ট্রাকের ড্রাইভার দূরে টারজানকে দেখতে পেয়ে আদিবাসী ভেবে পিস্তলটা খাপ থেকে বার করল। সে দেখল তার পাশে বসা যুবকটির হাতেও একটা রাইফেল রয়েছে।
ড্রাইভার তার পাশের কৃষ্ণকায় নিগ্রো যুবকটিকে বলল, লোকটা কে?
যুবকটি উত্তর করল, একজন শ্বেতাঙ্গ মালিক।
টারজনের কাছে এসে ট্রাকটা থামাল শ্বেতাঙ্গ ড্রাইভার।
টারজান ট্রাকটার পাশে দাঁড়িয়ে ড্রাইভারকে বলল, এখানে তোমরা কি করছ?
মেলটন তার সামনে একজন নগ্ন লোককে দেখে তার এই প্রশ্নটাকে একটা বেয়াদবি বলে মনে করল।
মেলটন বলল, দেখছ ত, একটা লরী চালাচ্ছি।
টারজান এবার তীক্ষ্ণ-কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। বলে টারজান তখন তার একটা হাত বাড়িয়ে মেলটনের হাতের কব্জিটা ধরে তাকে জোর করে নামাল ট্রাক থেকে। তারপর তার পিস্তলটা কেড়ে নিল।
ট্রাকের উপরে যে সব নিগ্রো বসেছিল তারা হতবুদ্ধি হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তারা দেখল মেলটনকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে তার ঘাড় ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল লোকটা।
মেলটনের গায়েও শক্তি ছিল। কিন্তু টারজনের সঙ্গে পেরে উঠল না সে। মেলটনের মনে হলো, কোন মানুষ নয়, সে যেন কোন বন্য জন্তুর কবলে পড়েছে।
টারজান এবার মেলটনকে ছেড়ে রাইফেল হাতে নিগ্রো যুবকটার দিকে তাকিয়ে বলল, রাইফেল ফেলে দাও।
যুবকটি ইতস্তত করছিল। মেলটন বলল, ফেলে দাও।
মেলটন এরপর টারজানকে বলল, আমার কাছে কি জানতে চাও তুমি?
আমি জানতে চাই তোমরা এখানে কি করছ?
আমি কয়েকজন আমেরিকান লোককে খুঁজতে যাচ্ছি।
তারা কোথায়?
মেলটন বলল, ঈশ্বর জানেন। আজ সকালে তারা একটা ছোট গাড়িতে করে বেরিয়ে যায়। আমাকে বলেছিল বনটার প্রান্তে এসে অপেক্ষা করতে। সেখানে তাদের সঙ্গে আবার দেখা হবে দিনের শেষে। হয়ত তাদের কোন বিপদ ঘটেছে।
এখানে কি করতে এসেছিল তারা?
শিকার করতে।
এটা ত নিষিদ্ধ এলাকা। এদিকে কেন তারা এল?
মুলারগান কোন কথা শুনবে না। সে নিজেকে সবজান্তা ভাবে। সে ভাবে সে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নামকরা হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। এমন লোক জীবনে আমি দেখিনি কখনো। মুলারগানের ম্যানেজার লোকটা তত খারাপ নয়। কিন্তু লোকটা আধপাগলা, তার কথা শুনে হাসি পায়। সে শুধু নিউ ইয়র্কে ফিরে যেতে চায়। এখানে খুব ভয়ে ভয়ে আছে। ওরা দু’জনে নিউ ইয়র্কে চলে গেলে আমি বাঁচি।
টারজান বলল, আর কেউ তাদের সঙ্গে সেই?
না।
তাহলে তাদের আশা ছেড়ে দিতে পার। এটা সিংহের রাজ্য।
মেলটন বলল, তাহলেও আমার উপর যখন দায়িত্ব আছে তখন তাদের একবার খুঁজে দেখি, তুমি আবার বাধা দেবে না ত?
