এদিকে সেই রাতে টারজান আর ওয়ারপার যখন ফরাসী সৈনিকদের শিবিরে বন্দী ছিল তখন গভীর রাতে শিবিরের কাছে একটা গাছ থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ আসে। শিবিরে মাত্র দু’জন সৈনিক পাহারা দিচ্ছিল। বাকি সবাই ঘুমোচ্ছিল। পাহারাদার ছাড়া আর যারা জেগে ছিল তারা হলো টারজান আর ওয়ারপার।
গাছ থেকে আসা সেই শব্দটার মানে বুঝতে পারল টারজান। সেও তেমনি একটা শব্দ করে জবাব দিল। রক্ষী দু’জন সেই শব্দ শুনে দারুণ ভয় পেয়ে গেল।
এমন সময় গাছ থেকে একটা বাঁদর-গোরিলা নামতেই তার পিছু পিছু আরো অনেকগুলো গোরিলা নেমে এসে সোজা শিবিরে ঢুকে পড়ল। টারজনের নির্দেশমত তারা টারজান আর ওরপারকে তুলে নিয়ে শিবির থেকে বেরিয়ে এল।
ততক্ষণে রক্ষীদের চীৎকারে শিবিরের সবাই জেগে উঠেছে। তখন ফরাসী অফিসার গুলি করল আর সেই গুলিটা চুলুকের গায়ে লাগল। তবু সে ওয়ারপারকে বয়ে নিয়ে রাতের মধ্যে তার দলের সকলের পিছু পিছু ছুটতে লাগল। তারপর এক সময় পড়ে গেল ওয়ারপারকে নিয়ে।
হঠাৎ চুলুকের হাতে হাত পড়তেই তার হারানো মুক্তার আসল থলিটা পেয়ে গেল ওয়ারপার। টারজানরা তখন কিছুটা এগিয়ে পড়েছিল। ওয়ারপার দেখল এগুলো ওপারের আসল মুক্তা, যে থলিটা তার জামার তলায় লুকিয়ে রেখেছিল।
এবার টারজান ছুটে এসে দেখল চুলুক মারা গেছে গুলির আঘাতে। তখন সে ওয়ারপারকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
টারজান এবার ওয়ারপারকে বলল, তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করো। আমি তোমাকে উদ্ধার করেছি। ওয়ারপার তখন পথ দেখিয়ে তাকে জেনকে যেখানে রেখে এসেছিল সেই দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
যেতে যেতে এক সময় সিংহের সমবেত গর্জন আর ঘোড়া ও মানুষের আর্ত চীঙ্কার শুনতে পেল। সে ওয়ারপারকে বলল, কারা বিপদে পড়েছে, দেখি একবার। তুমি এখানেই থাক। আমি এখনি ফিরে আসব।
তখন ওয়ারপারকে সেখানে অপেক্ষা করতে বলে টারজান সেই গোলমালের শব্দ লক্ষ্য করে চলে গেল ওয়ারপার উল্টোদিকে তীরবেগে পালিয়ে গেল।
শিবিরের কাছে গিয়ে একটা গাছের উপর থেকে টারজান দেখল সেই গাছের নিচে এক মহিলা একটা মরা ঘোড়র পাশে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা সিংহ তাকে আক্রমণ করার জন্য উদ্যত হচ্ছে।
এদিকে জেন দেখল সিংহটা সত্যি সত্যি পা তুলে ঝাঁপ দিচ্ছে আর সেই সঙ্গে গাছ থেকে বাদামী রঙের এক দৈত্যাকার প্রেমূর্তি সিংহটার উপর ঝাঁপ দিল। মৃত স্বামীকে জীবন্ত দেখে ভয়ের কথা ভুলে গেল জেন।
জেন দেখল টারজনের হাতে কোন অস্ত্র নেই। টারজান দেখল একটা মৃত সৈনিকের একটা রাইফেল পড়েছিল। সেটা তুলে নিয়ে টারজান সিংহটার মাথা এত জোরে মারল যে সিংহের মাথার খুলিটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
