জেন তখন গড়িয়ে গড়িয়ে গাছের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এইভাবে কিছুটা যাওয়ার পর জেন এক সময় লাফ দিয়ে উঠেই গাছটার একটা ডাল ধরল। সিংহটাও সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিল জেনকে ধরার জন্য। কিন্তু ধরতে পারল না।
এমন সময় দেখল আচমেত জেক নামে যে আরবটা তাকে ধরতে গিয়েছিল সে একটা রাইফেল হাতে কাকে খুঁজছে। জেন গাছের উপর লুকিয়ে থেকে দেখতে লাগল সব। কিছু পরে দেখল মঁসিয়ে ফ্রেকুলত নামে যে ফরাসী ভদ্রলোক কিছুদিন আগে তাদের বাংলোতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিল কিছুদিনের জন্য সে তার রাইফেলটা তুলে আরবটাকে লক্ষ্য করে গুলি করল। আচমেত জেক হাত পা ছড়িয়ে সামনের দিকে মুখ থুবড়ে পড়ে মারা গেল।
এবার আচমেত মারা যেতে জেন আনন্দের আবেগে গাছ থেকে নেমে আচমেত জেকের হাতে বন্দী। হওয়ার পর থেকে যা যা ঘটেছিল তা ওয়ারপারকে সব বলল।
তা শুনে ওয়ারপার সহানুভূতি দেখিয়ে বলল, আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আপনি আমার উপর অকুণ্ঠ বিশ্বাস রাখতে পারেন।
যাই হোক, আরবদের শিবিরের দিকে জেনকে সঙ্গে করে তখনি রওনা হয়ে পড়ল ওয়ারপার। তার শয়তানির কথা কিছুই জানতে পারল না জেন।
পরদিন বিকালের দিকে ওরা আরবদের শিবিরের কাছাকাছি এসে পড়ল। ওয়ারপার জেনকে বলল, আমি যা যা বলব আপনি তাই করবেন। আমি ওদের বলব, আপনি ওদের থেকে পালিয়ে যাবার সময় আমার হাতে ধরা পড়েন। আমি তখন আপনাকে আচমেত জেকের কাছে নিয়ে যাই। সে সোনাগুলোর দখল নিয়ে জোর লড়াই করছে বলে আসতে পারল না। আমাকে বলল, একে শিবিরে নিয়ে যাও। তারপর সেখান থেকে লোক নিয়ে উত্তরাঞ্চলে গিয়ে এক ক্রীতদাস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেবে।
ওয়ারপার জেনের হাত ধরে শিবিরের দিকে সোজা চলে গেল। শিবিরের লোকেরা ওয়ারপার আর তার সঙ্গে বন্দিনী জেনকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল।
আচমেতের অনুপস্থিতিকালে শিবিরের ভার ছিল মহম্মদ বেজের হাতে।
মহম্মদ বেজ ওয়ারপারকে বলল, আমার যতদূর বিশ্বাস আচমেত জেক মারা গেছে। তা না হলে তুমি আসতে না। তুমি সত্যি কথা বল। আচমেত জেক যদি মারা গিয়ে থাকে তাহলে চল আমরা দু’জনেই মহিলাটিকে নিয়ে উত্তরাঞ্চলে গিয়ে তাকে বিক্রি করে সেই বিক্রির টাকাটা দু’জনে ভাগ করে নিই। তাছাড়া তোমার কাছে সেই মুক্তার থলিটাও ত আছে।
ওয়ারপার রাজী হয়ে গেল মহম্মদের কথায়। তার কাছে মুক্তার থলিটা আর নেই এ কথা প্রকাশ করল না সে। কারণ তাতে সন্দেহ দেখা দিতে পারে মহম্মদের মনে।
অবশেষে আসল কথাটা খুলে বলল ওয়ারপার। বলল, আচমেত জেক সত্যিই সোনার জন্য লড়াই করতে গিয়ে মারা গেছে। আমি পালিয়ে এসেছ। তবে আবিসিনীয়রা এই শিবিরেও এসে পড়বে।
