এরপর জেনকে একটা বাড়তি রিভলবার আর কিছু গুলি দিয়ে বলল, আপনাকে আমি বনের ভিতরে রেখে এখনি চলে আসব। কাল সকালে আমি আপনার কাছে ফিরে যাব। এইভাবে জেনকে নিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়ল ওয়ারপার। শিবিরের শেষ প্রান্তে রক্ষীরা আগুন জ্বালিয়ে রেখে পাহারা দিচ্ছিল সিংহের ভয়ে। ওয়ারপার সেখানে গিয়ে জেনের মুখ থেকে কাপড়টা তুলে বলল, মহম্মদ মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে। সে আমাকে মৃতদেহটাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসতে বলল।
তখন আর কেউ কিছু বলল না। জেন ভয়ে কাঠ হয়ে ছিল। ভাবছিল ওরা হয়ত ওয়ারপারের কথা বিশ্বাস করবে না।
ওয়ারপার সোজা চলে গিয়ে একটা গাছের উপর তুলে দিল জেনকে। তারপর বলল, রাতটা এখানে কাটান কোনরকমে। সকাল হলেই আমি ফিরে আসব।
শিবিরে এসে ওয়ারপার সোজা মহম্মদ বেজের মৃতদেহটা মহম্মদের তাঁবুতে বয়ে নিয়ে গেল। তার বিছানায় মৃতদেহটা শুইয়ে তার হাতে তারই রিভলবারটা গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল ওয়ারপার। নিশ্চিন্তে ঘুমোতে লাগল।
পরদিন সকালেই একজন আরব ঘুম থেকে জাগাল ওরপারকে। বলল, মহম্মদ বেজ আত্মহত্যা করেছে তার ঘরে।
ওয়ারপার ঘর থেকে বেরিয়ে সমবেত আরবদের মাঝখানে গিয়ে প্রথমে রাগের সঙ্গে বলল, কে হত্যা করেছে মহম্মদকে?
আরবরা বলল, আমরা কেউ না, ও নিজেকেই নিজে হত্যা করেছে।
আচমেত জেক ও মহম্মদের মৃত্যুতে নেতা শূন্য হয়ে পড়ল আরবরা। তারা ঠিক করল উত্তরাঞ্চলে গিয়ে তারা যে যার পথ বেছে নেবে। ওয়ারপার বলল, আমিও এখান থেকে যেখানে খুশি চলে যাব।
এই বলে সে তার ঘোড়াটায় চেপে বনের দিকে চলে গেল।
কিন্তু বনে গিয়ে যে গাছে জেনকে রেখে এসেছিল সে গাছে দেখল আশেপাশে কোথাও জেনের কোন চিহ্ন নেই।
সোনার তালগুলোর কথা মনে পড়তে টারজান আবার তার বিধ্বস্ত বাংলোর দিকে চলে গেল। গিয়ে দেখল সেখানে কেউ নেই। যুদ্ধরত দু’পক্ষই চলে গেছে। সোনার তালগুলোর কোন চিহ্ন নেই। সে তাই হতাশ হয়ে বনে ফিরে এল আবার।
বনে এসেই একটা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনে গাছে উঠে লুকিয়ে রইল। আড়াল থেকে দেখল যাকে সে অনেকদিন ধরে খুঁজছে সেই চোর পলাতক লোকটাই ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে। গাছের তলায় ওয়ারপারের ঘোড়াটা আসতেই তার উপর গাছ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল টারজান। তারপর তার বুকের উপর বসে বলল, আমার মুক্তার থলিটা কোথায় বল, তা-না হলে তোমাকে মেরে ফেলব।
ওয়ারপার বলল, থলিটা আচমেত জেক আমার কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে।
টারজান বলল, মিথ্যা কথা, বলেই তার গলাটা টিপে ধরতেই ওয়ারপার কোনরকমে বলল, সামান্য ক’টা পাথরের জন্য আপনার মত লোক হয়ে আমাকে হত্যা করবেন লর্ড গ্রেস্টোক?