টারজান চারদিকে দেখে আর সময় নষ্ট না করে জেনকে তুলে নিয়ে গাছের উপর উঠে পড়ল। মুরাকের সৈন্যরা তখন সিংহদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্য এতই ব্যস্ত ছিল যে টারজান তাদের বন্দিনীকে নিয়ে গেলেও তারা কোনভাবে হস্তক্ষেপ করল না।
টারজান জেনকে সঙ্গে করে যেখানে ওয়ারপারকে ছেড়ে এসেছিল সেইখানে গেল। কিন্তু ওয়ারপারকে দেখতে পেল না।
টারজান বলল, ও পালিয়ে গিয়েই প্রমাণ করল যে ও দোষী। যাক, ও নিজের কবর নিজের হাতে খুঁড়ল।
এবার দু’জনে তাদের খামারবাড়ির দিকে রওনা হলো। টারজান বলল, ওপারের ধনরত্ন গেল, বাড়ি গেল, খামার গেল, সব গেল। কিন্তু তোমাকে আজ আমি ফিরে পেয়েছি এটাই আমার আজ সবচেয়ে বড় লাভ। আবার আমরা আমাদের অনুগত ও বিশ্বস্ত ওয়াজিরিদের কাছে যাব।
টারজান যখন ওয়াজিরিদের বস্তিতে গিয়ে হাজির হলো তখন ওদের নেতা বাসুলির আর মুগাম্বি দু’জনেই ছিল। তারা আরবদের আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। দীর্ঘকাল পরে তাদের প্রিয় প্রভু আর। প্রভুপত্নীকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল তারা। সঙ্গে সঙ্গে নাচগান শুরু করে দিল। তার আগে বাসুলি টারজানকে জানাল কিভাবে সোনার তালগুলো উদ্ধার করে আরবদের হাত থেকে।
টারজান দেখল ওপার নগরীর ধনাগার থেকে যেসব সোনার তাল সে ওয়াজিরিদের হাতে দিয়েছিল তা সবই আছে।
যে সব ঘটনার কথা তার বিশ্বস্ত ওয়াজিরিদের কাছ থেকে শুনল টারজান তার থেকে বুঝতে পারল সিয়ে ফ্রেকুলত নামধারী বেলজিয়ান ওয়ারপারই এই সব কিছু করিয়েছে। সমস্ত অঘটনের মূলে আছে সে।
কয়েকমাস ধরে ওয়াজিরিয়া দিনরাত খেটে টারজনের ভস্মীভূত বাংলো-বাড়িটা আবার আগের মত করে গড়ে তুলল। ওয়াজিরিদের শ্রম আর ওপারের সোনায় আবার সবকিছু ফিরে পেল টারজান।
টারজান ও চ্যাম্পিয়ন (টারজান এ্যাণ্ড দি চ্যাম্পিয়ন)
এক বিশাল প্রান্তরের এক প্রান্তে বনটা যেখানে থেমে গেছে সেখানে একটা মাল বোঝাই ভারী ট্রাক এগিয়ে যাচ্ছিল বনের দিকে।
ট্রাকটা যেদিকে যাচ্ছিল তার উল্টো দিকে প্রান্তরের উপর দূরে একজন পথিক দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রাকটা দেখে অবাক হয়ে গেল পথিকটি।
হেলমেট মাথায় একজন শ্বেতাঙ্গ ট্রাকটা চালাচ্ছিল। তার পাশে বসে ছিল একজন নিগ্রো। ট্রাকের উপর যে সব মাল বোঝাই করা ছিল তার উপর আরো কয়েকজন নিগ্রো ছিল।
পথিকটি ধীর গতিতে ট্রাকটা যেদিক থেকে আসছিল সেই দিকে এগোতে লাগল। তার পরনে পোশাক বলতে ছিল মাত্র একটা কৌপীন। হাতে ছিল আদিম যুগের অস্ত্র-একটা তীর ধনুক, তৃণ আর একটা বর্শা। তাঁর কাঁধের উপর ছিল একটা ছোট বাঁদর। লোকটি জাতিতে শ্বেতাঙ্গ হলেও আফ্রিকায় দীর্ঘকাল থাকার জন্য রোদে পুড়ে পুড়ে গায়ের চামড়াটা তামাটে হয়ে যায়। বাঁদরটা একটা হাত দিয়ে লোকটির ঘাড়টা জড়িয়ে ধরে বসেছিল তার কাঁধের উপর। বাদরটার নাম কিমা।
