে।
মুলারগান তার পিস্তল থেকে গুলি করতে না করতেই পা দিয়ে লাথি মেরে তার হাত থেকে পিস্তলটা ফেলে দিল টারজান। মার্কস-এর হাত থেকেও পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
মুলারগান বলল, তুমি টারজান না?