টারজান বিস্ময়ে অবাক হয়ে বলল, কে লর্ড গেস্টোক?
ওপারপার বলল, কেন আপনিই জন ক্লেটন, লর্ড গ্রেস্টোক।
টারজান এবার ওয়ারপারকে ছেড়ে দিয়ে নিজে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। এবার হারানো স্মৃতি ফিরে পেয়েছে সে। অতীতের সব কথা মনে পড়ছে তার একে একে।
হঠাৎ সে বলল, জেন, আমার স্ত্রী কোথায়? আমার খামার আর বাড়ি সব ভস্মীভূত হয়েছে তুমি তা জান। এতে তোমারও হাত আছে। তুমি আমায় অনুসরণ করে ওখানে গিয়েছিলে। তুমিই আমার মুক্তা চুরি করেছিলে। তুমি কুটিল প্রকৃতির এক শয়তান।
তার থেকেও খারাপ।
সহসা টারজনের পিছন থেকে কে একজন কথাটা বলে উঠল। টারজান দেখল সামরিক পোশাক পরা এক অফিসার কয়েকজন নিগ্রো সৈন্যসহ ওয়ারপারকে ধরতে এসেছে।
সামরিক অফিসার টারজানকে বলল, ও একজন খুনি মঁসিয়ে। উপরওয়ালা এক অফিসারকে খুন করে পালিয়ে এসেছে ও। এর বিচারের জন্য ওকে খুঁজছি আমি। আমি ওকে নিয়ে যাব।
টারজান বলল, কিন্তু আমার কাজ এখনো মেটেনি।
ওয়ারপার টারজনের কানে কানে বলল, তুমি আমাকে ওদের হাত থেকে উদ্ধার করো। আমি গত রাতে তোমার স্ত্রীকে যেখানে দেখেছিলাম সেই জায়গাটা দেখিয়ে দেব তোমাকে।
টারজান তখন ওয়ারপারকে তুলে নিয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করতে একজন নিগ্রো সৈনিক রাইফেলের বাঁট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করল। টারজান পড়ে গেল। তখন তাকে নিগ্রো সৈনিকরা বেঁধে ফেলল। তারপর তাদের যাত্রা শুরু করল।
সন্ধ্যার সময় একটা নদীর ধারে রাত্রির মত একটা শিবির তৈরি করল ওরা। টারজান দেখল সে আর ওয়ারপার হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে একটা তাঁবুর ভিতরে।
জেনকে বনে একা রেখে ওয়ারপার আরব শিবিরে চলে গেলে জেনের চোখে একটুও ঘুম এল না। কখন ওয়ারপার ফিরে আসবে সেই চিন্তাই বারবার করতে লাগল সে।
ভোরের দিকে আরবী পোশাক পরা এক অশ্বারোহীকে সেই দিকে আসতে দেখে গাছ থেকে নামতেই জেন দেখল সেই অশ্বারোহীর পিছনে আরও অনেক অশ্বারোহী আসছে এবং তাদের মধ্যে ওয়ারপার নেই।
ভয়ে আবার গাছে উঠতে যেতেই আবদুল মুরাক তার লোকদের ধরে ফেলতে বলল জেনকে।
সন্ধ্যের সময় পথের মাঝে যেখানে একটা শিবির খাড়া করল মুরাকরা সে জায়গাটায় সিংহের উৎপাত খুবই বেশি।
শিবিরের চারদিকে আগুন জ্বালানো সত্ত্বেও অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠার পর কতকগুলো সিংহ গর্জন করতে করতে ঘোরাফেরা করতে লাগল শিবিরটার চারদিকে।
শিবিরের সকলে তখন আপন আপন প্রাণ বাঁচাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ায় জেনের দিকে নজর দিতে পারেনি কেউ।