না। যাও, খুঁজে দেখ। তবে বলবে তারা যেন এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়।
এই বলে টারজান বনের মধ্যে চলে গেল।
মেলটন চীৎকার করে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে, পরিচয়টা দিলে না?
টারজান বলল, আমার নাম টারজান।
একটা সিংহের গর্জনে বিশাল প্রান্তরের নিস্তব্ধতাটা ভঙ্গ হলো। সিংহটা তখনো অবশ্য দূরে ছিল। কিন্তু গাড়িতে বসে থাকা মুলারগান ও তার ম্যানেজারের কানে আসতে লাগল গর্জনটা।
মুলারগান বলল, ওটা কিসের শব্দ?
মার্কস বলল, একটা শুয়োর।
দিনের আলো থাকলে শুয়োরটাকে মারা যেত। এখন গোটাকতক শুয়োরের চপ হলে ভাল হত। এখন দেখছি ঐ ইংরেজটা ছাড়াই আমরা চালিয়ে নিতে পারব।
মুলারগান বলল, তা অবশ্য বটে।
হঠাৎ সামনে একটা আলো দেখতে পেয়ে মার্কস বলল, ঐ দেখ আলো। মনে হয় আমাদের ট্রাকটা।
দুটো গাড়ি একজায়গায় হলে সকলে গাড়ি থেকে নেমে হাত পা ছড়িয়ে বসল। তারা সকলেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
মুলারগান ট্রাকের ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
মেলটন বলল, শিবির থেকে বেরিয়ে আমরা ত সোজা আসছি। আপনাদের হালকা গাড়ির মত এই ভারী ট্রাকটা এত খারাপ রাস্তায় তাড়াতাড়ি যেতে পারে না। যাই হোক, কোন শিকার পেলেন?
না। আমার মনে হয় এখানে শিকারের মত কোন জীবজন্তু নেই।
শিকার যথেষ্টই আছে। এখানকার কোন জায়গায় স্থায়ীভাবে শিবির স্থাপন করলে শিকার পাওয়া যাবে।
মার্কস বলল, আমরা আজ কিছু বুনো মোষ দেখেছিলাম। কিন্তু মোষগুলো পালিয়ে গেল।
মুলারগান বলল, আমি পায়ে হেঁটে কিছুদূর তাদের অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু তারা পালিয়ে যায়।
আপনার ভাগ্য ভাল যে পালিয়ে গেছে।
তার মানে?
আপনি যদি তাদের একটাকে গুলি করতেন তাহলে আপনি নিজেই মারা পড়তেন।
মুলারগান বলল, তুমি যা খুশি বলতে পার। কিন্তু আমি গবাদি জাতীয় কোন পশুর ভয়ে ভীত নই।
মেলটন নিগ্রোদের সাহায্যে সেখানেই শিবির গড়তে লাগল। মুলারগান ও মার্কসকে বলল, আজকের মত এখানেই রাত কাটানো যাক। কাল সকালে ত ফিরে যেতেই হবে।
মুলারগান চীৎকার করে বলল, ফিরে যাব মানে? এখানে আমি শিকার করতে এসেছি। শিকার করব।
মেলটন বলল, আজ পথে একটা লোকের সঙ্গে আমার দেখা হলো। সে বলল এটা নিষিদ্ধ অঞ্চল। আমাদের চলে যেতে হবে।
সে আমাদের চলে যেতে বলার কে? সে কে তা বলেছিল তোমায়?
তার নাম টারজান।
তাকে বলেছিলে আমি কে?
হ্যাঁ, বলেছিলাম। কিন্তু সেটা সে গ্রাহ্য করেনি।
সে কি ভাবে, আমাকে আফ্রিকা থেকে তাড়িয়ে দেবে সে।
মেলটন বলল, সে যখন বলেছে তখন চলে যাওয়া উচিত।
মার্কস হেসে বলল, আমি এখনি চলে যাবার জন্য প্রস্তুত। এই জ্বর-সর্দি নিয়ে আফ্রিকায় থাকা উচিৎ নয়।