মহম্মদ বলল, আমি কাল সকালেই শিবির তোলার হুকুম দিচ্ছি।
ওয়ারপার বলল, সব লোককে সঙ্গে নিয়ে লাভ নেই। কিছু সাহসী ও সুযোগ্য যোদ্ধাকে বাছাই করে নাও।
পরদিন সকালেই রওনা হলো ওরা। জেনের হাত পায়ের বাঁধন খুলে দিয়ে তাকে কিছু রুটি খেতে দিয়ে একটা ঘোড়ার উপর তোলা হলো। পথে ওয়ারপার কোন কথা বলল না জেনের সঙ্গে।
রাত্রি হতেই এক জায়গায় তাঁবু গেড়ে শিবির স্থাপন করল ওরা। জেনের থাকার ব্যবস্থা হলো মহম্মদ আর ওয়ারপারের তাঁবুর মাঝখানে একটা তাঁবুতে। তাতে সামনে পিছনে দু’জন প্রহরী ছিল। তারপর খাওয়ার পর শুয়ে পড়ল তার বিছানায়।
জেন ঘুমিয়ে পড়লে মহম্মদ প্রহরীর কানে কানে কি বলতেই জেনের তাঁবু থেকে প্রহরীরা সরে গেল। মহম্মদ তখন সোজা জেনের কাছে চলে গেল।
এদিকে ওয়ারপারের চোখে ঘুম ছিল না। বিছানা থেকে উঠে পড়ল ওয়ারপার। সে সোজা জেনের তাঁবুতে চলে গেল।
তাঁবুর ভিতরটা অন্ধকার। শুধু কিছুটা চাঁদের আলো ভিতরে এসে পড়ায় কিছু কিছু দেখা যাচ্ছিল। ওয়ারপার দেখল জেনের বিছানার উপর ঝুঁকে পড়ে কে কথা বলছে। সে বেশ বুঝতে পারল মহম্মদ ছাড়া সে আর কেউ নয়। মহম্মদ জেনকে কি বলতেই জেন উঠে বসল। তাকে ঘৃণার সঙ্গে কি বলল। মহম্মদ তখন জেনের গলাটা টিপে ধরে তাকে আবার বিছানায় শুইয়ে দিল।
এমন সময় ওয়ারপার গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল মহম্মদের উপর।
কিন্তু মহম্মদ তার ছোরাটা ধরে এগিয়ে যেতেই ওয়ারপার তার রিভলবারটা বার করে তার বুক লক্ষ্য করে গুলি করল। মহম্মদ ধড়াস করে পড়ে গেল মেঝের উপর।
জেন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে ওয়ারপারের কাছে এসে বলল, হে বন্ধু, কিভাবে ধন্যবাদ দেব আপনাকে?
বাইরে গুলির শব্দ পেয়ে আরবরা এই তাঁবুর দিকে ছুটে এল।
ওয়ারপার তাঁবুর বাইরে অপেক্ষমান আরবদের বলল, বন্দিনী বাধা দিতে গেলে মহম্মদ তাকে গুলি করে। তবে মারা যায়নি। আমি আর মহম্মদ দুজনে মিলে ব্যাপারটা সামলে নেব। তোমরা গিয়ে শুয়ে পড়।
তার এই কথা শুনে আরবরা যে যার তাঁবুতে চলে গেল।
ওয়ারপার জেনকে বলল, আমি একটা পরিকল্পনা খাড়া করেছি, আপনার পক্ষ থেকে শুধু কিছু সাহস দরকার। আপনি মৃতের ভান করবেন। আমি আপনার দেহটা বয়ে নিয়ে যাব। বলব, মহম্মদ আপনাকে ভালবাসত, তাই নিজের হাতে আপনাকে মারায় সে দুঃখিত। সে তাই শুয়ে আছে শোকে দুঃখে অভিভূত হয়ে। সে আমাকে আপনার মৃতদেহটা জঙ্গলে বয়ে নিয়ে যেতে বলেছে।
জেন হাসিমুখে বলল, কিন্তু একথা ওরা বিশ্বাস করবে?
ওয়ারপার বলল, আপনি ওদের চেনেন না। দেহে ওদের যতই শক্তি থাকুক, মগজে বুদ্ধি নেই সেই পরিমাণে।
